সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬, ০২:২৩ অপরাহ্ন
নোটিশঃ
জনপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল প্রমিনিউজবিডি ডটকম এর পরিক্ষামূলক সম্প্রচার চলছে। সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। তার মানে এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা লেখার অংশবিশেষ কিংবা ছবি বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রচার বা প্রকাশ করা নিষিদ্ধ।

আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু

ঢাকা অফিস
  • আপডেট: শনিবার, ৪ অক্টোবর, ২০২৫
  • ২৭ বার পড়া হয়েছে

আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু : বিজ্ঞানচর্চা ও আবিষ্কারের মহাপুরুষ

ভূমিকা

ভারতবর্ষ তথা সমগ্র বিশ্বের বিজ্ঞানচর্চার ইতিহাসে আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু (১৮৫৮–১৯৩৭) এক অনন্য নাম। তিনি শুধু একজন পদার্থবিজ্ঞানী নন, তিনি একইসাথে জীববিজ্ঞানী, উদ্ভিদবিদ, উদ্ভিদ-শারীরতত্ত্ববিদ এবং আবিষ্কারক। তাঁর কর্মজীবন বিজ্ঞানকে এক নতুন মোড়ে নিয়ে যায়। তড়িৎচুম্বক তরঙ্গ (Radio Waves) নিয়ে তাঁর প্রাথমিক কাজ মারকোনির বেতার যোগাযোগের ভিত্তি স্থাপন করে। একইসাথে তিনি উদ্ভিদেরও অনুভূতি আছে—এই ধারণা বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণ করে জীববিজ্ঞানের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেন।

শৈশব ও শিক্ষাজীবন

জগদীশচন্দ্র বসুর জন্ম ১৮৫৮ সালের ৩০ নভেম্বর, ময়মনসিংহ জেলার রাড়ুলি (বর্তমান বাংলাদেশে) গ্রামে। তাঁর পিতা ভগবানচন্দ্র বসু ছিলেন ব্রিটিশ সরকারের ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট এবং শিক্ষানুরাগী মানুষ। তিনি চেয়েছিলেন ছেলেকে নিজের সংস্কৃতি ও মাতৃভাষার সঙ্গে যুক্ত রেখে পড়াশোনা করাতে। তাই প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ করেন স্থানীয় গ্রামীণ পাঠশালায়, যেখানে হিন্দু-মুসলিম সহপাঠীদের সঙ্গে তিনি বড় হন।

পরবর্তী সময়ে কলকাতার সেন্ট জেভিয়ার্স স্কুল এবং কলেজে তিনি পড়াশোনা করেন। সেখানে ফাদার ইউজিন লাফন্ত (Eugène Lafont) নামক একজন ফরাসি বিজ্ঞানশিক্ষকের কাছে বিজ্ঞানচর্চার অনুপ্রেরণা পান। পরে ইংল্যান্ডে গিয়ে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় ও লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিদ্যা নিয়ে পড়াশোনা করেন। কেমব্রিজে তিনি জেমস ক্লার্ক ম্যাক্সওয়েলের তত্ত্ব নিয়ে গভীরভাবে গবেষণা করার সুযোগ পান।

কর্মজীবন

১৮৮৫ সালে তিনি ভারতে ফিরে এসে কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে পদার্থবিদ্যার অধ্যাপক নিযুক্ত হন। তখন ইউরোপীয় শিক্ষকরা ভারতীয় শিক্ষকদের তুলনায় অনেক কম বেতন পেতেন। বসু প্রতিবাদ করে বেতন নিতে অস্বীকৃতি জানান। অবশেষে তিন বছরের মধ্যেই ব্রিটিশ সরকার তাঁকে সমান বেতন দিতে বাধ্য হয়। এটি তাঁর আত্মমর্যাদা ও নীতিবোধের এক উজ্জ্বল উদাহরণ।

পদার্থবিজ্ঞানে অবদান

জগদীশচন্দ্র বসুর প্রাথমিক গবেষণা ছিল তড়িৎচুম্বক তরঙ্গ নিয়ে। ১৮৯৫ সালে তিনি প্রথমবার প্রমাণ করেন যে তড়িৎচুম্বক তরঙ্গ বেতারের মতোই ভবন, দেয়াল এমনকি পর্বতের ভেতর দিয়েও অতিক্রম করতে পারে।

তিনি ক্রেসকোগ্রাফ (Crescograph) নামক একটি যন্ত্র উদ্ভাবন করেন, যা কয়েক সেকেন্ডের ভেতরে এক মিলিয়ন ভাগের এক ভাগ বৃদ্ধি বা পরিবর্তন পরিমাপ করতে পারত। এই যন্ত্র দিয়ে বসু দেখান, উদ্ভিদ বাইরের পরিবেশের প্রতি সাড়া দেয়, যেমনটা প্রাণীরা দেয়।

পদার্থবিজ্ঞানে তাঁর আবিষ্কৃত মাইক্রোওয়েভ ডিটেক্টর এবং অর্ধপরিবাহী (semiconductor) ক্রিস্টাল ব্যবহারের পদ্ধতি আধুনিক বেতার যোগাযোগের প্রাথমিক ভিত্তি স্থাপন করে। আজকের ডায়োড, ট্রানজিস্টর ইত্যাদির প্রযুক্তি তাঁর গবেষণার শেকড়ে নিহিত।

জীববিজ্ঞানে বিপ্লব

বসুর সবচেয়ে আলোচিত গবেষণা হলো—উদ্ভিদের জীবন ও সংবেদনশীলতা। তিনি প্রমাণ করেন যে গাছপালারও স্নায়ুবিক প্রতিক্রিয়ার মতো প্রতিক্রিয়া আছে। উদাহরণস্বরূপ, ছুঁইমুই গাছ স্পর্শে পাতা গুটিয়ে ফেলে, আবার আলো, তাপ বা রাসায়নিক প্রভাবে উদ্ভিদের ভিন্ন ভিন্ন প্রতিক্রিয়া ঘটে।

বসু উদ্ভিদকে নির্জীব পদার্থের মতো মনে করার প্রচলিত ধারণা ভেঙে বৈজ্ঞানিকভাবে দেখান যে উদ্ভিদেরও ‘জীবন’ আছে। এই গবেষণা তাঁকে একেবারে বিশ্ববিখ্যাত করে তোলে।

বসুর আবিষ্কৃত যন্ত্রপাতি

১. ক্রেসকোগ্রাফ (Crescograph) – উদ্ভিদের বৃদ্ধি ও প্রতিক্রিয়া পরিমাপের যন্ত্র।
২. মাইক্রোওয়েভ ডিটেক্টর – রেডিও তরঙ্গ শনাক্তকরণের জন্য।
৩. রেজোনান্স পোলারাইজার – তড়িৎচুম্বক তরঙ্গের গতি ও বৈশিষ্ট্য যাচাইয়ের যন্ত্র।
৪. বসু রেডিও – বেতার যোগাযোগের প্রাথমিক রূপ।

প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠান

১৯১৭ সালে জগদীশচন্দ্র বসু কলকাতায় প্রতিষ্ঠা করেন বোস ইন্সটিটিউট (Bose Institute)। এটি ভারতের অন্যতম প্রাচীন বৈজ্ঞানিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান। এখানে তিনি জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত গবেষণা চালিয়ে যান। আজও এই প্রতিষ্ঠান জীববিজ্ঞান, পদার্থবিজ্ঞান, পরিবেশবিজ্ঞানসহ নানা শাখায় গবেষণা চালাচ্ছে।

আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি

জগদীশচন্দ্র বসুর অবদান শুধু ভারতীয় উপমহাদেশে নয়, ইউরোপ ও আমেরিকার বিজ্ঞান জগতে সমাদৃত হয়। লন্ডন, প্যারিস, আমেরিকার বিভিন্ন বিজ্ঞানসম্মেলনে তিনি গবেষণাপত্র উপস্থাপন করেন। ১৯১৭ সালে ব্রিটিশ সরকার তাঁকে নাইট উপাধি প্রদান করে।

আলবার্ট আইনস্টাইন, রবি ঠাকুরসহ সমসাময়িক অনেক দার্শনিক ও বিজ্ঞানী তাঁর অবদানের প্রশংসা করেছেন।

ব্যক্তিত্ব ও দৃষ্টিভঙ্গি

বসু কেবল বিজ্ঞানী নন, তিনি ছিলেন দার্শনিকও। তাঁর দৃষ্টিতে জগৎ এক অখণ্ড সত্তা—মানুষ, প্রাণী, উদ্ভিদ, এমনকি জড় পদার্থও একে অপরের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। তিনি বলেছিলেন—
“উদ্ভিদের মধ্যেও জীবনের স্পন্দন আছে, যা মানুষের জীবনের সঙ্গে অভিন্ন।”

তিনি বিশ্বাস করতেন বিজ্ঞান কেবল প্রযুক্তি নয়, এটি নৈতিক ও আধ্যাত্মিক বিকাশেরও মাধ্যম।

মৃত্যু

১৯৩৭ সালের ২৩ নভেম্বর, ৭৯ বছর বয়সে জগদীশচন্দ্র বসু পরলোকগমন করেন। তবে তাঁর গবেষণা, ত্যাগ ও চিন্তাধারা আজও বিজ্ঞানচর্চার অনুপ্রেরণা।

উপসংহার

আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু ছিলেন বিজ্ঞানের অকৃত্রিম সাধক। তিনি দেখিয়েছেন, বিজ্ঞান মানে শুধু যান্ত্রিক অগ্রগতি নয়, বরং প্রকৃতি ও জীবনের সঙ্গে মানুষের গভীর সম্পর্কের সন্ধান। তাঁর অবদান ছাড়া আধুনিক বেতার যোগাযোগ, মাইক্রোওয়েভ প্রযুক্তি কিংবা উদ্ভিদের শারীরতত্ত্ব এতটা সমৃদ্ধ হতো না।

ভারতের বিজ্ঞানচর্চার ইতিহাসে তিনি এক উজ্জ্বল নক্ষত্র, যাঁর আলো আজও সমান উজ্জ্বল।

ভালো লাগলে সংবাদটি শেয়ার করুন

এই বিভাগের আরো সংবাদ
© All rights reserved © 2026 PromiNewsBD.com
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com