জীবনানন্দ দাশের ইতিহাস ঘেঁটে কবি হেনরী স্বপন জানান, দাশ পরিবার বরিশালে এই বাড়ি কেনার আগে তাঁরা ভাড়া থাকতেন সেখানে। অশ্বিনী দত্তের বাড়ির উল্টোদিকে এই বাড়ি। সেখানে ১৮৯৯ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি কবির জন্ম, যার চিহ্ন এখন নগরায়ণে বিলীন।হেনরী স্বপন বলেন, গাছগাছালিতে ঢাকা, ফলদ বৃক্ষের সমাহারের সেই ‘সর্বানন্দ ভবন’ ছিল প্রাণচঞ্চল এক একান্নবর্তী বাড়ি। বাড়ির পেছনের মাঝারি পুকুর ঘিরে নারকেল, সুপারি, আম, কাঁঠাল, জাম, আনারসের বাগান।
চারুকলা বরিশালের সংগঠক আইনজীবী সুভাষ চন্দ্র দাস বলেন, ১৯৪৬ সালের জুলাইয়ে বিএম কলেজ থেকে ছুটি নিয়ে জীবনানন্দ কলকাতা যান, এর পর আর দেশে ফেরেননি। দেশভাগের পর দাশ পরিবারও চলে যায় কলকাতায়। এরপর ১৯৫৫ সালে কলকাতায় সম্পন্ন হয় ‘পাওয়ার অব অ্যাটর্নি’ দলিল। যেখানে কবির নাম থাকলেও তাঁর স্বাক্ষর নেই। কারণ তখন তিনি মৃত। সেই দলিল বলে ১৯৬৯ সালে বরিশাল কালেকটরেটের কর্মচারী আব্দুর রাজ্জাক মূল বাড়িটি কেনেন।
তাঁর কন্যা, মহিলা পরিষদের নেত্রী নুরজাহান বেগম সম্প্রতি না ফেরার দেশে চলে গেছেন। জীবদ্দশায় কালের কণ্ঠকে তিনি বলেছিলেন, ‘বাড়ি কেনার পর আমরা নাম দিই “ধানসিড়ি”। ১৯৫৮-৫৯ সালে জমিটা হুকুম দখল হয়। আমরা চেষ্টা করেও কিছু করতে পারিনি। পরে এখানে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল দপ্তর কলোনি, গুদাম আর পানির পাম্প বসায়।’
বসতবাড়ি ঘিরে দীর্ঘ সংগ্রাম: বরিশালের লেখক কবি ও সংস্কৃতজনরা বহু বছর ধরে চেষ্টা করছেন কবির বসতবাড়িটি সংরক্ষণের। তাঁদের দাবি ছিল, এ বাড়িটি সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে এনে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের দায়িত্বে দিতে হবে। আন্দোলন হয়েছে, মানববন্ধন হয়েছে, সভা-সমাবেশও হয়েছে। অবশেষে কিছুটা উদ্যোগে কবির নামে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘জীবনানন্দ দাশ পাঠাগার ও মিলনায়তন’।
প্রগতি লেখক সংঘের কেন্দ্রীয় কমিটির নির্বাহী সদস্য অপূর্ব গৌতম বলেন, সেই পাঠাগার আজ তালাবদ্ধ। ধুলো জমে আছে বইয়ের তাকগুলোয়, মিলনায়তনের মঞ্চে নীরবতা। আলো-ফ্যান বন্ধ, বাতাসে স্যাঁতসেঁতে গন্ধ। যেন কেউ নেই, কিছুই নেই।
কবি আসমা চৌধুরী বলেন, দেশ-বিদেশ থেকে অনেক কবি-সাহিত্যিক আসেন বরিশালে। সবাই জীবনানন্দের বাড়ি দেখতে চান। কিন্তু আমরা কিছুই দেখাতে পারি না। পাঠাগার বন্ধ, মিলনায়তন ধুলোয় ঢাকা। এটি আমাদের জন্য লজ্জার বিষয়। কবির নামে যা করা হয়েছে, তা কেবল কাগজে-কলমে। বাস্তবে সেটি প্রায় পরিত্যক্ত।
বরিশালের বগুড়া রোডের সেই ঠিকানায় জীবনানন্দের পদচিহ্ন খুঁজতে গেলে দেখা মেলে সরকারি গুদাম, নলকূপ আর ইটের দালান। কবির স্বপ্নের বাড়ি, তাঁর নির্জন বারান্দা, সেই সবুজ সমাধিক্ষেত্র, সবই এখন ইতিহাসের পাতায় বন্দি। তবুও, বাতাসে যেন ভেসে আসে কবির সেই চিরচেনা উচ্চারণ,‘আবার আসিব ফিরে ধানসিঁড়ির তীরে, এই বাংলার ধান, নদী, মাটি, মানুষের কাছে।’
রূপসী বাংলার কবি জীবনানন্দ দাশের ৭২তম (৭১তম মৃত্যুবার্ষিকী) প্রয়াণ দিবস আজ বুধবার। কবিকে তাঁর জন্ম শহর বরিশালের নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় স্মরণ করেছেন। এ উপলক্ষে আজ সকালে বরিশালের কবি ও সংস্কৃতিকর্মীরা তাঁর প্রতিকৃতিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানাবেন। আয়োজনে থাকছে আলোচনা সভা ও নানা অনুষ্ঠানের।
জীবনানন্দ দাশ বরিশাল ব্রজমোহন স্কুল থেকে ম্যাট্রিক, বি এম কলেজ থেকে আই এ এবং কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে ইংরেজিতে অনার্সসহ বিএ ও ইংরেজিতে এমএ পাস করেন। আইন কলেজে ভর্তি হলেও শেষ পর্যন্ত তিনি পরীক্ষা দেননি। ১৯৫৪ সালে কলকাতায় এক ট্রাম দুর্ঘটনায় তিনি আহত হন, পরে ২২ অক্টোবর মারা যান।
জীবনানন্দ গবেষক কবি হেনরী স্বপন বলেন, কবির ৫৫ বছরের জীবনে বরিশালে কেটেছে প্রায় ৩০ থেকে ৩২ বছর। আর নিরবিচ্ছিন্ন ভাবে কলকাতায় ১৪ বছর। বাকিটা কলকাতা-বরিশাল, বরিশাল-কলকাতা করে কাটিয়েছেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্ধের মধ্যে রয়েছে ঝরাপালক, ধূসর পাণ্ডুলিপি, বনলতা সেন, জীবনানন্দ দাশের শ্রেষ্ঠ কবিতা, রূপসী বাংলা। তাঁর লেখা বেশির ভাগ কবিতার অনুসঙ্গ বরিশালের।