সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬, ০৩:১৪ অপরাহ্ন
নোটিশঃ
জনপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল প্রমিনিউজবিডি ডটকম এর পরিক্ষামূলক সম্প্রচার চলছে। সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। তার মানে এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা লেখার অংশবিশেষ কিংবা ছবি বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রচার বা প্রকাশ করা নিষিদ্ধ।

আমাদের বিজয়ের রঙ

ঢাকা অফিস
  • আপডেট: শুক্রবার, ১২ ডিসেম্বর, ২০২৫
  • ১০ বার পড়া হয়েছে

১৫ ডিসেম্বর থেকে শুরু করতে হয়। ১৫ ডিসেম্বর সন্ধ্যার কথা। আমি তখন নারিন্দায় মনির হোসেন লেনে থাকি। সারাদিন কারফিউ, কারফিউ ভেঙে মিছিল। এর ভেতর সন্ধ্যার দিকে, অন্ধকার হয়ে আসছে যখন হঠাৎ মিছিল। মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে মিছিল। আল্লাহু আকবর স্লোগান দেওয়া হচ্ছে মিছিল থেকে। আমরা শুনলাম এরা সব বিহারি আর রাজাকার। একত্রে এসেছে, ম্যাসাকার করবে। স্বভাবতই আতঙ্কিত। এরপর হঠাৎ করেই সব থেমে গেল। চতুর্দিকে তখন ব্ল্যাকআউট। তখন অন্ধকারের মধ্যেই কিছু ছেলে এসে শব্দ করে বলল, ভয় পাবেন না। আমরা এসে গেছি।
মুক্তিযোদ্ধা।
তারপর অন্ধকারে ওরা মিলিয়ে গেল।
তবু আতঙ্ক যায় না। এমন সময় সারেন্ডারের খবর। রেডিও অন করা ছিল। তখন খুব কম ভলিউমে শুনতাম। রেডিওতে ঘোষণা এলো, সারেন্ডার করেছে। এরপর স্বস্তির সময় শুরু। রাত কাটে না। পরদিন সারেন্ডার করবে। আমরা স্বাধীন। ঘুম আর এলো না।
পরদিন সকালে ৮টার দিকে ছোট ছোট বাচ্চাকে নিয়ে একটা মিছিল এলো। স্লোগান দিতে দিতে, জয় বাংলা। বাচ্চাগুলোর বয়স সাত-আট থেকে ষোলো-সতেরো। ওদের লিডারদের একজন ষোলো-সতেরো বছরের কিশোর। মাথায় ফেটি বাঁধা। হাতে স্টেনগান। ওদের লিড দিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। আমি দরজা খুলে ওদের দেখলাম। কিছুক্ষণ পর ওরা পাড়া থেকে বেরিয়ে টিকাটুলীর দিকে চলে গেল।
তখন পাড়ায় এক রাজমিস্ত্রি ছিল। হালকা পাতলা হ্যাংলা। কালোমতো। এলাকার ছোটখাটো কাজে তার ডাক পড়ত। বড় কোনো কাজ তাকে করতে দেখিনি। আমাদের বাড়ির ছোটখাটো কাজ বেশ কবার করেছে। তার সঙ্গে সামনাসামনি দেখা। বলল, ‘স্যার, আমার ছেলে হারায় গেছিল যে, আজকে পাইসি।’
বাচ্চাদের মিছিলটাকে যে ছেলেটা লিড দিয়ে নিয়ে গেল, সেই ছেলেটা।
রাজমিস্ত্রি প্রতিটি বাড়ির দরজায় টোকা দিয়ে দিয়ে জানাচ্ছিল তার আনন্দের কথা।
‘জানেন স্যার, আমার ছেলে ফিরে আসছে!’
ছেলেটা হারিয়ে গিয়েছিল ২৬ মার্চের পরে। এই বাবা তখন কান্নাকাটি করে ঘুরে বেড়াত। দেখা হলেই কাঁদত। বলত, ‘স্যার আমার ছেলেটা হারায়া গেল।’ তখন তো বছরজুড়েই গুম হচ্ছে। আমরাও ধরে নিয়েছিলাম যে, যারাই গুম হলো, তারা আর ফিরবে না। এই ছেলেটি ফিরে এলো। সে আসলে চলে গিয়েছিল মুক্তিযুদ্ধে। ফেরত এলো ১৫ ডিসেম্বর সন্ধ্যায়। ১৬ ডিসেম্বরে বেরিয়েছিল মিছিল নিয়ে। আনন্দ মিছিল। সারেন্ডারের ওখানে যাবে।
সারেন্ডার করতে ট্যাংকভর্তি সেনারা যাচ্ছিল। টিকাটুলী হাটখোলার কাছে হঠাৎ সেনারা গুলি চালাল সেই মিছিলের ওপর। অনেকে হতাহত হলো।
সেই ছেলেটা ‍মারা গেল।
এই ঘটনা বড় ট্র্যাজেডি হয়ে আমাদের কাছে এসেছিল। ছেলেটা বাড়ি থেকে পালিয়ে গিয়ে যুদ্ধে যোগ দিয়েছিল। সারা বছর যুদ্ধ করল। তারপর যুদ্ধ থেমে গেলে বাড়িতে ফিরে এলো। পরিবারের সবাইকে আনন্দ দিল। পরের দিন সকালে সারেন্ডার দেখতে যাওয়ার সময় মরে গেল।
সেই যে রাজমিস্ত্রি, সারা বছর অপেক্ষা করেছিল ছেলের জন্য, কেবল একটি রাতের জন্য সে আনন্দ করতে পেরেছিল।
পুরো পাড়ার লোকেরই মন খারাপ হয়েছিল। যা হোক, পরে আমরা ১১টার দিকে একটা রিকশা করে বের হলাম। রেসকোর্স ময়দানে যাব। সেখানে সারেন্ডার হবে। ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনের কাছে যখন গেছি তখন একটা জিপ গাড়ি এসে আমার সামনে থামল।
‘আরে এই নবী!’
ওরা সবাই মুক্তিযোদ্ধা। সেখানে শাহাদাত চৌধুরী ছিল, ফতেহ আলী ছিল। ছিল হাবিবুল আলম। আরও অনেকে। সবাই ক্র্যাক প্লাটুনের। ওরা সারেন্ডারের জায়গায় আসছে। আমাকে দেখে থেমেছে। এরপর তো কোলাকুলি। আনন্দ। আমার আনন্দ বেশি হলো। যুদ্ধের সময় পুরোটা ওদের সঙ্গে মাঝে মাঝে দেখা হতো, যখন অপারেশনে আসত। সেই আবার তাদের দেখতে পাওয়া বিশাল আনন্দের ছিল। তারপর যে যার দিকে চলে গেলাম।
সেই সময় এখানে ট্রাকভর্তি মিলিটারিরা আসছে। সবাই নানান দিক থেকে এসে জড়ো হচ্ছে। ক্যান্টনমেন্ট থেকেও আসছে।
এভাবে কিছু সময় কাটল। সারেন্ডার তখন চলছে। লোকারণ্য; রেসকোর্স ঘিরে লোকজন ভর্তি। তার ভেতর দিয়ে মিলিটারিরা ঢুকছে। পাকিস্তানি মিলিটারিরা ঢুকছে সারেন্ডার করতে। ইন্ডিয়ান মিলিটারিরাও ঢুকছে। একটা হুলস্থুল কাণ্ড। চতুর্দিকের এইসব হুলস্থুল দেখে আমি মত পরিবর্তন করলাম। এখানে থাকব না। একটু অন্যদিকে ঘুরে আসি। আমি স্টেডিয়ামের দিকে এলাম। সারেন্ডার হয়ে গেলে পরে ওদিকে যাব।
স্টেডিয়ামের এখান থেকে খাওয়াদাওয়া করে সেদিকেই ছিলাম। কতক্ষণ পর হঠাৎ রেসকোর্সের দিকে গোলমাল শুরু হলো। শুনলাম পাকিস্তানি আর্মিরা জনতার ওপরে ফায়ার করেছে। ওখানে মানুষ স্লোগান দিচ্ছিল, আনন্দ করছিল, সহ্য হয়নি। গুলি চালিয়েছে।
সেখান থেকে হেঁটে বাসায় ফিরলাম। রিকশাওয়ালারাও সব ওখানেই। সাধারণ মানুষের ভেতর হতাহতের সংখ্যা অনেক ছিল। পাড়ায় পা রেখেই শুনলাম।
বাসায় ফিরে রেডিও খুললাম। শুনলাম খবরাখবর।
২
কারফিউ, যুদ্ধ-পরিস্থিতির কারণে কারো সঙ্গে দেখা নেই। বারো ডিসেম্বর কারফিউ এক ঘণ্টার জন্য বোধহয় উঠেছিল। তখন পল্টনে আমাদের এক বন্ধুর কাছে গিয়েছিলাম। বন্ধুটি ছিল সাপ্তাহিক ললনা পত্রিকার ব্যবস্থাপনা সম্পাদক মোহাম্মদ আখতার হোসেন। সে আমার জন্য এক টিন কেরোসিনের ব্যবস্থা করেছে। তখন কেরোসিন তেলের খুব আকাল। আখতারের সঙ্গে কিছুক্ষণ আড্ডা দিয়ে বাসায় ফিরে আসি। সতের তারিখে শুনি, তেরো তারিখে রাতে তাকে মেরে ফেলেছে। তার লাশ রায়ের বাজারে মুনীর চৌধুরীদের সঙ্গে পাওয়া যায়।
আখতার যেখানে থাকত সেই একই ভবনে আরো ছিলেন সাংবাদিক গিয়াস। তারা ভাই্র ছিলেন। তারা ভাই মানে, ফওজুল করিম, তৎকালীন দৈনিক পাকিস্তানের বার্তা সম্পাদক। তিনি ও গিয়াস সাহেব থাকতেন দোতলায় আর নীচতলায় আখতার। তারা ভাই বেঁচে গিয়েছিলেন। সেদিন বাসায় ছিলেন না। বাকিদের পেয়ে ধরে নিয়ে যায়। হত্যা করে।
এই যে হত্যাযজ্ঞ চলছে তেরো তারিখের পর থেকে এটা আমরা ঘুণাক্ষরেও জানতে পারিনি। গৃহবন্দি ছিলাম, তাই।
আমাদের ওঠাবসা যাদের সঙ্গে ছিল তাদের অনেকেই মারা গেছে। আলতাফ মাহমুদ, মুনীর চৌধুরী, আরো যাঁদের কথা বললাম। আমরা কী করে যেন বেঁচে গিয়েছিলাম। আমাদের বুদ্ধিজীবী ও সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের মানুষ- এদের নির্মূল করতে পারলে এই জাতি ঝামেলায় পড়বে। এই ধরনের নির্মূল চলছিল নয় মাস ধরেই। তবে তেরো তারিখ থেকে একটা শেষ চেষ্টা করে ওরা। হয়ত ওরা স্মেল করেছিল, পরাজয় ঘনিয়ে আসছে।

ভালো লাগলে সংবাদটি শেয়ার করুন

এই বিভাগের আরো সংবাদ
© All rights reserved © 2026 PromiNewsBD.com
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com