সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬, ১১:১৮ অপরাহ্ন
নোটিশঃ
জনপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল প্রমিনিউজবিডি ডটকম এর পরিক্ষামূলক সম্প্রচার চলছে। সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। তার মানে এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা লেখার অংশবিশেষ কিংবা ছবি বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রচার বা প্রকাশ করা নিষিদ্ধ।

শতবর্ষে শরৎচন্দ্রের পথের দাবী

ঢাকা অফিস
  • আপডেট: শুক্রবার, ৩ অক্টোবর, ২০২৫
  • ১৭ বার পড়া হয়েছে
শরৎচন্দ্র নিশ্চিত ছিলেন এর মধ্যে কোনো সাহিত্যগুণ নেই। বই আকারে প্রকাশের চিন্তা তো দূর-অস্ত। পাণ্ডুলিপিটিই ছিল নিতান্ত অবহেলার বস্তু হিসেবে। পুড়িয়েটুড়িয়ে যে ফেলেননি, সেটাই বড় ভাগ্য।

মুদ্রাকর সত্যকিঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়। দাম তিন টাকা। সাদা কাগজে মোড়া পিচবোর্ডের মলাট। বইয়ের ওপরের দিকে লাল হরফে ছাপা ‘পথের দাবী’। নিচের দিকে লেখকের নাম শ্রী শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়।
পথের দাবী একটি সংগঠনের নাম। এর প্রেসিডেন্ট সুমিত্রা। কিন্তু প্রধান কর্তাব্যক্তি সব্যসাচী, যিনি সদস্যদের মাঝে ডাক্তার নামে অভিহিত। অন্যত্র বিভিন্ন নাম। বিভিন্ন পেশা তাঁর। পেশা অনুযায়ী বিভিন্ন রূপ। এই রূপে তাঁর পরিচিত অনেকেই চিনতে পারেন না। তাইতো সরকারি বাহিনীর চোখকে ধুলা দিতে পারেন। কখনো ধরা পড়লে এমনভাবে কথা বলেন যে পুলিশ বিশ্বাস করে ছেড়ে দেয়। কারো বুঝতে অসুবিধা নেই এতক্ষণে যে এই ব্যক্তিটি আসলে একজন বিপ্লবী। ‘পথের দাবী’র মূল চরিত্র।

আমরা জানি যে মূল চরিত্র কখনোই একা থাকে না। তাকে কেন্দ্র করে থাকে অনেক চরিত্র। উপন্যাসের গল্পও থাকে তাকে কেন্দ্র করে। লেখক যা বলতে চান তার ভরকেন্দ্রও থাকে তার ভেতরে। এ ক্ষেত্রে সব্যসাচী ওরফে ডাক্তারের সবচেয়ে কাছের সঙ্গী ভারতী। ধর্মে খ্রিস্টান। জাতিতে বাঙালি। মা ধর্মান্তরিত হয়ে ইংরেজ বাবুকে বিয়ে করলে তার জন্ম হয়। সব্যসাচী আর ভারতীর কথোপকথনের মধ্য দিয়েই প্রকাশিত হয় উপন্যাসটির মূল বক্তব্য। ভারতীর সঙ্গে পরিচিত হওয়ার আগে আমরা পরিচিত হই অপূর্বর সঙ্গে। এমএ পাস করা, ভালো চাকরি পাওয়া এই ভদ্রলোকটির আখ্যান শুরুটা জুড়ে—প্রায় অর্ধেকটাই। তার সঙ্গে আছে ভারতী। অপূর্ব এক মিশ্র সংস্কৃতির পরিবারে বেড়ে ওঠা যুবক। মা হিন্দুত্ববাদের সংস্কার নিয়ে থাকেন। বাবা মানেন না এগুলো। তিনি লিবারেল, আধুনিক ইউরোপিয়ান কালচারের মানুষ। তাঁর বড় দুই ছেলেও। সবার ছোট অপূর্বই মায়ের অনুসারী। ব্রাহ্মণ্যবাদী সংস্কারী জাতপাত ভেদাভেদযুক্ত সনাতনি। বিশাল মাইনের চাকরি নিয়ে সে চলে আসে বার্মায়। সামান্য বিষয় নিয়ে ঝগড়াঝাঁটি আদালত পর্যন্ত গড়ালে অন্যায়ভাবে আদালত তার অর্থদণ্ড দেন। সহকর্মী আগেই বলে দেয় সে জিতবে না। কারণ তার বাদী হলো ইংরেজ বাবু। ইংরেজ বাবু বনাম অ-ইংরেজদের ক্ষেত্রে ইংরেজ বাবুরা কখনোই হারে না। স্টেশনে গিয়ে বেঞ্চিতে বসার অপরাধে অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান কিছু ছোকরার হাতে সে অপদস্থ হয়। বিচার চাইতে গেলে স্টেশন মাস্টার দূরদূর করে তাড়িয়ে দেয়। অপূর্ব বুঝতে পারে তখন স্বাধীনতার মূল্য।

এরপর সে ভারতীর সঙ্গে বিভিন্নভাবে জড়িয়ে যায়। একদিন ভারতীর খোঁজে তার আবাসে গেলে বুঝতে পারে, কোনো এক সংগঠনের কাজ চলমান। আলোচনা চলছে। এক ভদ্রলোক উবু হয়ে শুধুই লিখে যাচ্ছেন। কোনো কথা বলছেন না। সভার কার্যক্রম শেষ হলে যখন লোকটি মুখ তুলে স্বাভাবিক হয়ে বসেন, তখন অপূর্ব অবাক হয়ে যায়। আরে! এ তো সেই লোক, যাঁকে তার বাবার বন্ধু পুলিশ অফিসার সব্যসাচী সন্দেহে জাহাজ থেকে গ্রেপ্তার করেছিল। তখন নাম জেনেছিল গিরীশ মহাপাত্র। সন্দেহজনকভাবে আটক করলেও জিজ্ঞাসাবাদে ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল। তার মানে, সেদিনের সন্দেহ অমূলক ছিল না!

অপূর্ব জানতে পারে, এই সংগঠনের নাম পথের দাবী। এর মূলমন্ত্র, ‘আমরা সবাই পথিক। মানুষের মনুষ্যত্বের পথে চলবার সর্বপ্রকার দাবী অঙ্গীকার করে আমরা সকল বাধা ভেঙেচুরে চলব।’ কিন্তু এটুকুই সব নয়, সব্যসাচী ও ভারতীর কথোপকথনের মধ্য থেকে উঠে আসা মূল লক্ষ্য, যা যুক্তিতর্ক-অভিনিবেশ-প্রেক্ষাপট-সিদ্ধান্ত-কৌশল-মনোমালিন্য ইত্যকার বিষয়ের মাধ্যমে খোলাসা হয়। উপন্যাসের মূল চরিত্র সব্যসাচী হলেও সবচেয়ে বেশি ব্যাপ্তি ভারতীর। যখন সব্যসাচী উদয় হয়, তখন তার সঙ্গে ভারতী। যখন অপূর্ব থাকে তখন তার সঙ্গে ভারতী। এমনকি অপূর্ব যখন চাকরি বাঁচানোর স্বার্থে অফিসে সবকিছু বলে দেওয়ার পর সংগঠনের নিয়মানুযায়ী তার মৃত্যুদণ্ড ধার্য হয়, তখনো ভারতীকে সেই দুর্গম জায়গায় নিয়ে যাওয়া হয়। তার মানসিক অবস্থা বিবেচনা করে সভ্যদের বিপরীতে দাঁড়িয়ে তার মৃত্যুদণ্ড রহিত করে সব্যসাচী। এভাবে তার মানবিক দিকের সঙ্গে পরিচিতি হতে পারি আমরা। শশী কাব্যচর্চা করে বলে তাকে দলে ভেড়াতে চায় না। কারণ এটা তার কাজ নয়। ভারতীর ভেতর স্বাধীনতার একাগ্র ও নিরঙ্কুশ ক্ষুধা নেই বলে তাকেও দলে ভেড়াতে চায় না। অপূর্বর সঙ্গে গাঁটছড়া বাঁধার জন্য উদ্বুদ্ধ করতে থাকে। জীবনকে হাতের মুঠোয় নিয়ে সে পুরো ভারতবর্ষ, বার্মা, বাংলাদেশ, সিঙ্গাপুর ঘুরে ঘুরে গুপ্ত রাজনীতি সংগঠিত করে। সে খুনাখুনি পছন্দ করে না। কিন্তু প্রয়োজনে করতেও দ্বিধা করে না। অপূর্বর মৃত্যুদণ্ড রহিত করা নিয়ে বিরোধ বাধলেও সংগঠন টিকে থাকে। কিন্তু বিরোধ বাধে তাদের কার্যক্রমের পরিধি নিয়ে। সব্যসাচী চায় ভারতবর্ষের নিরঙ্কুশ স্বাধীনতা। একদম তা প্রশ্নহীন। শর্তহীন। এবং তা বিপ্লবের মাধ্যমেই। অন্যরা মনে মনে তা চাইলেও বুঝতে পারে ইউরোপের শক্তির কাছে নিজেদের শক্তির সীমাবদ্ধতা। তারা চায় আগে নিম্নশ্রেণির মানুষের মুক্তি, শ্রমিকদের অধিকার, শিক্ষা, বাসস্থান, চিকিৎসা, কৃষকের অধিকার। ভারতীর সঙ্গে দীর্ঘ কথোপকথনে বের হয়ে আসে তাদের স্ব স্ব যুক্তি, কর্মের পরিধি নির্ণয়ের নানা কৌশল। কিন্তু উদ্দেশ্য একই হলেও ব্যাপ্তির বিশালত্বের পার্থক্যের কারণে তাদের ভেতরে তর্ক হয়, যুক্তির মারপ্যাঁচ হয়। তা তীক্ষ, শাণিত, মর্মভেদী। কাউকে ছেড়ে কথা বলে না সেসব।

বিরোধপূর্ণ সভা চলাকালে সবই যখন একে একে নীরব হয়ে যায় সব্যসাচীর যুক্তির নিচে, তখন ভারতী দ্ব্যর্থহীনভাবে বলে, ‘কিছু মনে করো না দাদা, কিন্তু বরাবরই আমি দেখে এসেছি পল্লীর প্রতি তোমার সহানুভূতি কম, তোমার দৃষ্টি শুধু শহরের উপরে। কৃষকদের প্রতি তুমি সদয় নও, তোমার দুচক্ষু আছে কেবল কারখানার কুলি-মজুর-কারিগরদের দিকে। তাই তোমরা পথের দাবী খুলেছিলে এদেরই মাঝখানে আর হৃদয় বলে যদি কোনো বালাই তোমার থাকে, সে শুধু ছেড়ে পড়ে আছে মধ্যবিত্ত, শিক্ষিত, ভদ্র-জাতি নিয়ে। এরাই তোমার আশা-ভরসা, এরাই তোমার আপনারজন। বল এ কি মিথ্যা কথা?’

প্রত্যুত্তরে সব্যসাচী বলে, ‘মিথ্যে নয় বোন, অত্যন্ত সত্য। কতবার ত বলেছি তোমাকে, পথের দাবী চাষা-হিতকারনী প্রতিষ্ঠান নয়, এ আমার স্বাধীনতা অর্জনের অস্ত্র। শ্রমিক এবং কৃষক এক নয় ভারতী।’

আহত হয়ে সদস্যরা ধরা পড়ছে। সিঙ্গাপুরে ধরা পড়েছে তাদেরই আরেক সহযাত্রী। সে বলে দিয়েছে অনেক কিছু। সব্যসাচী অনেক ঝুঁকি নিয়ে ভারতীসহ অন্যদের অনুরোধ উপেক্ষা করে চলে যাচ্ছে তাকে সায়েস্তা করতে। অথচ সে নিজেও একজন দাগি আসামি। সিঙ্গাপুরে এর আগে দুই বছর জেলও খেটেছে। এখন সেখানে গেলে মৃত্যুর সম্ভাবনা অধিক। তবু তাকে আটকানো যাচ্ছে না। প্রকৃত বিপ্লবী হলে যা হয়।

শশী অনেক টাকা পেয়েছে পৈতৃক সম্পত্তি বিক্রির মাধ্যমে। সব্যসাচীর ফান্ডে তা জমা করে। সব্যসাচী গ্রহণ করেও তা ফেরত দেয়। সাবিত্রী যাচ্ছে বাপের বাড়ি। সেখানে সেও বিশাল অঙ্কের টাকা পাবে। ভারতীকে সংসারী হওয়ার উপদেশ দেয় সব্যসাচী। শশীবাবুকে ব্যস্ত থাকতে বলে কবিতা নিয়ে। অপূর্ববাবু সন্ন্যাসব্রত নিয়ে চলে যাচ্ছে। অন্য সদস্য আহত হয়ে হাসপাতালে। বাঁচলে নির্ঘাত মৃত্যুদণ্ড। অন্যরা দ্বিধাবিভক্ত। পথের দাবী চালিয়ে রাখার মতো এখানে আসলে কেউ রইল না। কিন্তু প্রকৃত পথের দাবী তো শেষ হয়ে যায় না। তাই সব্যসাচী অবিচল, আত্মবিশ্বাসী। অটল তার স্বাধীনতার স্বপ্নে। এবং তা বিপ্লবের মাধ্যমেই সম্ভব হবে বলে দৃঢ় আশাবাদী। বৃষ্টি ও ঝড়-বিক্ষুব্ধ রাতে তাদের এই শেষ সভায় এভাবেই পথের দাবীর মীমাংসা হয়ে যায়। এর ভেতরেই বোঁচকা-বুঁচকি নিয়ে বৃষ্টির বোঝা ও ঝড়ের তাণ্ডব জেনেও সব্যসাচী বেরিয়ে পড়ে। যাওয়ার ঠিক আগে সবাই উপস্থিত থাকলেও শুধু ভারতীর উদ্দেশে বলে, ‘একাই আরম্ভ করেছিলাম ভারতী।’ সবার অশ্রুপাতের ভেতর দিয়ে শেষ হয়ে যায় পথের দাবী।

প্রকাশের পর বাংলা সরকারের Year Book-এ বই সম্পর্কে লেখা হয়েছিল, `The most powerful of sedition in almost every page.’

এরপর ‘পথের দাবী’ বাজেয়াপ্ত করার প্রস্তাব করে পুলিশ কমিশনারকে ১৯২৬ সালের ২৩ নভেম্বর চিফ সেক্রেটারি চিঠি লেখেন। শুরু হয়ে যায় পথের দাবী নিষিদ্ধের প্রক্রিয়া। নানা ধরনের বাদানুবাদের পর অবশেষে ১৯২৭ সালের ৪ জানুয়ারি বইটি নিষিদ্ধ হয়।

নিষিদ্ধের পর স্বভাবতই শরৎচন্দ্র খুব দুঃখিত হন। শেষ ভরসা হিসেবে তিনি রবীন্দ্রনাথের শরণাপন্ন হন। তাঁর ধারণা, রবীন্দ্রনাথ যদি এর প্রতিবাদ করেন, তাহলে হয়তো বইটি রাহুমুক্ত হবে। এই উদ্দেশ্যে তিনি রবীন্দ্রনাথকে নিজ হাতে বইটি উপহার দেন। বইটি পাঠান্তে রবীন্দ্রনাথ একটি চিঠি লেখেন শরৎচন্দ্রকে, ‘তোমার পথের দাবী পড়ে শেষ করেছি। বইখানি উত্তেজক। অর্থাৎ ইংরেজদের শাসনের বিরুদ্ধে মনকে অপ্রসন্ন করে তোলে। লেখকের কর্তব্যের হিসাবে সেটা দোষের না হতে পারে—কারণ লেখক যদি গর্হণীয় মনে করেন তাহলে চুপ করে থাকতে পারেন না। কিন্তু চুপ করে না থাকার যে বিপদ আছে সেটুকু স্বীকার করাই চাই।… আর আমার যে অভিজ্ঞতা হয়েছে তাতে এই দেখলাম—একমাত্র ইংরেজ গভর্নমেন্ট ছাড়া স্বদেশী বা বিদেশী প্রচার বাক্যে বা ব্যবহারে বিরুদ্ধতা আর কোনো গভর্নমেন্ট এতটা ধৈর্যের সঙ্গে সহ্য করে না।’

রবীন্দ্রনাথের চিঠিতে ইংরেজদের প্রতি যেমন সমর্থন রয়েছে, তেমনি লেখকের সৃষ্টি-সক্ষমতার প্রশংসাও রয়েছে। কিন্তু তাতে বইটির রাহুমুক্তির কোনো সহযোগিতা নেই। শরৎচন্দ্র রবীন্দ্রনাথের চিঠি পেয়ে খুব বেদনাহত হয়েছিলেন। চিঠির উত্তরও লিখেছিলেন। কিন্তু তা আর পাঠাননি। রাহুমুক্তির যে আশায় তিনি তাঁর শরণাপন্ন হয়েছিলেন সেটাই যখন হলো না, চিঠি লিখে আর কী হবে। হয়তো এমনটিই ভেবেছিলেন তিনি।

পরবর্তী কোনো সময়ে নিষেধাজ্ঞা উঠেছিল কি না, সে সম্পর্কে তেমন কিছু জানা যায় না। কিন্তু এর প্রধান চরিত্র সব্যসাচীর মতোই সব নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে পথের দাবী মেটানোর সকল উপাদান ধারণ করে টিকে গেছে ‘পথের দাবী’।

ভালো লাগলে সংবাদটি শেয়ার করুন

এই বিভাগের আরো সংবাদ
© All rights reserved © 2026 PromiNewsBD.com
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com