ইকরামউজ্জমান
ক্রীড়াঙ্গন বোঝা, বোঝা ক্রীড়াঙ্গনের প্রয়োজনীয়তা—আর সেই অনুযায়ী উদ্যোগ নিতে না পারলে তো কোনো কিছুই ফলদায়ক হবে না। ক্রীড়াঙ্গন এমন একটি জগৎ, যেখানে চিন্তার ব্যত্যয় ঘটলেই সবকিছু এলোমেলো হয়ে যায়। এ ক্ষেত্রে আজকের কাজ আজই করতে হবে। আগামীকালের জন্য অপেক্ষার অবকাশ নেই। মাঠের ফুটবল প্রতিদিন বদলাচ্ছে, রং পাল্টাচ্ছে।
নারী ফুটবল নিয়ে দেশের বাইরেও আমার কথা বলার সুযোগ হয়েছে। প্রতিবারই দেশে ‘পেপার’ তৈরির সময় মনে হয়েছে নারী ফুটবলারদের ওপরে মহান আল্লাহ তাআলার অশেষ রহমত আছে নতুবা তাঁরা যে পিছিয়ে থাকা অবস্থা থেকে গিয়ে আন্তর্জাতিক লড়াইয়ের মঞ্চে আলো ছড়ান, নতুন নতুন গল্পের জন্ম দেন—এটি সম্ভব হতো না। এশিয়ান কাপে কোয়ালিফাই করার পর প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয়েছে—এটি কিভাবে সম্ভব হলো? যারা কোয়ালিফাই করেছে, তাদের ফুটবলকাঠামো, তাদের প্রস্তুতি, তাদের সুযোগ-সুবিধা আর ফুটবলকে ঘিরে চিন্তা-ভাবনার সঙ্গে তো তোমাদের কোনো মিলই হয় না। বলেছি, আমাদের নারী ফুটবলারদের আত্মবিশ্বাস, প্রচণ্ড ইচ্ছা বাস্তবায়নের শক্তি এবং দেশের প্রতি দায়বদ্ধতাই তাঁদের কামিয়াব হতে সাহায্য করেছে। দেশের মানুষ তাঁদের পেছনে ছিল, এটি একটি শক্তি। আরেকটি হলো নারী দলের সঙ্গে ভাগ্য সব সময় আছে। জাতীয় দলের পর অনূর্ধ্ব-২০ নারী দলও এশিয়ান কাপে কোয়ালিফাই করেছে। আমাদের ছেলেরা যা পারেননি, জাতীয় এবং বয়সভিত্তিক নারী দল সেটি পেরে অনুপ্রেরণার উৎস হতে পেরেছে। আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনে জাতি চরিত্রের প্রতিফলন ঘটিয়ে নারীরা প্রমাণ করেছেন বাংলাদেশের মেয়েরা ফুটবলে কোনো অংশে ছেলেদের থেকে পিছিয়ে নেই, বরং এগিয়ে আছেন। তাঁরা সব সময় বড় স্বপ্ন দেখেন।
এবার আশা করা হয়েছিল নারী অনূর্ধ্ব-১৭ দল এএফসি এশিয়ান কাপে কোয়ালিফাই করবে। এর আগে অনূর্ধ্ব-১৭ নারী দল এএফসি এশিয়ান ফাইনাল রাউন্ডে ২০১৭ ও ২০১৯ সালে খেলেছে। এবার ছন্দঃপতন হয়েছে। চায়নিজ তাইপের কাছে বড় পরাজয়ের মধ্য দিয়ে মিশন শেষ হয়েছে। তবে এই ‘কম্পিটিশন’ থেকেও যথেষ্ট প্রাপ্তি আছে, যা আগামী দিনগুলোতে নতুন উদ্যোগ গ্রহণের ক্ষেত্রে কাজে লাগবে। নারী ফুটবলে যে বিষয়টি এখনো উপেক্ষিত, সেটি হলো দেশজুড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা প্রতিভাগুলোকে চিহ্নিত করে তাদের যথাযথভাবে কাজে লাগানোর সুযোগ। এই সুযোগ না থাকায় এন্ট্রি লেভেল থেকে শুরু করে ওপরের ধাপ পর্যন্ত সব সময় সম্ভাবনা এবং প্রতিভার অপচয় হচ্ছে। এই বিষয়গুলো নিয়ে ভাবা এখন জরুরি। আমরা এখন কম বয়সের জনসংখ্যার দিক থেকে অন্যান্য দেশ থেকে অনেক ভালো অবস্থায় আছি। নারীদের ক্ষেত্রে এটি আরো ভালো অবস্থা। এই সুবিধাটাকে ক্রীড়াঙ্গনে কাজে লাগানোর এটাই সময়। আগামী ১৫ বছর পর এই সুবিধা আর থাকবে না। বয়সভিত্তিক নারী দল ভালো করছে ধারাবাহিকতার সঙ্গে—এতে নারীরা ফুটবল খেলায় অনুপ্রাণিত হচ্ছেন। বয়সভিত্তিক দলগুলোকে যদি টেকসই উন্নয়নের মাধ্যমে বাস্তবধর্মী পরিকল্পনায় এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যায়, তাহলে কিন্তু জাতীয় দল নিয়ে চিন্তার বোঝা হালকা থাকবে। বিষয়টি হলো দায়িত্ব গ্রহণ এবং দায়িত্বশীলতার পরিচয় দেওয়া। নারী ফুটবলে আমাদের প্রত্যাশা অনেক। ফুটবলাররা সেই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে দেশকে কিছু দিতে সব সময় প্রস্তুত। তাঁরা যাতে দেশকে অর্থবহ এবং গৌরবময় উপহার নিয়মিতভাবে দিতে পারেন এর জন্য দরকার সুস্থ ফুটবলময় পরিবেশ সৃষ্টি। নারী ফুটবলকে ঘিরে আমরা গত কয়েক বছর প্রচুর আবেগ প্রদর্শন করেছি। এই আবেগ কতটুকু কাজে লেগেছে? প্রয়োজন এখন আবেগের পাশাপাশি বাস্তবধর্মী উদ্যোগ গ্রহণ, যেখান থেকে নিশ্চিত হওয়া সম্ভব হবে ফলাফল। ফলাফল তো সর্বক্ষেত্রে শেষ কথা। নারী ফুটবল দল এমনভাবে তৈরি হোক, যেখানে বলা সম্ভব হবে মাঠে নামার আগে আমরা জয়ের জন্য খেলব। নারীরা খেলবেন আনন্দের সঙ্গে। চেষ্টা করবেন দেশের ফুটবলকে একটির পর একটি ধাপ অতিক্রম করে ওপরে তুলতে।
লেখক : কলামিস্ট ও বিশ্লেষক। সাবেক সিনিয়র সহসভাপতি, এআইপিএস এশিয়া। আজীবন সদস্য, বাংলাদেশ স্পোর্টস প্রেস অ্যাসোসিয়েশন প্যানেল রাইটার, ফুটবল এশিয়া