অমল সাহা
একটা বেবিট্যাক্সি করে চারজন কাঁঠাল-চাপাচাপি করে উঠে এফডিসির গেটের সামনে এসে নামে। দাদু আর দাদি মহা উৎসাহে গেটের কাছে দাঁড়িয়ে পড়েন। চোখের চশমা ঠিক করে নাকের গোড়ায় বসিয়ে নেন। পাশে রাহাতও দাঁড়ায়। কিন্তু ছোট মামা রাগে ঘোঁৎ ঘোঁৎ করতে থাকেন। মিনিট পাঁচেক দাঁড়ানোর পর ছোট মামা বলেন, তোরা দাঁড়া, আমি একটু চা খেয়ে আসি। রাহাতকে জিজ্ঞেস করেন, যাবি তুই?
রাগের বহর দেখে রাহাতও ছোট মামার সঙ্গে চলে যায়; যদিও যাওয়ার ইচ্ছা ছিল না। যাওয়ার আগে দাদু আর দাদিকে ছোট মামা বলেন, আমরা একটু চা খেয়ে আসি। আপনারা দাঁড়ান। দুজন চা খেতে যায়। ছোট মামা আর রাহাত একটু দূরে এসে চা খায়। ছোট মামা রাহাতকে বলে, অ্যাই, তুই এফডিসির কথা বললি কেন?
রাহাত মিনমিন করে, আমার খুব ইচ্ছা ছিল।
—আর সেটা তোর আজই মনে পড়ল!
রাহাত চুপ করে থাকে।
দুজন চা বিস্কুট খায়। তারপর সময় কাটানোর জন্য আরো ১০-১৫ মিনিট এদিক-ওদিক ঘোরাঘুরি করে। তারপর এফডিসির গেটে ফিরে আসে। কিন্তু দাদু আর দাদি কোথায়? আরে! তাঁরা তো এখানেই ছিলেন!
ছোট মামা আর রাহাত পাগলের মতো এদিক-ওদিক খুঁজতে থাকে। কোত্থাও নাই। নাই তো নাই! কোন দিকে যেতে পারেন? ঘণ্টাখানেক বিভিন্ন রাস্তায় খোঁজাখুঁজির পর হয়রান হয়ে দুজন হাঁটতে হাঁটতে পান্থপথের সামনের পার্কটার একটা বেঞ্চিতে এসে বসে। রাহাত বলে, মামা, এখন কী হবে?
—জানি না।
—বাসায় ফোন করে জানাও, মামা।
—পাগল! আমাকে না তোর মা ছিঁড়ে খেয়ে ফেলবে। এখন কোনোভাবেই বাসায় এসব জানানো যাবে না।
—দাদুর কাছে ফোন করো।
—উনার ফোন নম্বর আমার কাছে নাই রে। এখন কী করব?
রাহাত বলে, চলো ১০ টাকার বাদাম খাই। যদি বুদ্ধি খোলে।
ছোট মামা রেগে ওঠেন, তোর এখন বাদাম খেতে ইচ্ছে করছে? আমার তো এখন মাথায় পানি ঢালতে ইচ্ছে করছে।
—পানি আনব?
—দ্যাখ, তুই আমার সামনে থেকে দূর হয়ে গেলে ভালো হয়।
রাহাত চুপ করে থাকে। মামা-ভাগ্নে সারা দিন ঢাকার রাস্তায় রাস্তায় ঘোরে। মামা রাহাতকে বলেন, তুই-ই সব সর্বনাশের গোড়া। বিকেলের দিকে দুজন পাউরটি আর কলা খেয়ে নেয়। সন্ধ্যার দিকে ছোট মামা বলেন, তুই বাড়ি ফিরে যা, আমি আর যাব না।
রাহাত বলে, তাহলে কোথায় থাকবে, মামা?
—আমি এই পার্কেই থাকব।
—তাহলে আমি কি একটা মশার কয়েল কিনে আনব? রাতে তো মশায় কামড়াবে।
—কামড়াক। তুই চুপ থাক।
এরপর হঠাৎই ছোট মামার ফোন আসে। রাহাতের মা ফোন করেছেন, তোরা কোথায়? বাসায় আয় তাড়াতাড়ি। বলে ফোন কেটে দিলেন।
মামার পা তখন অবশ লাগছে। বাসায় গিয়ে কী বলবেন? মামা বললেন, শোন, আমরা ঘরে ঢোকার আগেই হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করব। তাতে দোষ কিছুটা কমবে।
রাহাত বলে, কান্না না পেলে?
মামা আবার রাগ হয়ে যান, এমন চড় মারব আছাড়িপিছাড়ি কাঁদবি। তারপর দুজনে উঠে বাসার দিকে হাঁটতে শুরু করে।
বাসায় ঘরে ড্রয়িংরুমে ঢুকতেই রাহাত অবাক, দাদু আর দাদি বসে আছেন। সবাই তাঁদের গল্প শুনছে। দাদু ছোট মামাকে দেখে হৈহৈ করে উঠলেন, স্যরি স্যরি, তোমাদের ফোন করতে পারিনি। হা হা হা।
বাবা বলেন, কোথায় ছিলি তোরা দুজন?
মামা কোনো রকমে বলেন, ছিলাম। ছিলাম তো।
দাদু ছোট মামাকে বলেন, তোরা যা একটা সুযোগ মিস করলি! সুযোগ জীবনে বারবার আসে না। ছোট মামা আর রাহাত দুজনেই হতভম্ব। কী বলছেন দাদু? দাদু জানালেন, আরে তোরা তো চা খেতে গেলি, অমনি এফডিসির ভেতর থেকে একটা লোক এসে বলল, এখানে কারা কারা অভিনয় করতে চান, তাঁরা হাত তুলুন। আমি আর দেরি করলাম না। আমি সঙ্গে সঙ্গেই হাত তুললাম। তোর দাদি লজ্জা পাচ্ছিল, আমি উনার হাতও উঁচু করে ধরলাম। ব্যস, লোকটা আমাদেরসহ আরো অনেককে একটা গাড়িতে তুলে নিল। তারপর ধর, সারা দিন শুটিং করল কোথাকার একটা গ্রামে। চিনিও না। আরে, বললে বিশ্বাস করবি না, তোর দাদি আর আমি একটু নাচলামও। সে একটা দৃশ্য বটে! তোরা থাকলে তোরাও যেতে পারতি।
আর আমাদের সবাইকে বলা হয়েছিল ফোন বন্ধ রাখতে। শুটিংয়ের সময় নাকি ফোন বন্ধ রাখতে হয়। তারপর আমরা বুড়ো বলে আমাদের বাসায় নামিয়ে দিয়ে গেছে। খাওয়াল, আবার হাতে শ পাঁচেক টাকাও ধরিয়ে দিয়েছে। হা হা হা…কেন যে নায়ক হলাম না।
ছোট মামা আর রাহাত চুপচাপ ভেতরের দিকে চলে গেল। রাহাত বলল, মামা, এসব কী হলো? সুযোগ তো বারবার আসে না।
মামা বলেন, কী আর হবে? কাল গিয়ে আবার এফডিসির গেটে দাঁড়িয়ে থাক।