অনুষ্ঠানে সৈয়দ রেফাত আহমেদ বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে জ্ঞান নিজেই একটি অস্ত্রে পরিণত হয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সৃষ্ট ভুল ও বিকৃত তথ্য প্রকৃত সত্যকে আড়ালের মাধ্যমে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করছে। এর ফলে পারস্পরিক গণতান্ত্রিক আলোচনা-বোঝাপড়া ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অন্যদিকে অর্থনৈতিক-বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞা আর ঋণের চাপে অর্থনীতি ভেঙে পড়ছে।
জুলাই অভ্যুত্থানকে অভূতপূর্ব উল্লেখ করে প্রধান বিচারপতি বলেন, “এই জাগরণ রাষ্ট্রকে তার সাংবিধানিক জীবনের ‘ব্যাকরণ’ নিয়ে পুনরায় ভাবতে বাধ্য করেছে। এটি সরকারকে মনে করিয়ে দিয়েছে, আইনের শাসন কেবল একটি আমলাতান্ত্রিক আনুষ্ঠানিকতা বা উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া কোনো অলংকার নয়। বরং এমন একটি ‘নৈতিক কাঠামো’ যা একটি সরকারের বৈধতা নিশ্চিত করে। আর আমাদের সংবিধান হচ্ছে আইনের শাসনের নৈতিক পাঠ, যা ন্যায্যতা, যুক্তি এবং জনগণের ইচ্ছার ওপর প্রতিষ্ঠিত।
”
প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘জুলাই অভ্যুত্থান সংবিধানকে পাল্টে দেওয়ার কথা বলেনি। বরং সংবিধানের সঙ্গে আমাদের সম্পৃক্ততাকে আরো দৃঢ়, সুসংহত করতে চেয়েছে। যাতে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও দায়িত্বশীলতা জনসাধারণের বিবেকের মূলমন্ত্র হয়ে ওঠে।’
জুলাই অভ্যুত্থান এবং অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে বিচার বিভাগ কিভাবে কাজ করেছে, তা তুলে ধরে প্রধান বিচারপতি বলেন, সাংবিধানিক অঙ্গগুলোর মধ্যে বিচার বিভাগই একমাত্র কার্যকরী ভূমিকা পালন করেছে। ওই সময়টাতে বিচার বিভাগকে একই সঙ্গে নমনীয় এবং দৃঢ় অবস্থান নিতে হয়েছিল।
প্রধান বিচারপতি হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর বিচার বিভাগ সংস্কারে নিজের ঘোষিত রোডম্যাপের ভিত্তিতে বিভিন্ন অর্জনের কথা উল্লেখ করেন প্রধান বিচারপতি। তিনি বলেন, যেকোনো সংস্কার বা নকশা যত ভালোই হোক না কেন, তা কেবল কাঠামোর ওপর নির্ভর করে টিকে থাকতে পারে না। এটি টিকে থাকে ‘মালিকানা’র ওপর।
চলমান রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক পর্যালোচনা একটি নতুন সাংবিধানিক ব্যবস্থা তৈরি করতে পারে, এমন ইঙ্গিত দিয়ে প্রধান বিচারপতি বলেন, তখন বিচার বিভাগকে সবচেয়ে বড় পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হবে। কিভাবে সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা বজায় রেখে বৃহত্তর এই পুনর্গঠনকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যায়, সেই পরীক্ষা দিতে হবে বিচার বিভাগকে। দৃষ্টিভঙ্গি, প্রজ্ঞা এবং সাহসই নির্ধারণ করে দেবে বিচার বিভাগ তখন কতটা প্রাসঙ্গিক।
প্রধান বিচারপতি বলেন, দেশ একটি নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে বিচার বিভাগকে নীতিগতভাবে স্থির থাকতে হবে। একই সঙ্গে পরিবর্তনশীল বৈশ্বিক বাস্তবতা নিয়েও সতর্ক থাকতে হবে। বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক শক্তি, জোট, ক্রমবর্ধমান সংকট, জ্ঞানের অস্ত্রায়ন, অর্থনৈতিক বিভাজন, জলবায়ু পরিবর্তনের মধ্যে কৌশলগত বাস্তুতন্ত্র গঠন করে সাংবিধানিক প্রতিশ্রুতিগুলোকে টিকিয়ে রাখতে হবে।
সংবিধানের পঞ্চদশ ও ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিলের রায়সহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ রায়ের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিচার বিভাগকে ক্ষমতার হুমকি হিসেবে নয়, বরং একটি গভীর গণতান্ত্রিক সত্য হিসেবে গ্রহণ করতে হবে।
ত্রুটি-বিচ্যুতির পরও বিদ্যমান সংবিধানকেই বিচার বিভাগের পরশপাথর বলে মন্তব্য করেন প্রধান বিচারপতি। তিনি বলেন, নির্বাহী বিভাগের চাপিয়ে দেওয়া আইন, এখতিয়ারবহির্ভূত বিচারিক কর্মকাণ্ডকে মোকাবেলা করতে হলে সুপ্রতিষ্ঠিত সাংবিধানিক নীতি, যেমন—ক্ষমতার পৃথকীকরণ, বিচারিক স্বাধীনতা, গণতান্ত্রিক শাসন, মৌলিক অধিকার এবং জনগণের সার্বভৌমত্বকে নিশ্চিত করতে হবে।
অনুষ্ঠানে আরো বক্তব্য দেন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন ও সিজিএসের নির্বাহী পরিচালক পারভেজ করিম আনসারী। সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন সিজিএসের সভাপতি জিল্লুর রহমান।