লিথির জল খেয়ে কি আমরা সবকিছু বিস্মরিত হয়ে যাব? বিস্মরণের জলছাপ কী? কী রেখে যায় বিস্মরণ তার পেছনে পেছনে? তা হলো স্মরণ। আমরা তো স্মৃতিতেই বাঁচি। এমনকি বিস্মরিত বিলোপিত আমরা তো কিছু স্মৃতিই রেখে যাই। তাই আমরা স্মৃতিতে আর বিস্মৃতিতে থাকি বললে এলোমেলো বলা হয় না। নাকি থাকি এ দুয়ের দোলাচলে কোনো সন্ধিবিন্দুতে– যেখানে স্মৃতির সিঁড়িটিই চলে যায় বিস্মৃতির অনন্ত-অদৃশ্য দরজায়! আসলে কি এ দুটি পারস্পরিক! স্মৃতি বিস্মৃতিতে যায় আবার বিস্মৃতি স্মৃতিকে জাগিয়েও রাখে। যার কোনো বিস্মরণ নেই তার তো আসলে কোনো স্মরণও নেই, কারণ সে তো কিছুই ভোলে না। আর কিছু না ভুললে, বিস্মরণ না থাকলে কী পরিণতি হয় তা আমরা হোর্হে লুইস বোর্হেস-এর [১৮৯৯–১৯৮৬] ‘স্মৃতিধর ফুনেস’ গল্পটিতে দেখতে পাই যেখানে প্রোটাগনিস্ট ইরেনেও ফুনেস এক অসীম স্মৃতিধর মানুষ, যিনি কিছুই ভোলেন না, সব স্মৃতিই তিনি ধরে রাখেন তার মধ্যে। ফলে এই অদ্ভুত অসম্ভব এবং পরাঙ্মুখ স্মৃতিই তাকে মৃত্যুর দিকে নিয়ে যায়। বোর্হেস বলতে চেয়েছেন, ভুলে যাওয়া হলো জ্ঞান ও বোধের পূর্বশর্ত, বিস্মরণ জীবনেরই সাপেক্ষ। কিন্তু ফুনেস এক অমানবিক বৈশিষ্ট্যের অধিকারী, যা অসীম চেতনাকে ধারণ করে বসে আছে। ফুনেসের নিজেকে মনে হতো: নদীর নিচে স্রোতে আন্দোলিত ও উপেক্ষিত হয়ে পড়ে থাকা একজন, অর্থাৎ অবিরত তিনি স্মরণমুখর। অখণ্ড সংখ্যাশ্রেণির জন্য এক অনন্ত শব্দভান্ডার আর তার নিজের স্মৃতির অর্থহীন তালিকা প্রস্তুত করাই ছিল তার কাজ; তার মানে স্মৃতির গোলকধাঁধায় নিপতিত তার জীবন। বোর্হেস বলতে চেয়েছেন, ভুলে যাওয়া কোনো অস্বাভাবিকতা নয় বরং এক মানবিক ছন্দ। বিস্মৃতি তাই সম্ভব ও স্বাভাবিক ও সুস্থকর। বোর্হেস তাঁর এক কবিতায়ও বলেছেন, ‘সময় এক নদী যে আমাকে বয়ে নিয়ে যায়, আর আমিই সেই নদী।’ অর্থাৎ আমিই স্মৃতি-বিস্মৃতি। প্রতিটি মানুষই একইসঙ্গে স্মৃত ও বিস্মৃত: কিছু হারায়, কিছু থাকে। কিন্তু বিস্মরণ এমন এক মৌল অবস্থা যেখানে সবাইকেই যেতে হয়। মানুষ বিস্মরিত হয় আবার বিস্মরণে নিপতিতও হয়ে যায়। কিন্তু এই বিস্মরণ উপহার দিয়ে যায় স্মৃতির জাদুরং। মানুষের নিয়তিই হলো বিস্মরণ যাতে তার অস্তিত্ব নিজেকে বিসর্জন দেয় কিন্তু বিস্মরণ তখনই সম্ভব যখন থাকে স্মৃতিরা। সুতরাং এই বিস্মরণের পথে মানুষ যা কিছু রেখে যায় তা হলো অমোঘ স্মৃতি। মানুষের বিস্মরণের পথে স্মৃতিরা জ্বেলে রাখে তাদের আকাশপ্রদীপ।
বিস্মরণের পথে যেখানেই থাকি না কেন, সে এমন এক দরজাহীন ঘর, যার সবকটি জানালাই খোলা। সেসব জানালা দিয়ে জীবনের স্মৃতিরা সরে যেতে থাকে, আবার বিস্মৃতিরা প্রাচীন কুয়াশার মতো ঢুকতে থাকে। আর যতই তা ঘটে আমরা বিস্মরণের একটি উটের পিঠে উঠে বসি। একসময় হারাতে থাকি পৃথিবীর মরুভূমি থেকে, নিজের কাছ থেকে। কিট্স তাঁর একটি কবিতায় একটি অন্তর্মুখী ভয়ের কথা বলেছিলেন : তিনি বিলীন হয়ে যাবেন, এক মহাবিস্মৃতির ভিতরে চলে যাবেন নীরবে। কবিতাটির নাম দিয়েছিলেন তিনি, ‘ভয় হয়, হব যে বিলীন আমি’। শেষ পঙ্ক্তিতে বলেছিলেন, তিনি পৃথিবীর প্রান্তরেখায় দাঁড়িয়ে আছেন যতক্ষণ না প্রেম আর খ্যাতি ডুবে যায় অনন্ত বিস্মরণের অতলে। অর্থাৎ কিট্স দেখতে চেয়েছেন সব হারিয়ে যাওয়াকে। এই বিস্মরণ অনিবার্য কিন্তু তা রেখে যায় কিছু জলছাপ কিছু স্মরণীয়তা, যা আমাদের মনে করিয়ে দিতে থাকে এমনকিছু, যা অনিঃশেষ বাজতে থাকে আমাদের মনোবীণায়। আজ এই অপস্রিয়মাণ সময়ের তীরে দাঁড়িয়ে আমার মনে হয়: কী জীবনই-না ছিল আমাদের! একটি নদীর পেছন পেছন ছুটে বেড়ানো, সমতলভূমিতে জলপুষ্পের সন্ধানে ঘুরে বেড়ানো, একটি নক্ষত্রের
খামারে মনে মনে ঘুরে বেড়ানো। আকাশের শত-সহস্র অদৃশ্য রেখা ধরে অবিরাম ছুটে চলা। কাঁচা রোদ গায়ে মেখে জলের উজানের দিকে ধাওয়া করা! আর একটি থমথমে দুপুরে পাখিদের পেছনে পেছনে দৌড়ে যাওয়া, তাদের উড়ন্ত ছায়া মাটিতে আবিষ্কার করা। ছুটে চলা পাখির ছায়া মাটিতে কি পড়ে! হয়তো পড়ে, হয়তোবা পড়েই অস্তিত্বহীন হয়ে যায়। বা হয়তো পড়তে-পড়তেই অপস্রিয়মাণতায় পরিণত হয়। রাতের নানা বর্ণের নানা আকারের মেঘগুলোকে মনে হতো রূপকথার মসলিন, মনে হতো তারা অপার্থিব জায়গা থেকে বের হয়ে আবার অজানা কোনো ঈশ্বরের জায়গায় চলে যায়। আবার কখনও কখনও মেঘগুলোকে পাহাড়-পর্বতের অবয়বে চিন্তা করতাম। উঁচু উঁচু এক-একটি পাহাড়। কখনও আবার বড় মেঘ মেজো মেঘ ছোট মেঘকে মনে হতো বাবা-মা, আমি, আমার বোন ইত্যাদি। তাদের পেছনে ছুটছি অজানার পানে। আকাশকে মনে হতো অজানার গন্তব্য। রাতে তারাদের হাটে পরীদের মেলা, নানা কোণে নানা স্থানে, পরীরা আসে। কখনও মানুষকেও তারা ধরে তাদের রাজ্যে নিয়ে যায়। তখন জীবনের হাঁটা ছিল, ছিল জীবনের রাগদারি।
একটি ছোট্ট পাখির জন্য যাবতীয় মনোবাসনা, একটি মুথা ঘাসের জন্য নির্নিমেষ চোখ ফেলে রাখা, একটি জলস্রোতের দিকে শমিত অনুভবকে স্থির করে রাখা, একটি ফড়িঙের পেছনে পেছনে জীবনকে ছুটিয়ে দেওয়া, আকাশকে দেখে দেখে সারারাত মনের স্লেটে চকখড়ি দিয়ে ছবি আঁকা। আর রং বদলানো কাকলাস, বিস্তীর্ণ শটিবন, গাছালির সাথে বাক্যালাপ, হ্যাজাকের মেন্টলজ্জ, আরও কত কী। জীবন বেড়ে উঠছিল তখন, জীবনের নানা গান-তান-সুর-লয়ের জন্ম হচ্ছিল তখন, যদিও তখন আমি সরাসরি টের পাইনি। তখন তো বোঝা যায় না যে, জীবন বেড়ে ওঠে চুপসে যাবার জন্য। আমাদের সব উচ্ছ্বাস তখন শ্রাবণ মেঘের মতন জড়ো হয়ে একসময় ঝরে পড়ছিল। জীবনের এসব স্মৃতিই কি একসময় বিস্মরণে ডুবে যায়? না, তা হতে পারে না। এসব স্মৃতি একদিন অন্য অনেক বিস্মরণের মাঝ দিয়ে কোনো এক মায়া নিয়ে হাজির হয় জীবনের প্রান্তের কাছে। কতজন যে নেই, অবর্তমান হয়ে গেছেন। কিন্তু নেই-এর থাকায় তারা আছেন। কীভাবে নেই-এ থাকা যায়, ভেবে দেখা প্রয়োজন। আর বস্তুত আমরাও উপস্থিতির মাঝে কতটুকু উপস্থিত বা অনুপস্থিতির মাঝে কতটুকু অনুপস্থিত, এ বিষয়ে মনোচিত্রায়ণ করা দরকার। দৃশ্যমান এই উপস্থিতি কি কোনো অদৃশ্য অনুপস্থিতিরই স্মারক বহন করছে না? যারা মরে গেছে, যারা শারীরিক অর্থে বিলীন, তারা কি বিস্মরণে? কিন্তু তারাই আমাদের স্মরণসমুদ্রে নৌকা চালায়। যত গান আমরা শুনি সেই শিল্পীরা তো শারীরিকভাবে আর নেই, তবু তারা নিয়ত স্মরিত। এই কথা বললাম, কারণ কবিতার জন্য এসবই খুব প্রাসঙ্গিক বলে মনে হয়। কেননা, কবিতা প্রকারান্তরে নতুন করে আমাদের ভাবতে শেখায় যে, ভাবনা অপরিচয়ের দিগন্তকে উন্মোচন করতে চায়। এমন করে ভাবতে শেখায় যা ওলটানো, যা অদৃশ্যের কোরিওগ্রাফিকে হাজির করে। ভাবনার আছে দ্বিপ্রান্তিকতা। কখনও কখনও ভাবনা নিজেকে অর্থহীন করে তোলে, আবার সেই ভাবনাই অর্থময়তার দিকে ঘুরে যায়। রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, কুঁড়ির ভেতর গন্ধের কান্নার কথা; বলেছিলেন, কুঁড়ির ভেতরের অন্ধ গন্ধ ভাবে, কেন তার জীবন এমন অর্থহীন। কুঁড়ির কারাগারে তার কী-বা মূল্য। কিন্তু এই ভাবনাই তাকে উত্তর দেয়। সে বোঝে, যখন কুঁড়ি ফুটবে তখন সে পৌঁছে যাবে মানুষের কাছে। দূর হবে তার আপাত অর্থহীনতা। আমার ভাবতে ইচ্ছে করছে, উপলব্ধি করতে ইচ্ছে করছে যে, কীভাবে আছি। এই যে উপস্থিতির ব্যাপকত্ব, এই যে বিস্তারের আবিশ্ব, তাতে আমার সত্তার অবলম্বন কী? আসলেই কি আমি উপস্থিতির অনুশাসন অনুযায়ী আছি, নাকি তার গভীরে অনুপস্থিতির কোনো এক অদৃশ্য ওজনকে শিরোধার্য করে বেঁচে আছি। খুব আত্মমগ্ন এই অস্তিত্বের ওঠাপড়া। ভেবে দেখুন উপস্থিতি নয়, বরং কোনো এক অনুপস্থিতিই, কোনো এক অদৃশ্যই আমাদের প্ররোচিত করে অস্তিত্বের নতুন সংজ্ঞার্থের অন্বেষণে। প্ররোচিত করে যেন আমরা অন্যদের মতো না হই। যেন আমরা তার ইশারাতে পরিচালিত হই। অদৃশ্যের শরীর ও মনে যেন আমরা ভরিয়ে দিই আমাদের স্তন্যপায়ী জীবন।
আচ্ছন্ন চলনের মাঝ দিয়ে যে-জীবন, তা হলো ভর-করা জীবন। বিস্মরিত বা অর্ধস্মরিত একটি অবস্থা। ভূতগ্রস্ত হওয়া, চন্দ্রগ্রস্ত হওয়া। নানাভাবে মানুষ গ্রস্ত হয়– অর্থগ্রস্ত, অভাবগ্রস্ত, কামগ্রস্ত, দুর্দশাগ্রস্ত ইত্যাদি ইত্যাদি। এই গ্রস্তভাব মানুষকে বিচলিত ও তাড়িত করে বেড়ায়। সে হয়ে পড়ে অসংলগ্ন এবং অব্যবস্থিত। এক ছায়াশ্রিত বেদনার ভার, এক অযৌক্তিক কারণের বাহুল্য তাকে দগ্ধ করে যায়। তবে তার আত্মতা আছে, ব্যক্তিগত মনোভারের সৌন্দর্য আছে। যদি আকাশকে ব্যক্তিগত তুলি দিয়ে নিজের ইচ্ছামতো রাঙিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে যে-কুসুমিত ভারের সৃষ্টি হয়, যে-অজানিত বাস্তবতার উন্মেষ হয়, ভর করা লেখক-জীবন সেরকমই, যেন স্বাভাবিক জীবনের অপসরণে অন্যতর কোনো অন্তর্বৃত জীবনের মনোভার নিয়ে বেঁচে থাকা। এটা অন্য সবার জন্য স্বস্তিকর নয়, শুধু লেখকের জন্য ছাড়া।
বিস্মরণ কীভাবে যে সৃষ্টি হয়ে চলেছে এইসব জলছাপ যাতে হারানো মুখেরা অর্ধউদ্ভাসিত। অস্মরণ বা বিস্মরণ রেখে যায় অসংখ্য ছাপ, যার পুনরুদ্ধারে তৎপর হয়ে পড়ি আমরা। দেখি প্রুস্তের প্রোটাগনিস্ট মার্সেল এক টুকরো ম্যাদেলিন কেক মুখে দেওয়ামাত্র স্মৃতির ঢেউয়ে আছড়ে পড়তে থাকেন। জীবনের বিস্মরণে এই অনৈচ্ছিক স্মৃতি সৃষ্টি করে চলে নানা জলছাপের। কিন্তু একদিন বিস্মরণে গিয়ে আর জাগতে ইচ্ছা করবে না আমাদের, ঠিক জীবনানন্দ দাশের কবিতার মতো: ‘কোনোদিন জাগব না জেনে … কোনোদিন জাগব না আমি … কোনোদিন আর।’
লেখার শুরুতে ছিল বোর্হেসের একটি গল্পের কথা আর এখন শেষে তাঁরই একটি কবিতার (লিমিট্স) কথা যেখানে স্মৃতি, সময় আর অবলুপ্তির একটি ধ্যান উন্মোচিত: রহস্যময় পৃথিবী, হয়তো তার রহস্যের কথাই এটি: ‘আমরা জানি না, কী কী হারাতে চলেছি, হারাবার আগেই। কিন্তু এই অবলুপ্তির আগে রেখে যাওয়া আমাদের বিস্মরণের জলছাপগুলো অনন্তর গেয়ে চলবে স্মরণের মুনলাইট সোনাটা।