জাতীয়তাবাদসংক্ষিপ্ত ইউআরএল
জাতীয়তাবাদ একটি আদর্শ যেখানে জাতিকে মানব সমাজের কেন্দ্রীয় অবস্থানে স্থাপন করা হয় এবং অন্যান্য সামাজিক ও রাজনৈতিক আদর্শকে জাতিগত আদর্শের পরে স্থান দেয়া হয়। জাতীয়তাবাদ একটি জাতির সংস্কৃতি রক্ষার্থে ভূমিকা পালন করে এবং জাতির অর্জনসমূহকে সামনে তুলে ধরে। এসব বিষয় বিবেচনা করলে জাতীয়তাবাদ ইতিবাচক ও নেতিবাচক দুইই হতে পারে।[১]
পরিভাষা
জাতীয়তাবাদ শব্দটি ইংরেজি “Nationalism” শব্দের বাংলা পরিভাষা। Nationalism শব্দটি ১৮৪৪ সাল থেকে ব্যবহৃত হতে থাকে, যদিও জাতীয়তাবাদ মতবাদটি আরও আগে থেকে চলে আসছে।[২] ১৯শ শতাব্দীতে এই মতবাদ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।[৩] মতবাদটি এর অন্তর্নিহিত অর্থের কারণে ১৯১৪ সালের পর থেকে নেতিবাচক রূপ লাভ করে। গ্লেন্ডা স্লুগা বলেন, ২০শ শতাব্দী হল জাতীয়তাবাদের মোহমুক্তি এবং আন্তর্জাতিকতাবাদের উন্মেষের সময়।[৪]


সপ্তদশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে হুগো গ্রোটিয়াসের লেখা “De jure belli ac pacis” এর মাধ্যমে “জাতি”, “সার্বভৌমত্ব” এবং সংশ্লিষ্ট ধারণাগুলোর পরিভাষাগত ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে পরিমার্জিত হয়েছিল।[ কিভাবে? ] স্পেন ও নেদারল্যান্ডস এর মধ্যে আশি বছরের যুদ্ধ এবং ক্যাথলিক ও প্রোটেস্ট্যান্ট ইউরোপীয় জাতির মধ্যে ত্রিশ বছরের যুদ্ধের সময়ে বসবাসকারী হুগো গ্রোটিয়াস ধর্মীয় পার্থক্য থেকে উদ্ভূত বিরোধের প্রেক্ষাপটে জাতিগুলোর মধ্যে বিরাজমান দ্বন্দ্বের বিষয়গুলো নিয়ে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন ছিলেন। ১৮০০ সালের আগে ইউরোপে জাতি শব্দটি একটি দেশের বাসিন্দাদের পাশাপাশি কিছু যৌথ পরিচয়ের ক্ষেত্রেও ব্যবহৃত হত যার মধ্যে ভাগ করা ইতিহাস, আইন, ভাষা, রাজনৈতিক অধিকার, ধর্ম এবং ঐতিহ্য অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে, এক অর্থে আধুনিক ধারণার সাথে আরও সাদৃশ্যপূর্ণ। [৫]
‘nation’ নামক বিশেষ্য থেকে উদ্ভূত Nationalism (জাতীয়তাবাদ) একটি নতুন শব্দ; ইংরেজি ভাষায়, যা প্রায় ১৭৯৮ সাল থেকে ব্যবহৃত হচ্ছে। [৬] [৭][ আরও ভালো উৎস প্রয়োজন ] ঊনবিংশ শতাব্দীতে এই শব্দটি ব্যাপকভাবে প্রাধান্য পায়। ১৯১৪ সালের পর শব্দটি ক্রমশ নেতিবাচক অর্থে পরিণত হতে থাকে। গ্লেন্ডা স্লুগা উল্লেখ করেছেন যে “বিংশ শতাব্দী, বিশ্বায়ন এর মহান যুগ জাতীয়তাবাদের প্রতি গভীর মোহভঙ্গের সময়।
শিক্ষাবিদরা জাতীয়তাবাদকে একটি রাজনৈতিক নীতি হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেন, যা বিশ্বাস করে যে, জাতি এবং রাষ্ট্রের মধ্যে সামঞ্জস্য থাকা উচিত। [৮] [৯] [১০] লিসা উইডেনের মতে, জাতীয়তাবাদী মতাদর্শ ধরে নেয় যে “জনগণ” এবং “রাষ্ট্র” পরস্পর সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। [১১]
ইতিবাচকতা
জাতীয়তাবাদের ধারণা নানামুখী ইতিবাচক পরিবর্তন এনে থাকে। ইতালিয় রাষ্ট্র দার্শনিক নিকোলা ম্যাকিয়াভেলি জাতীয়তার ভিত্তিতে রাষ্ট্র গঠনের ধারণা দিয়েছিলেন। ফলে বর্তমান বিশ্বে জাতীয়তাবাদী রাষ্ট্র গড়ে উঠেছে। পূর্বের রাষ্ট্রগুলো ছিল নগর রাষ্ট্র। এছাড়াও জাতীয়তাবাদ মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করে একটি সম্মিলিত শক্তির উত্থান ঘটায়।
নেতিবাচকতা
জাতীয়তাবাদ নেতিবাচক অর্থেও ব্যবহৃত হতে পারে। উগ্র জাতীয়তাবাদ তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। জাতীয়তাবাদের সমালোচকগণ মনে করেন জাতীয়তাবাদের ধারণা মানুষকে এক অর্থে ঐক্যবদ্ধ করলেও মূলত মানুষকে সংকীর্ণমনা করে দেয় এবং মানুষে মানুষে বিভেদ সৃষ্টি করে। আর জাতীয়তাবাদে ধর্মের উপস্থিত থাকলে সে জাতীয়তাবাদ উগ্র জাতীয়তাবাদে রূপ নিতে পারে। তখন ভিন্ন ধর্ম ও মতাবলম্বীরা নানাভাবে আক্রান্ত হতে পারেন।
এছাড়া জাতীয়তাবাদের ধারণা যুদ্ধের ও জন্ম দিয়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জার্মানির চ্যান্সেলর এডলফ হিটলার জার্মান জাতিকে উগ্র জাতীয়তাবাদে উদ্বুদ্ধ করে যুদ্ধের ময়দানে টেনে এনেছিলেন। নৃশংস সেই যুদ্ধে জার্মান বাহিনীর বর্বর বৃক্ষটির মূলে জলসেচন করেছিল জার্মান জাতীয়তাবাদ।
ইতিহাস
আমেরিকান দার্শনিক এবং ইতিহাসবিদ হান্স কোহন ১৯৪৪ সালে লিখেছিলেন যে ১৭ শতাব্দীতে জাতীয়তাবাদের উত্থান হয়েছিল। ঐকমত্য হলো জাতীয়তাবাদ একটি ধারণা হিসেবে ১৯ শতকে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলো। অনেক রাজনৈতিক বিজ্ঞানী আধুনিক দেশ রাষ্ট্রের ভিত্তি এবং সার্বভৌমত্বের ধারণা সম্পর্কে তাত্ত্বিক ধারণা করেছেন। রাষ্ট্রবিজ্ঞানে জাতীয়তাবাদের ধারণাগুলি এই তাত্ত্বিক ভিত্তি থেকেই আঁকে।








