মোমিনা ডুব পাড়ে। খাইস্টা ননদের কেচ্ছা কয়। চাঁদমালা, ঝাঁঝি দাম টোকায়। চেয়ারম্যান পুকুরপারে থমকে দাঁড়ায়। মাতলা মাতলা দশা মিয়ার।আবুল্যা, এই গেদি কেডা রে? রাজা বাদশার ঘরে এমন রূপের নারী জন্মায়। এই মালডা আমার লাগব কলাম। বহুত খাসা মাল।’আবুল্যার হাতজোড়। হুজুরের পিছ পিছ হাঁটা ধরে। বড় মিয়ার মনডা ঘাটলায় পইড়া রইল। এমন পাকনা ডালিম্ব গেরস্তের ঘরে। মৃধার অজান্তে পইচা যাইব। আবুল্যা ডরায়!…
হাটবার। শাপলার জলার উঁচা-নিচা মাটির রাস্তায় হাঁটা ধরছে মাখনা মিয়া। কান্দের ওপরে ঢাউস ধামায় পালানের কদু, মাষকলাই।
বেজুত ডান পাওখান নিয়া জন্মের জ্বালা।
ল্যাংচাতে ল্যাংচাতে জলা পার হয়ে তেমাথার আকাশনিমগাছটার নিচে ল্যাটকা মাইরা বসে খানিক দম নেয়।
হাটের গুঞ্জন শোনা যায়। ভোমরার গুনগুনানি। রসুন, পিঁয়াজ, শুঁটকি মাছের গন্ধ বাতাসে। মালসামানা পানির দামে বেঁচে আটাইশ চাল, আধা কেজি সরিষার তেলের বোতল নাচাতে নাচাতে মাখনা পাও টানতে টানতে চলছে।
সাঁঝ নামলে শুদাই ডর লাগে! বাঁশঝাড়ের বোগলে বনবিলাই, আগুনের চাকতি চক্ষু। ঘুরাফেরা করে শিয়াল, খাটাশ। হাটুরেরা যে যার মতো হনহন করে পাশ কাটায়া ছুটছে। লুলা টুণ্ডা বলে হাতখান বাড়ায়ে দিবেনে পাখিয়ার কেউ? জে না। সেইডা আজগুবি প্যাঁচাল।
জলার নাগাল মিলছে। আশ্বিনের সাঁঝ নামবে। লুলা পাওখান বাম হাত দিয়া চাইপা ধরে আগায়।…
এইডা কী দেখতাছি? ওইডা কী? চোখ জোড়া জলার পুব কোনায় যায়া গোত্তা খায়। এইডা কি রঙের বায়স্কোপ? ইয়া মাবুদ আল্লা।
মামাতো বুনডাই জলার মধ্যে! খালি থোপ থোপ রক্তের মধ্যে চিত হয়া শুয়া রইছে। কল্লাডা ঝুল্যা রইছে। আসমানের চান জলায় ভাসতাছে গো।
‘চম্পাকলি বুন গো। এইডা কী দেখাইল আল্লা।’ হাড্ডিসার বুকে থুতু ছিটায়। সুতানলি সাপ জড়ায়া ধরছে দুই পায়।
মাখনার চিক্কুরে জলায় ঢেউ ওঠে। পরক্ষণে নিজের ঘাম-জবজবা মুখ দুই হাতে চেপে ধরে।
‘আমি রাতকানা। কিচ্ছু দেহি নাইকা।’ জিন পরির কাম।
‘এইডা দেখার নসিব আমার!’ মাখনা গাঞ্জাখোরের মতো এলোপাতাড়ি পাও ফেলে।…
পাখিয়ার চাষাভুষা, আড়তদার, হুজুর, কলু, তাঁতি ফিসফিসানি কথার ব্যারামে পড়ল। নিচা গলায় কানকথা কয় খালি, গাঁয়ের জনমানুষ গো।
খাসকাউলিয়া, বড়খাদা, মুলাকান্দি, বেলকুচির মানুষজন তমিজ লাঠিয়ালের উদাম ভিটায় রাতবিরেতে বনবিলাইয়ের মতো আওয়া যাওয়া করে। কানাকানি কী কয়! তাগরে পরান কান্দে। বেহুঁশ দশা। চামচিকা কিচকিচ করে খালি। রাতচরা পক্ষী কান্দে—
ইজ্জতের বড়াই ছিল মেয়াডার। চম্পারে কৃষ্ণপক্ষের নিশিরাতে পাঁজাকোলা কইরা তুলে নিয়া গেল কোন হারামি? খচ্চরের জাত? শুয়ারের বাচ্চা? বৃক্ষের পাতা, কাকপক্ষী সাক্ষী।
মৃধার ইটভাটায় লাকড়ির সঙ্গে তমিজ লাঠিয়াল, তার ত্যাল-চকচকা লাঠিখানও ছাইভস্ম হয়া শেষ। নিমিষে। আহা উঁহু করে পড়শি, সেও গোপনে। কান্দে জারে জার গোপনে।
ময়মুরুব্বিরা হুক্কায় দম দিয়া কেচ্ছা কইতেন। কী কেচ্ছা? সেডা হইল সাদা সায়েবগুলার নীলকুঠির প্যাঁচাল। ধানি জমিনগুলায় জবরদস্তি নীল চাষ করাইত। উনিশ-বিশ হইলে চাবুকের বাড়ি। চাষার সোন্দর বউঝি নজরে পড়লে গায়েব। পাখিয়ার কুদিন গেছেগা। লড়াই হইছিল বেদম। বিটিশরা পলাইছে। যেগুলা বল্লম, টেডা, সড়কির আঘাতে মরছে, সেগুলার বদ আত্মা নাকি পাখিয়ার ঝোপঝাড়ে ঘুরে বেড়ায়। তারাও গোলাবারুদ ফাটাইছে। চাষাভুষারা মরণপণ লড়াই করছিল। সে বহুত কালের কথা। ভূত-পেত একখানে কতকাল থাকে!…
খাসকাউলিয়া ময়েজ মৃধার যেন বা বাপ-দাদার তালুক! জোতদার চেয়ারম্যান গাঁয়ের বাদশা! তেনার ইশারাই যথেষ্ট। রুহুর মধ্যে কয়লা, বিষপিঁপড়া। ঘুরঘুট্টি অমাবস্যা। নিশিরাতের কুহক।
চম্পার যুবতি শরীরে জোনাক জ্বলে। ফরসা দেখা যায় কমিনার দালানকোঠা। সঙ্গে দুই সই। নারীধন উড়াল ধরছে।…আসমানী উড়াল!
রূপের নারী আসতাছে। এমুন দরের মানুষটার রাতের নিদ্রা হাওয়া। আছর করছে মন্দ পেত দানো। হাট-বাজারে চাষাভুষারা কওয়া-বলা করে। নিচা গলায়। ডাক্তার-কবরেজ, হুজুর, তাবিজ-কবজ, মাজার, পানি পড়া বরবাদ। কঠিন জাদুটোনা। আজগুবি কেচ্ছা।
ময়ূর নকশি পালঙ্কে অগুনতি তারকাঁটা। শিথানের ফুটি কার্পাস বালিশে খোয়া খচখচ করে। খালি চোকখা চোকখা খোয়া। নিঁদ আহে কেমনে! খোয়াব না বল্লমের কোপ। মরা মেয়ালোক কেমনে এত আস্পর্ধা দেখায়। মাথায় সারা শরীরে জমজমের পানি ছিটায় মৃধা।
ফিনিশ মাল চম্পাবিবি আইছে রে! তোবা-তিল্লা করলাম মওলা, মুর্শিদ। কাম হইল না যে! মস্তকে ভাটার আগুন, উরে মা। কব্বরের মেয়ালোক?
থু মেয়ালোক! তোর দুই পয়সার ইজ্জত। হেইডার বহুত বাহাদুরি। ফকিন্নি শীতল কব্বর থেকা মৃধার দালানে আসচে। ছিনাল জানি কোনহানকার! সেগুন কাষ্ঠের দুয়ার ডাকিনী হাট কইরা খোলে।
কী বড় আস্পর্ধা! ঘামে চুপচুপা মিয়া। শান্ত চম্পা তারকা রাক্ষসীর সুরুত ধরছে! তার মস্তক কান্দের উপরে নাই। হাতের তালুর উপরে মস্তক। সার্কাস দেখায়। বাপের জন্মে এমুনডা মৃধা দেখেই বা কেমনে? নিজ হাতে ছুরিডা বসায়া দিছিল বাপের বেটা। বেজায় তেড়িবেড়ি করছিল চম্পাবিবি।
কালা জাদুটোনা। বাণ মারছে। মুর্দায় কেমনে বাণ মারে! বাপের বেটা মৃধা তুকতাকে ডরায়? বিড়বিড় করে সে—খোয়াবের গজব। বদবেটি খোয়াবে নাচায়।
চম্পা খিনখিনা গলায় হারামি হাস্য হাসে। বল্লমের দাগা লাগে ময়েজের উদাম সিনায়।
‘শোন রে বুন। সোন্দর মেয়া ছাওয়াল হইল ধনবান পুরুষগো রঙের পুতলা। খানিক আমোদ-ফুর্তি হইছে। মামলা খতম। মরণ তো একদিন হইতই। দাফনে কাফনে দোয়া দরুদে এমন কপাল হইত?’
ইজ্জতওয়ালি মাগি বেহুদা ভড়ং ধরছে। নিস্তার নাই।
কব্বর ফাটাইয়া জিয়ন্ত হয় কেমনে? পরলোকের ডর নাই! মুর্দা মেয়ালোক। মনে হইতাছে সে কানা লুলা হয়া যাইতাছে। গলা দিয়া চিক্কুর বারায় না। শরীর অবশ। নজর ঝাপসা।
খিনখিনে হাসি চম্পার, ‘চুপ যা গেদর! তোর বুন কেডারে হারামি? নয়া হাদিস কবি তো জিবলা টাইনা খসাবোনে। আয়নাবু, শিখাদি আয় কুত্তার বাচ্চার বুকের উপরে নাচি। আমাগর শরীলডা ম্যাঘের মতন এহন। উড়ি আর ঘুরি! ম্যাঘের মতন হালকা।’
রাতভর দাপাদাপি কব্বরের ছিনাল মেয়ালোকগুলার সঙ্গে। বড় বিবি ব্যারামি। মাইঝলা বিবির নয় মাস। ছোট বিবি কোন নাগরের বিয়া খাইতে বাপের বাড়িত। আমি মৃধা! কই বডিগার্ড, চ্যালা চামুণ্ডারা! কই ছাওয়াল মেয়া?
রাত ঘন হয়। বাঘ হইছে বিলাই। গলা শুকায়া কারবালা।
ফকিন্নিরে সহি কায়দায় দোয়া কালাম পড়ায়া দাফন কাফন দিলাম। গাঁটের পয়সা খরচা করলাম। দারোগা পুলিশের পকেট ভরাইলাম! কুবাতাস বয় কী কারণ? পেত্নিগুলারে কেমনে কী করি?
কৃষ্ণপক্ষের রাত। আজও চম্পা খাটের কিনারায়। হায় আল্লাহ। কেবল খানিক ঘুম নামছিল পোড়া চক্ষু জোড়ায়! আইজকাও আসছে!
ময়েজ গলায় চাকভাঙা মধু মাখায়, ‘চম্পাবিবি, তোরে বড় হুজুর দিয়া দাফন কাফন দিলাম। চল্লিশা দান সদকা সকল কিছু করছি। আল্লাহর কসম, ঘুমায়া পর গিয়া কব্বরের খোঁড়লে। ওইখানে শান্তি রে, চম্পা।’
নিশিরাতে গায়েবি আওয়াজ। মরা মেয়ালোকের ধমকি-ধামকি, গজব। মৃধার রাতবেরাতের হাবিয়া দোজখ। বেহুঁশ দশা, পচা লিচুর মতন ঘোলা নজর। আশেকানরা দূরদূরান্তে টুকি টুকি খেল খেলে রে!
হারামির ছাও, কুদরত ট্যারা কী সব্বনাশটাই না করছে। ঘুটঘুট্টি রাতে বেতমিজ দেমাগি চম্পাবিবির লাশ বাঁশঝাড়ের গহিনে ফেলার হুকুম জারি ছিল, গাঞ্জাখোর ট্যারায় ফেলাইছে শাপলার জলায়। হারামিটারে কেরাসিনে চুবাইয়া দিয়াশলাই কাঠি জ্বালাইয়া দেওয়া লাগবে।
দিনরাত মৃধার ঘর-গেরস্তিতে তুলকালাম। শতেক বিঘা ধানি জমিজিরাত, দখল করা পুকুর, আমবাগান, ইটভাটা। গোনাগুনতি নাইকা! তিন বিবির ছাওয়াল মেয়ারা তাগরে হিস্যা নিয়া পেরেশান। ঘণ্টায় ঘণ্টায় তুলকালাম।…
বড় ডাক্তার জবাব দিয়া দিছে। মনের মধ্যে কঠিন ব্যারাম। মুঠা মুঠা ওষুধ গেলে তিন বেলা। মানুষটা গর্তের খ্যাঁকশিয়াল।
টলতে টলতে সেই শাপলার জলায় যায় সে। কেউ আটকাতে পারে না। নিজের কল্লাটার ভার আর সে বইবার পারে না। জলার জলে গর্দান চুবায়। থম মেরে বসে থাকে। ডরায় না কাকপক্ষীও। মাঝবয়সী পেটা শরীলডা ফাল দিয়া দিয়া ওঠে।
পাখিয়ার গেরস্তরা এখন উঁচা গলায় কথা কয়। বউঝিরা লতি তোলে। হেলেঞ্চা শাক টোকায়।…
মেলায় যায়, ডাল ঘুঁটনি, পিঠার ছাঁচ কেনে।
অমাবস্যা রাতে এক পারা কোরান পড়ে, আয়তুল কুরসি, চার কুল পড়ে চম্পাকলির জন্য। লাঠিয়ালের জন্য দোয়া হয় বায়তুন নাজাত জামে মসজিদে।
চাষা মানুষজন হাটে যায়। লুলা মাখনাও কলার থোড়, কলাইশাক বেচতে যায়। তেলের শিশি নিতে ভুল হয় না। বউয়ের বায়না শুঁটকি আর মুলার।
শাপলার জলার কাছ ঘেঁষে হাঁটতে বুকে এখনো ঢেঁকির পাড় পড়ে মাখনার। লাঠিয়ালের উঠানে বাগডাশা, ঘরে চামচিকা, হুতুমপেঁচা। ফুলের সুবাস বাতাসে কান্দে।
জলার বোগলে বসে বিড়বিড় করে কেডা?
লোকটা যে একটা লোক সেটা জানি, গেরস্তগর ইয়াদ নাই।
বারপাখিয়ায় আর শাপলার জলা নাই। ওডা এখন চম্পার জলা। আশেকান চ্যালা-চামুণ্ডার ছায়া ধারেকাছে নাই।
বর্ষার কালে চম্পা জলায় শত শত রক্তবর্ণ শাপলা ফোটে। কী লাল বাপুরে! চোখে চক্কর দেয়। জলার কিনারে কুহকের কানাকানি। জড়ভরত ময়েজ জলার কিনারে থম মেরে বসে থাকে। নিজেও জানে না কী বিষয়!
আছর করছে কব্বরের জিয়ন্ত লাশ। জাহেরি বাতেনি বোঝে কোন আলেম? হুজুরের তাবিজ কবজে হলকুম অদৃশ্য। কাক ঠোক্কর দেয় আউলা চুলে। মানুষটা যে একটা মানুষ, সেই বিষয়ডা কপ্পুর হয়া গেছে রে। গায়েব হয়া গেছে ময়েজ মৃধা, সেদিনকার ঘাগু ইবলিস। পিঁয়াজের খোসাডা পইড়া রইছে! জলার কিনারে জবুথবু, ল্যাটকা মেরে বসে থাকে একলা এক উলুখড়।