সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬, ০৪:২৪ অপরাহ্ন
নোটিশঃ
জনপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল প্রমিনিউজবিডি ডটকম এর পরিক্ষামূলক সম্প্রচার চলছে। সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। তার মানে এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা লেখার অংশবিশেষ কিংবা ছবি বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রচার বা প্রকাশ করা নিষিদ্ধ।

মরমি সাধক হাছন রাজা

ঢাকা অফিস
  • আপডেট: শুক্রবার, ৫ ডিসেম্বর, ২০২৫
  • ৭ বার পড়া হয়েছে
হাছন রাজা বাংলার লোকসংগীতজগতের একজন প্রধান দার্শনিক। মানবজীবনকে তিনি গভীরতম উপলব্ধিতে বোঝার চেষ্টা করেছেন। নিজের ভেতরের খবর নিতে গিয়ে পরমজ্ঞানপ্রাপ্তি তাঁর দর্শনের মূল ভিত্তিপ্রবাহ।

১৮৫৪ সালে বর্তমান সুনামগঞ্জ জেলার তেঘরিয়া (লক্ষ্মণশ্রী) গ্রামে জন্মলাভ করেন মরমি কবি হাছন রাজা।

তখনকার সুনামগঞ্জ জেলা শহর  নয়, ছিল অজপাড়াগাঁয়ের মতো। সেখানেই প্রকৃতির মাঝে বেড়ে উঠেছিলেন হাছন রাজা। ১৮৬৫ সাল। হাছন রাজা তখন ১৩-১৪ বছরের বালক।
স্বভাবগত কারণে মাকে প্রশ্ন করলেন, তাঁকে নিয়ে মায়ের এত চিন্তা, এত ভাবনা কিসের? 

উত্তর পেলেন, হাছন রাজার জন্মের আগে মা হুরমত জাহান বিবির গর্ভে আসা তিন ছেলে ও এক মেয়ে একসময় মহামারি বসন্ত রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। একই বছরের মাথায় স্বামী আমির বক্স চৌধুরীও স্ত্রীকে রেখে পরলোকে পাড়ি জমান। সন্তান ও স্বামীহারা হুরমত জাহান বিবির যখন দিশাহারা অবস্থা, তখন তাঁর একমাত্র ভাই তোরন মিয়া ওরফে ইমদাদ আজিজ চৌধুরী বোনকে অনেক বুঝিয়েসুঝিয়ে আরেকটি বিয়েতে রাজি করান। হুরমত জাহান বিবি স্বামীর আপন খালাতো ভাই আলী রাজার সঙ্গে দ্বিতীয় বিবাহে আবদ্ধ হন।

আর এই ঘরেই জন্ম হয় মরমি সাধক পুরুষ হাছন রাজার। 

উল্লেখ্য, কৈশোর বয়সেই হাছন রাজার এক মরমি প্রভাববলয় সৃষ্টি হয়। সেই সময় থেকে তিনি কাব্য রচনা শুরু করেন। একটি গান থেকে তাঁর পরিচয় পাওয়া যায়—

‘প্রেমের নাচন নাচ হাছন

প্রেমের নাচন নাচো

ভালা করিয়া নাচো হাছন কয়দিন আর আছো।

নাচো নাচো হাছন রাজা হইয়া বেহাল

নাচনের মধ্যে কাটে তোমার বাল্যকাল।

’ 

তাঁর এই কান্নার মধ্যে ফুটে ওঠে মানুষের প্রতি তাঁর প্রেম, ভালোবাসা ও নশ্বর জীবনের মরমি চিন্তা-চেতনা।

১৮৭০ সাল। হাছন রাজার বয়স মাত্র ১৬ বছর। তখনো তাঁর জীবনে তিনজন মানুষ অভিভাবক হয়ে চারপাশ ঘিরে আছেন—মা, বাবা এবং তাঁর বৈমাত্রেয় বড় ভাই উবায়দুর রাজা। সেদিন মা তেঘরিয়ার বাড়িতে চার দেয়ালের ভেতরে ঘরের দৈনন্দিন কাজে ব্যস্ত, আর ওদিকে বাবা ও বড় ভাই বিশ্বনাথে রামপাশার বাড়িতে অবস্থান করছিলেন। ভরা বর্ষায় হাছন রাজা তাঁর নৌকাখানি ভাসিয়েছেন সুরমার জলে। ভাসতে ভাসতে পশ্চিমমুখী তাঁর নৌকা যখন পাশের হিন্দু জমিদারবাড়ির কাছে এসে পৌঁছে, শান-বাঁধানো একটি ঘাটের নিকটবর্তী হতেই ১৪ বছরের এক অতি সুন্দরী বালিকাকে দেখে অভিভূত হন। স্তম্ভিত হন তার নিখুঁত সৌন্দর্যে। ১৬ বছরের যুবক হাছন রাজা মায়ের কাছে ফিরে আসেন এবং হিন্দু জমিদারকন্যার কথাটি বলেন। কিন্তু হিন্দু-মুসলিম উভয় অভিভাবক পর্যায়ে সেই অনুভূতি প্রশ্রয় পেল না। ফলে চিরকালের জন্য হাছন রাজার সেই অনুভূতি সুপ্তই রয়ে গেল। এর বহিঃপ্রকাশ পাই তাঁর একটি গানে—

‘ঝলমল ঝলমল করে তারা ঝলমল ঝলমল করে

নুরের বদন সই প্রেয়সী নুরের বদন সই

তারে ছাড়া বাড়িত আমি কেমন করে রই।

ওরে আমার আড়িপড়ি ভাই

তারে আমার প্রাণের মাঝে চাই

হিন্দু আর মুসলমান আমি কিছুই বুঝি নাই।’

পরের বছর ১৮৭১ সালে হাছন রাজা সুনামগঞ্জের লক্ষ্মণশ্রীর বাড়িতে যখন তাঁর বাবাসহ অবস্থান করছিলেন, সেই সময় খবর এলো—তাঁর বৈমাত্রেয় বড় ভাই খুবই অসুস্থ, শয্যাশায়ী। রামপাশা গেলে পরে বড় ভাই উবায়দুর রাজার মৃত্যু হাছন রাজা ও তাঁর বাবাকে ভাবিয়ে তোলে। সেই শোক না পোহাতেই বাবা আলী রাজাও মৃত্যুমুখে পতিত হন।

এমন অবস্থায় মা হুরমত জাহান বিবি ২০ বছর বয়সী হাছন রাজাকে বিয়ে করান।

দুই পুত্র, এক কন্যা জন্মলাভের পর হাছন রাজার প্রথম স্ত্রী পরলোকে পাড়ি জমান। তাঁর জীবনে দ্বিতীয় স্ত্রী এসে দুই কন্যাসন্তান উপহার দেন। উল্লেখ্য, এই কন্যাদ্বয়ের একজনের পুত্রসন্তান হলেন পরবর্তীকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রখ্যাত দার্শনিক অধ্যাপক দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফ। হাছন রাজা এরপর আরো চারজন স্ত্রী ঘরে আনেন। পর পর স্ত্রী বিয়োগে তিনি শোকাহত থাকেন। ছয় স্ত্রী হারানোর পর হাছন রাজা ১৮৯৫ সালে সর্বশেষ স্ত্রী লবজান চৌধুরীকে বিয়ে করেন। সে কারণেই আমি হাছন রাজার সর্বকনিষ্ঠ পুত্রসন্তানের বংশধর। এইভাবে হাছন রাজার আপনজন হারানোর পালা আর শেষ হয় না। তিনি দেখলেন, শুধু আত্মীয়-স্বজন নয়, তাঁর পাড়া-প্রতিবেশী, সমাজ ও দেশের মানুষ যেন তাঁকে ক্রমেই ছেড়ে চলে যাচ্ছে।

১৮৯৭ সালের কথা। হাছন রাজা মাত্র ৪৩ বছরের এক যৌবন-উত্তীর্ণ পুরুষ। ১২ এপ্রিল ১৮৯৭ তারিখে তিনি এক বিশাল ভূমিকম্পের মুখোমুখি হন। আসাম, সিলেট জুড়ে ৮.৮ মাত্রার ভূকম্পনে ধ্বংসের লীলাখেলায় তিনি তাঁর স্রষ্টার অস্তিত্ব খুঁজে পান। তাঁর অন্তরাত্মা কেঁপে ওঠে। গানে তিনি উল্লেখ করেন, এই ভূমিকম্পের বেলায়ই তিনি তাঁর কাছে যেতে পেরেছিলেন, আবার তাঁর সঙ্গে দেখা হয়েছিল, তাঁর রূপ দেখলেন, ঝলক দেখলেন, তাঁকে আবারও জড়িয়ে ধরলেন, তাঁর মধ্যে বিলীন হয়ে গেলেন। গানে তিনি বলেছেন—

‘ভৈশালের (ভূমিকম্প) বৎসরে বন্ধে দরশন দিলো রে

দয়া করিয়া আমার সঙ্গে কথাবার্তা কইলো রে

আইলো রে আইলো রে বন্ধু আইলো রে

চান্দমুখ দেখিয়া হাছন রাজা পাগল হইলো রে।

হাছন রাজার এই চান্দমুখ আর কেউ নন। তিনি তাঁর স্রষ্টা, যাঁকে তিনি সম্বোধন করেছেন তাঁর পিয়ারী, তাঁর পেয়ারা কিংবা সখি ও সখাস্বরূপ। গানে দেখা যায়—

‘হাছন রাজার রূপটা দেখি ফালদি ফালদি উঠে

ছিঁড়া বাড়া হাছন রাজার বুকের মাঝে কুটে।

ছটফট ছটফট করে হাছন দেখিয়া চান্দমুখ

হাছন জানের মুখটা দেখি জন্মের গেলো দুখ।

নিশা লাগিলো রে, বাঁকা দুই নয়নে নিশা লাগিলো রে—

হাছন রাজা পেয়ারীর প্রেমে মজিলো রে।’

এই গান প্রকাশের পরপরই ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জমিদার বন্ধু জিজ্ঞেস করলেন, স্রষ্টাকে দেখতে গিয়ে হাছন রাজা পেয়ারীদের দেখছেন কেন? আমরা পেয়ারারা গেলাম কোথায়? উত্তরে হাছন রাজা জানালেন—

‘ও বন্ধু অন্তরিয়া রে, আমি তরে ডাকিরে বন্ধু

দেখা দিয়া প্রাণ বাঁচাও রে,

হাছন রাজা বলে সখা, তুমি যদি না দেও দেখা

আমার আর নাই রক্ষা, মরমু তর লাগিয়া রে।’

সব মানুষের জন্য হাছন রাজার মনের টান, প্রেম-ভালোবাসার কমতি ছিল না। তাইতো তিনি গাইতে গেলেন—

‘কেন যে আসিলায়, ভবে মানুষ কেন হইলায় না

মানুষ যদি হইলায় নারে, পরের কার্য করলায় না।

হাছন রাজা বলে ওরে শুনো শুনো ভাই

মানুষের উপকার বিনে আর কিচ্ছু নাই।’

এভাবে ধর্ম-বর্ণ-নির্বিশেষে হাছন রাজা তাঁর স্রষ্টাকে খুঁজে পেয়েছিলেন জগত্জুড়ে—

‘হাছন রাজা কয়, এক বিনে দুই নয়, আল্লাহ জগত্ময়

কোনো জায়গায় ছাড়া নয়, মাবুদ আল্লা হয়।

হাছন রাজা কয়, আল্লাহ বিনে কিচ্ছু নয়

ত্রিজগৎ জুড়িয়া দেখি কেবল আল্লাহময়।’

বিশ্বময় এই সত্তাকে দেখতে গিয়ে হাছন রাজা তাঁর নিজের মাঝে আপন সত্তা আবিষ্কার করেছিলেন। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এ জন্যই অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে অভিভূত হয়ে বলে উঠেছিলেন—

‘I was just overwhelmed with that philosophical doctrine.’

 

কবিগুরু বিস্মিত হয়ে হাছন রাজার এই গানটি অনুবাদ করেন—

‘বিচার করি চাইয়া দেখি সকলেই আমি

সোনা মামি, সোনা মামি গো,

আমারে করিলায় বদনামি।

জিয়ন মরণ নাইরে আমার, ভাবিয়া দেখো ভাই

ঘর ভাঙ্গিয়া ঘর বানানি, এই যে দেখিতে পাই।

পাগল হইয়া হাছন রাজা, কিসেতে কি কয়

মরব মরব দেশের লোকে, মোর কথা যদি লয়।

জিহ্বায় বানাইয়া আছে, মিঠা আর তিতা

জীবের মরণ নাই রে, দেখো সর্বদাই জীতা।

আপন চিনিলে দেখো, খোদা চিনা যায়

হাছন রাজায় আপন চিনিয়ে এই গান গায়।’

১৯২২ সালের ৬ ডিসেম্বর হাছন রাজার মহাপ্রয়াণ ঘটে। এর কয়েক বছর পরই ১৯২৬ সালে বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম সিলেটে এসে তাঁর একান্ত বন্ধু দেওয়ান একলিমুর রাজা, যিনি হাছন রাজার তৃতীয় পুত্র, তাঁকে ধরে বসলেন, হাছন রাজার বাড়ি সুনামগঞ্জের কুঁড়েঘরটি দেখার খুবই ইচ্ছা। কিন্তু হায়, ওই বছরই বিদ্রোহী কবি ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়ে ঢাকায় ফিরে যান। ১৯২৮ সালে হাছন রাজার বাড়ি দেখার জন্য আবারও কবির মনে অভিলাষ জাগে। কিন্তু সিলেটে হাছন রাজার পুত্রকে না পেয়ে সুনামগঞ্জে যাওয়া সম্ভব হলো না। বিখ্যাত ঔপন্যাসিক হুমায়ূন আহমেদ জানিয়েছেন, আমেরিকার শিকাগোতে গিয়ে তিনি হাছন রাজার গানের মমার্থ খুঁজে পেয়েছিলেন—

‘আঁখি মঞ্জিয়া দেখো রূপ রে,

আঁখি মঞ্জিয়া দেখো রূপ

আরে দিলের চক্ষে চাইয়া দেখো বন্ধুয়ার স্বরূপ রে।

হাছন রাজার রূপ দেখিয়া হইয়া ফানা-ফিল্লা

হু হু হু হু ইয়াহু ইয়াহু, বলো আল্লা আল্লা রে।’

চোখ বুজে অন্তর্দৃষ্টিতে যাকে দেখা যায়, হাছন রাজা তাঁর কথা মর্মে মর্মে বুঝতে গিয়ে গেয়ে ওঠেন—

‘যে বলে খোদা দেখে না, সে তো চিরদিনের কানা

রুয়ানীর সেই কানা, আছে মোর জানা।

কেবল এক খোদা দেখি, আর যত দেখি ফাঁকি

ভালো করিয়া দেখ রে আঁখি, আল্লা বিনে কিছু না।’

অবাক হওয়ার মতো বিষয় যে হাছন রাজা ১৫০ বছর আগে সমাজ, দেশের সমস্যা নিজ চোখে দেখেছিলেন। তাঁর অধ্যাত্ম্যচেতনার এইভাবে উন্মেষ ঘটে—

‘এই দেশে মানুষ নাই রে, প্রায়ই অহুঁশ

ভবের মায়ায় ভুলিয়ে আছে, হইয়ে বেহুঁশ।

দুনিয়া দুনিয়া কইরা হইছে শয়তানের চেলা

কে তাদের ঠগাইব, এই তাদের খেলা।

হাছন রাজা কান্দন করে, ধরিয়া প্রভুর পাও

লোকের বদলা মারিয়া মোরে, সকলকে তরাও।’

সত্যিকার অর্থে হাছন রাজা নিজেকে খুঁজে পেয়েছেন একজন আওলা, জাওলা, বাউলা, পাগল, ফকির এবং একজন প্রেমিক হিসেবে। এই প্রেম আসলে জাগতিক নয়, স্রষ্টার সঙ্গে সৃষ্টির প্রেম—

‘হাছন রাজায় কয়, আমি কিছু নয় রে, আমি কিছু নয়

অন্তরে বাহিরে দেখি (কেবল) দয়াময়।

প্রেমেরি বাজারে হাছন হইয়াছে লয়

তুমি বিনে হাছন রাজায় কিছু না দেখয়।

তুমি আমি, আমি তুমি ছাড়িয়াছি ভয়

উন্মাদ হইয়া হাছন নাচন করয়।’

 

ভালো লাগলে সংবাদটি শেয়ার করুন

এই বিভাগের আরো সংবাদ
© All rights reserved © 2026 PromiNewsBD.com
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com