হরপ্রসাদ শাস্ত্রী বাংলার নবজাগরণের অগ্রদূত। তিনি বিশিষ্ট ভারততত্ত্ববিদ ও প্রাচ্যবিদ্যাবিশারদ। অন্যদিকে সংস্কৃতের খ্যাতনামা পণ্ডিত ছিলেন। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের প্রথিতযশা গবেষক, সাধক ও ইতিহাস রচয়িতা।
তিনি বাংলা সাহিত্যের প্রাচীন নিদর্শন চর্যাপদের আবিষ্কারক। ১৯০৭ সালে নেপালের রাজদরবার থেকে আবিষ্কার করেন। প্রাচ্যবিদ্যার প্রতি অসম্ভব নিষ্ঠা ও ভালোবাসার জন্য তিনি প্রাচীন বাংলার এই অমূল্য সাহিত্যসম্ভার আবিষ্কার করতে সক্ষম হয়েছেন। সংস্কৃত সাহিত্য, ভাষাতত্ত্ব, ইতিহাস, বাংলা লিপি, বৌদ্ধ বিদ্যা, ব্রাহ্মণ্য বিদ্যা, উপন্যাস, স্মৃতিকথা, শিলালিপি-পাণ্ডুলিপির পাঠোদ্ধার ও সম্পাদনা, অনুবাদ প্রভৃতি তাঁর অনন্য অবদান।
তিনি ১৮৫৩ সালের ৬ ডিসেম্বর (১২৬০ বঙ্গাব্দের ২১ অগ্রহায়ণ) উত্তর চব্বিশ পরগনার নৈহাটিতে জন্মগ্রহণ করেন। আদি নিবাস ছিল বাংলাদেশের খুলনা জেলার কুমিরা গ্রামে। পিতার নাম রামকমল ন্যায়রত্ন, মাতা চন্দ্রমণি দেবী। মাত্র আট বছর বয়সে তিনি পিতাকে হারান।
বাল্যকালে তাঁর নাম ছিল শরত্নাথ ভট্টাচার্য। একবার কঠিন অসুখে তাঁর খুব খারাপ অবস্থা হয়। তখন সবার বিশ্বাস হয় যে তিনি শিবের আশীর্বাদে রোগ থেকে আরোগ্য লাভ করেছেন। সেই থেকে তাঁর নাম হয় ‘হরপ্রসাদ’। ওই সময় তাঁর জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা সংস্কৃত পণ্ডিত নন্দকুমার ন্যায়চঞ্চু মুর্শিদাবাদ জেলার কান্দীতে ‘অ্যাংলো বেঙ্গল’ স্কুলে ভর্তি করান।
১৮৬২ সালে নন্দকুমার ন্যায়চঞ্চু যক্ষ্মা রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। তখন তাঁর জীবনে চরম দুর্গতি নেমে আসে। এ অবস্থায় তিনি নৈহাটিতে ফিরে এসে গ্রামের কাঁঠালপাড়ার একটি টোলে লেখাপড়া শুরু করেন। পরে ভাইয়ের বন্ধু ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর তাঁর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ঈশ্বরচন্দ্র তাঁকে কলকাতায় নিয়ে নিজের ছাত্রাবাসে রেখে সপ্তম শ্রেণিতে ভর্তি করান। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয়, কিছুদিন পর ছাত্রাবাসটি বন্ধ হয়ে গেলে কলকাতার বউবাজারের গৌরমোহন মুখোপাধ্যায়ের বাড়িতে ছাত্র পড়িয়ে নিজে রান্না করে খেতেন। তবে পরীক্ষার ফল ছিল সাফল্যমণ্ডিত। তিনি ১৮৭১ সালে এন্ট্রান্স পরীক্ষায় সবচেয়ে বেশি নম্বর পেয়ে বৃত্তি লাভ করেন, ১৮৭৩ সালে কৃতিত্বের সঙ্গে এফএ (ফার্স্ট আর্টস) পাস করেন, ১৮৭৬ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সংস্কৃত বিষয়ে প্রথম স্থান লাভ করে বিএ পাস করেন এবং ১৮৭৭ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে ‘শাস্ত্রী’ উপাধিতে ভূষিত করে। ১৮৭৮ সালে হেয়ার স্কুলে শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। পরে তিনি লখনউয়ের ক্যানিং কলেজে সংস্কৃতের অধ্যাপক ছিলেন। ১৮৮৩ সালে তিনি কলকাতার সংস্কৃত কলেজে অধ্যাপক হিসেবে নিয়োজিত হন। ১৮৯৫ সালে তিনি কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে অধ্যাপনা শুরু করেন। ১৮৯৮ সালে ভারত সরকারের দেওয়া মহামহোপাধ্যায় উপাধিতে ভূষিত হন। ১৯০০ সালে তিনি ওই কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। সেখান থেকে তিনি ১৯০৮ সালে অবসর গ্রহণ করেন। পরে তিনি ‘ব্যুরো অব ইনফরমেশন ফর দ্য বেনিফিট অব সিভিল অফিসার ইন বেঙ্গলি ইন হিস্ট্রি, রিলিজন, কাস্টম্স অ্যান্ড ফোকলোর অব বেঙ্গল’ নামক গবেষণাকেন্দ্রের প্রধানরূপে দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। ১৯২১ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমন্ত্রণে সংস্কৃত ও বাংলা বিভাগের প্রধান হিসেবে নিয়োজিত হন। ১৯২৪ সাল পর্যন্ত তিনি ওই পদে অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি সংস্কৃত সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ কবি কালিদাসের কাব্য-নাটক নিয়ে লেখালেখি ও গবেষণা করেন। তাঁর রচিত ও সম্পাদিত গ্রন্থসমূহ হচ্ছে—‘হাজার বছরের পুরাণ বাঙ্গালা ভাষায় বৌদ্ধগান ও দোঁহা’ (১৯১৬), ‘বাল্মীকির জয়’ (১৮৮৬), ‘কাঞ্চন মালা’ (১৯১৬), ‘বেনের মেয়ে’ (১৯২০), ‘মেঘদূত ব্যাখ্যা’, ‘মেঘনাদবধ কাব্যের নাট্যরূপ’, ‘শ্রেষ্ঠ প্রবন্ধ’, ‘বৌদ্ধ ধর্ম’, ‘এ শর্ট হিস্ট্রি অব ইন্ডিয়া’ (১৯০৭), ‘সন্ধ্যাকর নন্দীর রামচরিত’ (১৯১০) প্রভৃতি। এ ছাড়া বিভিন্ন জার্নাল ও পত্রপত্রিকায় তাঁর অর্ধশতাধিক প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। সেগুলোর মধ্যে অন্যতম—ভারত মহিলা, বেদ ও বেদ ব্যাখ্যা, কালিদাস শেকসপিয়ার, মেঘদূত, রঘুবংশ, কালিদাসের মেয়ে দেখানো, রামের ছেলেবেলা, বঙ্কিমবাবু ও উত্তরচরিত, সীতার স্বপ্ন, ইরাবতী, বিরহে পাগল, শকুন্তলার মা, রঘুবংশ, রঘুকাব্য বড়ো কিসে, অজবিলাপ ও রতিবিলাপ, ব্রহ্মা প্রবন্ধ, নাট্যকলা, ব্রাত্য, ভরতের নাট্যশাস্ত্র, কালিদাসের অভিধান, বাংলা শকুন্তলার জুবিলি প্রভৃতি। তাঁর প্রকাশিত প্রথম গবেষণা প্রবন্ধ ‘ভারত মহিলা’ প্রকাশের জন্য ‘হোলকার পুরস্কার’ লাভ করেন। তাঁকে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রতিষ্ঠান সম্মানসূচক ডিগ্রি প্রদান করেছে। সেগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—১৮৮৮ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে আজীবন ফেলোশিপ ডিগ্রি প্রদান; ১৯১১ সালে সিআইই উপাধি, ১৯২১ সালে ইংল্যান্ডের রয়াল সোসাইটির অনারারি মেম্বার মনোনয়ন; তাঁর অসামান্য অবদানের জন্য ১৯২৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে সম্মানসূচক ডি.লিট ডিগ্রি প্রদান করে। তাঁর সৃষ্টিশীলতায় সমাজের অতি সাধারণ মানুষের জীবন, শিক্ষা, সংস্কৃতি, ভাষা, কৃষ্টি প্রভৃতি আজও সাহিত্য ও ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে অম্লান রয়েছে। অতএব বাংলার মানুষের জীবন ও চৈতন্যবোধের বহু ইতিবৃত্ত আলোর পথ দেখায়। আজ সেই মহামনীষীর জন্মদিনে বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি।