সার্বিক এই অবস্থায় কবে ঘোষণা হতে যাচ্ছে নির্বাচনের তফসিল—এ নিয়ে কৌতূহল এখন অনেকের। ভোট নিয়ে ‘শঙ্কা’ কাটাতে রাজনৈতিক দলগুলোও তফসিলের তারিখ জানাতে তাগাদা দিয়ে আসছে।
সম্প্রতি রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনের মিডিয়া সেন্টারে ব্রিফিংয়ে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ বলেন, ‘ভোটগ্রহণের ৬০ দিন আগে তফসিল ঘোষণা করা হবে। প্রধান উপদেষ্টার দপ্তর থেকে আমাদের বলা হয়েছে আগামী রমজানের আগে ভোটের ব্যবস্থা করতে। ১৭ বা ১৮ ফেব্রুয়ারি রমজান শুরু।
নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, আগামী বছরের ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন আয়োজনের লক্ষ্যে প্রস্তুতি প্রায় গুছিয়ে এনেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। চলতি মাসের মধ্যে প্রাক-প্রস্তুতি শেষ করে ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে অথবা প্রথমার্ধেই নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার চিন্তা আছে কমিশনের। নতুন করে জাতীয় নির্বাচনের দিন গণভোটেরও সিদ্ধান্ত হয়েছে। ফলে ইসির কর্মপরিকল্পনায় কিছুটা পরিবর্তন করতে হবে। এ ছাড়া বাগেরহাটের সীমানা নিয়ে এক ধরনের আইনি জটিলতা তৈরি হয়েছে। ফলে ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে তফসিল ঘোষণার নিয়ে কিছুটা অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।
ইসি সূত্র জানায়, তফসিল ঘোষণার আগে নির্বাচন কমিশন রাষ্ট্রপতির সঙ্গে দেখা করতে যেতে পারে। তবে এ বিষয়ে এখনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
গত বৃহস্পতিবার রাজনৈতিক দলগুলোর সংলাপ শেষ করে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের নেতৃত্বে অন্য কমিশনাররা, ইসি সচিব ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নিয়ে একটি বৈঠক হয়েছে। এ বৈঠকে নির্বাচন সামনে রেখে একজন নির্বাচন কমিশনারের নেতৃত্বে ‘আইন-শৃঙ্খলা কেন্দ্রীয় সমন্বয় সেল’ গঠনের সিদ্ধান্ত হয়। এই সেল নির্বাচন ঘিরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও প্রযুক্তি ব্যবহার করে অপতথ্য, মিথ্যা তথ্য, গুজব, এআইয়ের অপব্যবহার, ভুয়া খবর, অপপ্রচার রোধে ব্যবস্থা নেবে এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সমন্বয়ে সঠিক তথ্য সরবরাহে দ্রুত উদ্যোগ নেবে।
গত ২০ অক্টোবর বিভিন্ন বাহিনী ও গোয়েন্দা প্রধানদের নিয়ে আইন-শৃঙ্খলা সংক্রান্ত মতবিনিময় ও প্রাক-প্রস্তুতিমূলক বৈঠক করে নির্বাচন কমিশন। ওই সভায় প্রস্তাব আসে, এবারের সংসদ নির্বাচনে আগে-পরে মিলিয়ে আট দিন আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী মাঠে রাখা দরকার।
এ ছাড়া নির্বাচনী প্রচারণায় সাধারণ নাগরিকদের ড্রোন ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা, ভোট পর্যবেক্ষণে বডি-অন ক্যামেরা ব্যবহার এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গুজব ও অপপ্রচার ঠেকাতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও সাইবার মনিটরিং প্রযুক্তি ব্যবহারের প্রস্তাবও আসে।
গত ৩০ অক্টোবর ইসির আন্ত মন্ত্রণালয় বৈঠক হয়। ওই বৈঠকে নির্বাচনের সময় এসএসসি বা এইচএসসি পরীক্ষার সময়সূচি যেন নির্ধারণ করা না হয় সেদিকে সতর্ক থাকতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে বলা হয়। এ ছাড়া নির্বাচন সম্পর্কিত অবকাঠামো উন্নয়ন, ভোটকেন্দ্রের লজিস্টিকস, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি, বিদ্যুৎ সরবরাহ, স্বাস্থ্য সহায়তা ও বাজেট ব্যবস্থাপনা নিয়ে আলোচনা হয়। স্থানীয় সরকার বিভাগ, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর এবং মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরকে নির্দেশ দেওয়া হয় যেন তারা নির্বাচনী কাজে ব্যবহৃত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো আগেভাগে প্রস্তুত করে রাখে।
ইসি সচিবালয় সূত্র জানায়, আগামী ২৭ নভেম্বর আইন-শৃঙ্খলা নিয়ে পরিকল্পনা ও দিকনির্দেশনামূলক বৈঠক করবেন সিইসি। বৈঠকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিবসহ বাহিনী প্রধান ও সংস্থা, বিভাগের প্রধানদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। এ ছাড়া আগামী ৩০ নভেম্বর বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ, কর্তৃপক্ষের সঙ্গে নিয়োগ, পরিকল্পনা, সমন্বয় ও দিকনির্দেশনামূলক আলোচনা করার সময় নির্ধারণ করা হয়েছে। মন্ত্রিপরিষদসচিবসহ সংশ্লিষ্ট সব মন্ত্রণালয়, বিভাগের প্রধানদের নিয়ে এই বৈঠক হবে। এই দুটি বৈঠকের পরই তফসিল ঘোষণার পথে হাঁটবে নির্বাচন কমিশন। এর আগে গণভোট অনুষ্ঠান ও বাগেরহাটের সীমানা নির্ধারণ নিয়েও ইসিকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
নির্বাচন কমিশন এখন সরকারের কাছ থেকে গণভোটের অধ্যাদেশ হাতে পাওয়ার অপেক্ষায়। বাগেরহাটের আসন নিয়ে উচ্চ আদালতের আদেশের বিরুদ্ধেও আপিল করেছে নির্বাচন কমিশন।
এসব বিষয়ে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের সচিব আখতার আহমেদ গত রাতে কালের কণ্ঠকে জানান, বাগেরহাটের আসন নিয়ে উচ্চ আদালতের আদেশের বিরুদ্ধে নির্বাচন কমিশন আপিল করেছে। গতকাল পর্যন্ত গণভোটের অধ্যাদেশ পায়নি নির্বাচন কমিশন। কবে নাগাদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা হতে পারে—এ প্রশ্নে তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশন যেদিন ঘোষণা দেবে সেদিনই সবাই জানতে পারবে।
উল্লেখ্য, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল জাতির উদ্দেশে ভাষণের মাধ্যমে প্রধান নির্বাচন কমিশনার ঘোষণা করে থাকেন।
আগের ১২টি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল : নির্বাচন কমিশনের তথ্য বলছে, দেশে ৬০ দিন সময় হাতে রেখে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হয় ১৯৭৩ সালের প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে। ওই বছরের ৭ জানুয়ারি রবিবারে তফসিল ঘোষণা করে ভোটগ্রহণ হয় ৭ মার্চে। এ ছাড়া চতুর্থ ও পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যথাক্রমে তফসিল ঘোষণার ৬৬ দিন এবং ৭৩ দিন পর ভোটগ্রহণেরও নজির রয়েছে।
১৯৭৮ সালে দ্বিতীয় সংসদ নির্বাচনে তফসিল ঘোষণা হয় ওই বছরের ২ ডিসেম্বর শনিবারে। ভোটগ্রহণ হয় ৫৪ দিন পর ১৮ ফেব্রুয়ারি। ১৯৮৬ সালের তৃতীয় সংসদ নির্বাচনে তফসিল ঘোষণা হয় ওই বছরের ২ মার্চ রবিবারে। এই নির্বাচন বিএনপিসহ বেশ কিছু দল বর্জন করলেও আওয়ামী লীগ অংশগ্রহণ করে। ভোটগ্রহণ হয় ৪৭ দিন পর ৭ মে। চতুর্থ সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা হয় ১৯৮৭ সালের ২৬ ডিসেম্বর শনিবারে। একপক্ষীয় এই নির্বাচনে ভোটগ্রহণ হয় ৬৬ দিন পর ১৯৮৮ সালের ৩ মার্চ। পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা হয় ১৯৯০ সালের ১৫ ডিসেম্বর শনিবার। ভোট হয় ৭৩ দিন পর ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি।
ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা হয় ১৯৯৫ সালের ৩ ডিসেম্বর রবিবারে। পুনঃতফসিল করে ভোটগ্রহণ হয় ৫৯ দিন পর ১৯৯৬ সালের ১ ফেব্রুয়ারি। এই নির্বাচন আওয়ামী লীগ, জামায়াতে ইসলামীসহ বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো বর্জন করে। সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা হয় ১৯৯৬ সালের ২৭ এপ্রিল শনিবার। ভোটগ্রহণ হয় ৪৫ দিন পর ওই বছরের ১২ জুন। অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা হয় ২০০১ সালের ১৯ অগাস্ট রবিবার। ভোটগ্রহণ হয় ৪২ দিন পর ওই বছরের ১ অক্টোবর। নবম সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা হয় ২০০৮ সালের ২ নভেম্বর রবিবারে। সব দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার জন্য তিনবার পুনঃতফসিল করে ভোটগ্রহণ হয় ৫৬ দিন পর ওই বছরের ২৯ ডিসেম্বর। দশম সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা হয় ২০১৩ সালের ২৫ নভেম্বর সোমবার। ভোটগ্রহণ হয় ৪০ দিন পর ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি। একতরফা এই নির্বাচনের আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা প্রায় অর্ধেক আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। বিএনপি ও জামায়াতসহ বিরোধী সব রাজনৈতিক দল এ নির্বাচন বর্জন করে। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা হয় ২০১৮ সালের ৮ নভেম্বর বৃহস্পতিবারে। পুনঃতফসিল করে ব্যাপক কারচুপির এ নির্বাচনে ভোটগ্রহণ হয় ৫১ দিন পর ওই বছরের ৩০ ডিসেম্বর। সর্বশেষ দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা হয় ২০২৩ সালের ১৫ নভেম্বর রবিবারে। একপক্ষীয় এই নির্বাচনের ভোটগ্রহণ হয় ৫২ দিন পর ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারি। এ নির্বাচনের সাত মাস পর গত বছরের ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে।