প্রকৃতপক্ষে জীবনানন্দ দাশের কবিতায় হেমন্ত ও শীত এসেছে অনেক ক্ষেত্রে মৃত্যুর প্রতীক কিংবা জীবনের ধূসরতা বোঝাতে। যেভাবেই তাঁর কবিতায় হেমন্ত আসুক না কেন, তিনিই বাংলা কবিতার হেমন্ত-শীতের নান্দনিক রূপকার। জীবনানন্দ দাশের প্রথম কবিতার বই ‘ঝরাপালক’-এ (১৯২৭) হেমন্তের উপস্থিতি অনুল্লেখ্য। কারণ এটি তাঁর কাব্যশৈলী প্রকাশে সহায়ক হয়নি। ১৯৩৬ সালে ‘ধূসর পাণ্ডুলিপি’ কাব্যগ্রন্থে যেমন তাঁর স্বতন্ত্র শৈলীর প্রকাশ পেয়েছে, তেমনি হেমন্ত ঋতুকে তিনি চিত্রকল্পময় করে তুলেছেন। গ্রন্থের প্রথম কবিতা ‘নির্জন স্বাক্ষর’ শুরুতে হেমন্তের এক নতুন বার্তা নিয়ে এসেছে। যেমন—‘তুমি তা জান না কিছু, না জানিলে/আমার সকল গান তবুও তোমারে লক্ষ্য করে!/যখন ঝরিয়া যাব হেমন্তের ঝড়ে,/পথের পাতার মতো তুমিও তখন/আমার বুকের পরে শুয়ে রবে?…’
কবিতার শেষে তিনি পুনরায় একই চরণ পুনরাবর্তন করছেন—
‘হেমন্তের ঝড়ে আমি ঝরিব যখন—/পথের পাতার মতো তুমিও তখন/আমার বুকের পরে শুয়ে রবে?…/আমার বুকের পরে সেই রাতে জমেছে যে শিশিরের জল/তুমিও কি চেয়েছিলে শুধু তাই! শুধু তার স্বাদ।’
এই কবিতায় হেমন্তকে পৃথক করেছেন সামান্য তিনটি শব্দবন্ধের দ্বারা—‘হেমন্তের ঝড়’, ‘পাতা ঝরা’, ‘শিশিরের জল’। প্রকৃতির রূপ প্রকাশে এ ধরনের বাকৈশলী বিরল না হলেও ‘হেমন্তের ঝড়’, ‘শিশিরের জল’ তাঁর আগে এভাবে ব্যবহৃত হয়নি। এতে কবিতার অন্তঃপ্রবাহে গভীর অর্থে হেমন্তের সৌন্দর্যের বদলে আসন্ন মৃত্যুর বিষণ্নতা নেমে আসছে। যেন পৃথিবীর কোনো এক অন্তরতমার উদ্দেশে তাঁর এই নিবেদন। জীবনানন্দ দাশ হেমন্তের প্রতীকী রূপ অঙ্কন করলেও ঋতুর চরিত্র সৌন্দর্য এবং প্রাকৃতিক চিত্রকল্প উপেক্ষা করেননি। হেমন্ত যদি শীতনিদ্রার প্রাক-প্রস্তুতি হয়, তবু এতে রয়েছে এক নিজস্ব সৌন্দর্য। হেমন্ত জীবনের অনিবার্য গোধূলিলগ্ন। সূর্য অস্ত যাওয়ার আগে পৃথিবীকে যেভাবে নরম আলোয় রাঙিয়ে যায়, স্নিগ্ধ আলোয় ভরিয়ে দেয় পৃথিবীকে। রবীন্দ্রনাথ তাঁর গানে এই রূপটি ধরতে চেয়েছেন এভাবে—‘রাঙিয়ে দিয়ে যাও, যাও গো এবার যাবার আগে/তোমার আপন রাগে, তোমার গোপন রাগে,/তোমার তরুণ হাসির অরুণ রাগে/অশ্রুজলের করুণ রাগে।’
গত শতাব্দীর শেষ পর্যন্ত হেমন্ত গ্রামবাংলায় প্রকৃতির এক বিশেষ রূপ নিয়ে হাজির হতো। একদিকে কার্তিকের শুরুতে খাদ্যের অভাব, আকস্মিক ঝড়ঝঞ্ঝা, নিম্নচাপ; আবার এই ঋতুতেই নতুন ধানে কৃষকের গোলা ভরে উঠত। নানা রকম পিঠাপুলি, পায়েস—ধানকাটার আনন্দ উৎসব—সমাজজীবনে নবপ্রাণের সঞ্চার করত। যদিও জীবনানন্দ দাশ কবিতায় চাষিদের, জেলেদের অভিজ্ঞতা এবং খেটে খাওয়া মানুষের উপমা তুলে ধরেছেন হেমন্তের রূপকে, তবু তাঁর কবিতার ভাব এক বহুমাত্রিক চেতনাবলয়ের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত করেছেন। সাধারণ মানুষের শ্রম-প্রেম-ঘামের গন্ধ তিনি তুলে এনেছেন, বলেছেন—‘এদেহ অলস মেয়ে/পুরুষের সোহাগে অবশ/চুমে লয় রৌদ্রের রস/—হেমন্ত বৈকালে/উড়ো পাখপাখালির পালে/উঠানে পেতে থাকে কান,/—শোনে ঝরা শিশিরের ঘ্রাণ/অঘ্রানের মাঝরাতে।’ কিংবা ‘প্রথম ফসল গেছে ঘরে/হেমন্তের মাঠে মাঠে ঝরে/শুধু শিশিরের জল;/অঘ্রানের নদীটির শ্বাসে/হিম হয়ে আসে।’ ‘বনলতা সেন’ কাব্যগ্রন্থে ‘আঘ্রাণ প্রান্তরে’ কবিতায় কবির ভাষ্য—‘অঘ্রান এসেছে আজ পৃথিবীর বনে/সে সবের ঢের আগে আমাদের দুজনের মনে/হেমন্ত এসেছে তবু।’…‘সমস্ত পৃথিবী ভ’রে হেমন্তের সন্ধ্যার বাতাস…/জানি আমি তোমার দু’চোখ আজ আমাকে খোঁজে না আর, পৃথিবীর ‘পরে—’/বলে চুপে থামলাম…অঘ্রান এসেছে আজ পৃথিবীর বনে।’
রূপসী বাংলা কবিতায় হেমন্ত এসেছে কার্তিকে—‘যদি আমি ঝরে যাই একদিন কার্তিকের নীল কুয়াশায়;/যখন ঝরিছে ধান বাংলার ক্ষেতে ক্ষেতে ম্লান চোখ বুজে।’ এই গ্রন্থের ৫৭ নম্বর কবিতায় বলেন, ‘কোনোদিন দেখিব না তারে আমি; হেমন্তে পাকিবে ধান, আষাঢ়ের রাতে/কালো মেঘ নিঙড়ায়ে সবুজ বাঁশের বন গেয়ে যাবে উচ্ছ্বাসের গান।’ কিংবা ‘হেমন্ত নদীর পারে’ কবিতায়—‘মাঝে মাঝে মনে হয়/হেমন্তসন্ধ্যায় এই বৃক্ষদের মুখ দেখে/আবছায়া নদীর দর্পণে।…‘আশ্বিন কার্তিক রাত এইখানে সমুদ্রের মত/তারই তীরে রয়েছি দাঁড়ায়ে।’
জীবনানন্দ দাশ মহাকাল চেতনার অংশ হিসেবে হেমন্তকে উপস্থাপন করেছেন। ‘সাতটি তারার তিমির’ গ্রন্থের ‘নাবিকী’ কবিতায়—‘হেমন্ত ফুরায়ে গেছে পৃথিবীর ভাঁড়ারের থেকে/এ রকম অনেক হেমন্ত ফুরায়েছে/সময়ের কুয়াশায়।’
হেমন্ত নিয়ে জীবনানন্দ দাশের বেশ কয়েকটি গল্পও রয়েছে। যেমন—‘হেমন্তের দিনগুলো’, ‘এই শীত, হেমন্ত এই’, ‘আঘ্রাণের শীত’, ‘হৈমন্তিক’ প্রভৃতি। গল্পগুলোর মধ্যে হেমন্ত ঋতুর বিস্তার আরো স্পষ্ট হয়েছে। ‘হেমন্তের দিনগুলো’ গল্পের নায়ক অসিতের নিজের জীবন হেমন্তে এসে দাঁড়িয়েছে—যেখানে সবকিছু ম্লান, নিস্তব্ধ, ঝরে পড়া পাতার মতো ক্লান্ত। গল্পের পটভূমি কলকাতার যুদ্ধোত্তর সময়ের। জীবনের আনন্দ, সৃজনশক্তি, আশাবাদ—সবকিছু যেন শুকিয়ে গেছে। ঠিক যেমন হেমন্তের মাটি শুষ্ক, আকাশ ফ্যাকাসে, বাতাসে ধুলা উড়ে বেড়ায়—অসিতের মনও তেমনই শূন্য ও ক্লান্ত। হেমন্তের রোদে চারপাশে একটা হালকা উষ্ণতা আছে, কিন্তু তাতে প্রাণ নেই; সেই রোদ যেন অসিতের জীবনের মতো—অল্প আলো, অনেকটা বিষণ্নতা। সে নিজের জীবনের সিদ্ধান্ত নিতে পারে না, স্ত্রীর সঙ্গে সম্পর্কের দূরত্ব বাড়ে, চাকরি ও সংসারের দায়ে তার মন ভারাক্রান্ত।
‘এই শীত, হেমন্ত এই’ গল্পে অমৃত নামের মধ্যবয়স্ক লোকটি এক শীতরাতে নিজের জীবনের অর্থ ও অতীতের স্মৃতি নিয়ে ভাবতে থাকে। ঘরে ঘুমন্ত স্ত্রী-সন্তান, আর পাশের ঘরে তরুণ অনুজা ও নীহারের বিপ্লবের আলোচনার মধ্যে সে হারিয়ে যায় নিজের যৌবনের দিনগুলোয়। এখন তার জীবন নিস্তেজ, দায়িত্বে ভরা, অথচ সেই পুরনো অনুভবগুলো এখনো বরফের মতো জমে আছে মনে। গল্পের শেষে লেখক হেমন্ত ও শীতকে প্রতীক রূপে তুলে ধরেন স্মৃতির সংরক্ষণের ঋতু হিসেবে। যেমন—হিম সবকিছুকে পচতে দেয় না, তেমনি অমৃতের অতীত প্রেম, আশা ও জীবনের হারানো উষ্ণতা এই ঋতুতেই যেন জমাট বেঁধে আছে—সময় ও মৃত্যুর ক্ষয় থেকে রক্ষা পেয়ে। এই গল্পে চূড়ান্ত বিবেচনায় হেমন্ত ইতিবাচকভাবে প্রতীকায়িত হয়েছে।
জীবনানন্দ দাশ বর্ষার সরসতা এবং বসন্তের সপুষ্পকতার পরিবর্তে হেমন্ত ঋতুর মধ্যে দেখেছেন জীবনের বাস্তব রূপ। প্রধানত জীবনের ধূসর রং, অবসন্নতা, বিষণ্নতা, ব্যর্থতা ও মৃত্যুর প্রতীক দিয়ে তিনি ‘ধূসর পাণ্ডুলিপি’ সাজিয়েছেন। একই শব্দবন্ধ, বাকৈশলী ও হেমন্তের বিশেষ উপমা বারবার ব্যবহার করে কবি বহুমাত্রিক চিত্রকল্পময় এক ‘হৈমন্তিক’ পৃথিবী নির্মাণ করেছেন, যার কিছু বাস্তব, কিছু পরাবাস্তবের কুয়াশায় মোড়ানো। তার রূপ যতই বিষণ্ন বেদনাময় হোক, কাব্যপাঠকের কাছে তা পরম তৃপ্তির। হেমন্ত আচ্ছন্ন কবি নিজেও একদিন পথের পাতার মতো ঝরে গেলেন পথের ধুলায় তাঁর প্রিয় ঋতুতেই—বাংলার নদী-মাঠ-ভাটফুল-হেমন্ত ভালোবেসে।