দীর্ঘস্থায়ী প্রস্ফুটন প্রাচুর্য এবং সৌরভ ও সৌন্দর্যের কারণে যে কয়েকটি ফুল পুষ্পপ্রেমীদের মন জয় করতে সক্ষম হয়েছে, তার মধ্যে কাঠগোলাপ অন্যতম। জনপ্রিয়তার কারণে প্রিয় এসব ফুল-পাখির নামও একাধিক। এসব নামের বেশির ভাগই ভালোবাসা থেকে রাখা। আবার কোনো কোনোটি আঙ্গিক বৈশিষ্ট্য বা গুণগত।
রবীন্দ্রনাথ সম্ভবত এই ফুলের সৌন্দর্য দেখেই লিখেছেন—
‘ফুলগুলি যেন কথা
পাতাগুলি যেন চারিদিকে তার
পুঞ্জিত নীরবতা।’
তবে এই ফুল নিয়ে গান বাঁধতে ভুল করেননি তিনি। ‘একলা বসে হেরো তোমার ছবি/তপ্ত হাওয়ায় শিথিল মঞ্জরি/গোলকচাঁপা একটি দুটি করি/পায়ের কাছে পড়িছে ঝরি/ঝরি তোমারে নন্দিয়া।’
অধ্যাপক দ্বিজেন শর্মা ‘শ্যামলী নিসর্গ’ গ্রন্থে লিখেছেন—‘পরিপূর্ণ পুষ্পিত গুলাচি আমাদের রূপসী তরুরাজ্যের মধ্যমণি।
ঢাকায় রমনা পার্ক, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, ভিকারুননিসা নূন স্কুল, হাইকোর্ট প্রাঙ্গণ ও সেনানিবাস এলাকায় বেশ কয়েকটি পরিণত গাছ দেখা যায়। এসব গাছের কোনো কোনোটির বয়স এক শ বছরের বেশি। রাজশাহী সিটি করপোরেশন সড়ক বিভাজকে পরিকল্পিতভাবে এই গাছ রোপণ করেছে। তাতে নগর সৌন্দর্যে যুক্ত হয়েছে ভিন্ন এক সৌকর্য। তবে সৌন্দর্যের বিচারে সাদা রঙের বড় আকৃতির প্লুমেরিয়া অবটুসা জাতের ফুল মনোমুগ্ধকর।
শীতের শেষ দিকে এই গাছের সব পাতা ঝরে পড়ে। তখন নিষ্পত্র কাঠগোলাপকে একটি সুন্দর ভাস্কর্যের মতো মনে হয়। বসন্তের শেষভাগে পাতাহীন ডালপালার মাথায় দু-এক থোকা করে ফুল ফুটতে শুরু করে। ফুল ও পাতার পরিপূর্ণতা আসে গ্রীষ্মকালে। তখন দূর থেকে মনে হয় গাছটি যেন প্রকৃতির বিশাল এক পুষ্পস্তবক। তারপর শীত অবধি পর্যায়ক্রমে ফুল ফুটতে থাকে। বর্ণে গন্ধে প্রাচুর্যে এবং অক্লান্ত প্রস্ফুটনে এমন পুষ্পতরু সত্যিই বিরল। এই গাছটি ৮ থেকে ১০ মিটার পর্যন্ত উঁচু হতে পারে। পুরনো কাণ্ড রুক্ষ, অমসৃণ ও খসেপড়া বাকলের চিহ্নে ধূসর। ডালপালাগুলো নরম ও দুধকষভরা।

আমাদের দেশে কাঠগোলাপের কয়েক ধরনের ফুল দেখা যায়। P. alba জাতের গাছ ও ডালের গায়ে অসংখ্য গাঁট, পাতার আগা স্থূলকোণী, ফুল সাদা, পাপড়ি সরু ও লম্বাটে, ভেতরে সামান্য হলুদ। P. obtusa জাতের পাতার আগা গোলাকার, ফুল সাদা, ভেতরে সামান্য হলুদ। P. lutea : পাতার আগা চোখা। সাদা ফুলের ভেতর অনেকটা হলুদ। P. rubra ফুল লাল, গাঢ় লাল, গোলাপি, তাতে বেগুনি, সাদা, হলুদ ও কমলার আঁচ থাকে। দৈবাৎ কোনো কোনো গাছে ফলও দেখা যায়। গাছটির নানা অংশের ঔষধি ব্যবহার রয়েছে। নারকেল তেলের সঙ্গে এর কষ মিশিয়ে চর্মরোগের ওষুধ বানানো হয়। ফুল হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের কাছে পবিত্রতার উৎস, পূজার উপকরণ। বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা মনে করেন এই গাছ মৃত্যুহীন প্রাণের প্রতীক।