সাহিত্য ও ভাষার প্রফেসর, অগ্রজ নোবেল পুরস্কারজয়ী সাহিত্যিক, সাহিত্য সংগঠনের প্রধান—এই ধরনের ব্যক্তিরা নোবেল সাহিত্য পুরস্কারের জন্য মনোনয়ন দিয়ে থাকেন।
দুলাল আল মনসুর
সাহিত্য ও ভাষার প্রফেসর, অগ্রজ নোবেল পুরস্কারজয়ী সাহিত্যিক, সাহিত্য সংগঠনের প্রধান—এই ধরনের ব্যক্তিরা নোবেল সাহিত্য পুরস্কারের জন্য মনোনয়ন দিয়ে থাকেন।
এবারও তালিকার দ্বিতীয় স্থানে আছেন জাপানের কথাসাহিত্যিক হারুকি মুরাকামি। ৫০টির বেশি ভাষায় অনূদিত হয়েছে তাঁর লেখা। ফ্রাঞ্জ কাফকা পুরস্কার, ওয়ার্ল্ড ফ্যান্টাসি পুরস্কারসহ অনেক পুরস্কার পেয়েছেন তিনি। আর সবচেয়ে বড় পুরস্কার হলো পাঠকের ভালোবাসা; সেটা পেয়েছেন অপরিমেয়। জাপানের সমসাময়িক কালের প্রভাবশালী নারী লেখকদের অন্যতম হিরোমি ইতো। প্রধানত কবিতা ও প্রবন্ধ লেখেন ইতো।
জাপানের বড় বড় সাহিত্য পুরস্কারের অনেকগুলো পেয়েছেন ইতো। জাপানের আরেকজন নোবেল-সম্ভাব্য লেখক হলেন ইওকো ওগাওয়া। কথাসাহিত্যিক ওগাওয়া জাপানের প্রধান সাহিত্য পুরস্কারসহ আন্তর্জাতিক একাধিক পুরস্কার পেয়েছেন। অন্যদিকে কবি-কথাসাহিত্যিক ইয়োকো তাওয়াদার নামও চলে আসে আলোচনায়। জাপানের কথাসাহিত্যিক ও প্রবন্ধকার মাহোকো ইয়োশিমোতোর লেখক নাম বানানা ইয়োশিমোতো। জাপানসহ আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক জনপ্রিয় ইয়োশিমোতো। মুরাকামি এবং জাপানের ভৌগোলিক অবস্থান অবশ্যই চীনের লেখকদের মতোই আরেকটা বিষয় মনে করিয়ে দেয়—গত বছরের হান কাংয়ের পুরস্কারপ্রাপ্তি।
এবারে তৃতীয় অবস্থানে দেখা যাচ্ছে মেক্সিকোর কথাসাহিত্যিক ক্রিস্টিনা রিভেরা গারজাকে। গারজা বর্তমান সময়ের মেক্সিকোর প্রধান লেখকদের অন্যতম। লেখালেখির সঙ্গে শিক্ষকতা পেশার সঙ্গেও যুক্ত তিনি। মেক্সিকোসহ যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানোর কারণে দুই দেশের নানা জায়গায় বসবাস করেছেন। সে অভিজ্ঞতার প্রভাব পড়েছে তাঁর লেখায়। উপন্যাসের সঙ্গে তিনি কবিতা, ছোটগল্প ও স্মৃতিকথাও লিখেছেন। ‘নো ওয়ান উইল সি মি ক্রাই’, ‘ডেথ টেকস মি’, ‘দি ইলিয়াক ক্রেস্ট’, ‘ভার্দে সাংহাই, ‘দ্য টাইগা সিনড্রোম’, ‘লিলিয়ানাস ইনভিনসিবল সামার’ তাঁর লেখা বইয়ের অন্যতম।
তালিকার চতুর্থ স্থানে আছেন স্প্যানিশ লেখক এনরিক ভিলা-মাতাস এবং অস্ট্রেলিয়ান লেখক জেরাল্ড মারনেন। স্পেনের সমসাময়িক সেরা লেখকদের অন্যতম ভিলা-মাতাস। ভিলা-মাতাসের উপন্যাসের মধ্যে প্রবন্ধের ছোঁয়া খুব সাধারণ বিষয়। তাঁর কাছে সাহিত্যের সব শাখাই সমান গুরুত্বপূর্ণ। ‘লা অ্যাসেসিনা ইলাস্ত্রাদা’, ‘ইম্পোস্তুরা’, ‘লেহোস দে ভেরাক্রুজ’, ‘ডক্টর পাসাভেন্তো’, ‘এল ভিয়াহে ভার্টিকাল’, ‘ডাব্লিনেস্কা’. এন্টেভিডিও’ তাঁর অন্যতম উপন্যাস।
অস্ট্রেলিয়ার বর্ষীয়ান লেখক জেরাল্ড মারনেন উপন্যাস, ছোটগল্প, প্রবন্ধ ও কবিতা লিখে থাকেন। তিনি বাইরের জগতে পরিচিতি পেয়েছেন প্রধানত তাঁর ১৯৮২ সালের উপন্যাস ‘দ্য প্লেইনস’ লিখে। এরপর ১৯৮৫ সালে প্রকাশ করেন ‘ল্যান্ডস্কেপ উইথ ল্যান্ডস্কেপ’; ১৯৮৮ সালে প্রকাশ করেন ‘ইনল্যান্ড’; ১৯৯০ সালে লেখেন ‘ভেলভেট ওয়াটার্স’ এবং ১৯৯৫ সালে লেখেন ‘এমার্যাল্ড ব্লু’। এই সময়ে প্রকাশিত তাঁর বইগুলো মোটামুটি স্মৃতি ও চিত্রকল্পের সঙ্গে জন্মভূমির সম্পর্ক নিয়ে কথা বলে। আর এ বইগুলোতে তিনি কথাসাহিত্যের সঙ্গে প্রবন্ধের মিশেল দিয়েছেন অবলীলায়। তাঁর পাঠকপ্রিয়তার আরো কারণ হলো তাঁর বিশেষ গদ্যশৈলী এবং অস্ট্রেলিয়ার ভূমির নিজস্বতা, সেখানকার বাসিন্দাদের শিকড়ের পরিচয় এবং স্মৃতি তুলে আনার কাজ।
কানাডার লেখক, কবি, কথাসাহিত্যিক ও সাহিত্য সমালোচক মার্গারেট অ্যাটউড বিশ্বসাহিত্যের পাঠকের খুব প্রিয়। লিঙ্গ পরিচয়, ধর্ম, পুরাণ, ভাষার শক্তি, জলবায়ু পরিবর্তন—এসব বিষয় প্রাধান্য পেয়েছে অ্যাটউডের লেখায়। ১৮টি কবিতার বই, ১৮টি উপন্যাস, ১১টি প্রবন্ধের বই, ৯টি ছোটগল্পের সংকলন, ৮টি শিশুতোষ বইসহ অনেক প্রকাশনা রয়েছে বহুলপ্রজ এই লেখকের।
এবারের নোবেল পুরস্কারের সম্ভাব্য লেখক হিসেবে আছেন কানাডার কবি, প্রবন্ধকার, অনুবাদক প্রফেসর এন কারসন। নিজ দেশের এবং টি এস এলিয়ট পুরস্কারসহ বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক পুরস্কার পেয়েছেন কারসন।
আরো আছেন আধুনিক রাশিয়ার মানবতাবাদী কথাসাহিত্যিক লুদমিলা উলিৎসকায়া। অন্য বছরের তুলনায় তাঁর নাম বেশি গুরুত্বের সঙ্গে উচ্চারিত হচ্ছে এবার। আছেন রুমানিয়ার কথাসাহিত্যিক, কবি, প্রবন্ধকার ও সাহিত্য সমালোচক মারশিয়া কার্টারেস্কুও। আর্জেন্টিনার কথাসাহিত্যিক ও অনুবাদক সিজার আয়রা একজন বহুলপ্রজ লেখক। অনুবাদক হিসেবে তিনি সমান পরিচিত ও জনপ্রিয়।
পাঠকের ভালোবাসায় সিক্ত যুক্তরাষ্ট্রের জয়েস ক্যারল ওটস, ডন ডেলিলো, এন টাইলার, রিচার্ড ফোর্ড, ডেভ এগারস, মেরিলিন রবিনসন প্রমুখ। আমেরিকার কথা কিংবা শুধু ইংরেজির কথা উঠলেও ডন ডেলিলোর নাম আসতেই পারে। সমসাময়িক মানুষের জটিল জীবনের বয়ান খুব নিচু স্বরে তুলে ধরেন তিনি।
কথাসাহিত্যিক জয়েস ক্যারল ওটস বহুলপ্রজ হলেও তাঁর লেখার মধ্যে প্রাণের উপস্থিতি বেশ জোরালো। আমেরিকার সমসাময়িক ভুবনের প্রাণবন্ত উপস্থাপনা তাঁর লেখার প্রধান বিষয়। অ্যান্টিগুয়ান-আমেরিকান ঔপন্যাসিক, প্রবন্ধকার জ্যামেইকা কিনকেইডও নোবেল পুরস্কারের জন্য বিবেচ্য হতে পারেন। আফ্রিকান ও আফ্রিকান-আমেরিকান স্টাডিজের হার্ভার্ড প্রফেসর কিনকেইড লিখে থাকেন উপনিবেশবাদ, ব্রিটিশ ও আমেরিকার সাম্রাজ্যবাদ, বর্ণবাদ, ঔপনিবেশিক শিক্ষা, লিঙ্গবাদ, শ্রেণি, ক্ষমতা—এসব বিষয়ে। যুক্তরাষ্ট্রের কথাসাহিত্যিক স্টিফেন কিংকে বলা হয় ‘কিং অব হরর’। কল্পবিজ্ঞান, অপরাধবিষয়ক ও লোমহর্ষক কাহিনি লেখার কারণেই তাঁর এমন নাম। তাঁর বই এরই মধ্যে ৩৫০ মিলিয়ন কপির বেশি বিক্রি হয়েছে।
আইরিশ কথাসাহিত্যিক জন বানভিল, সেবাস্টিয়ান ব্যারি ও ‘ব্রুকলিন’ খ্যাত কলাম টোইবিন গুরুত্বপূর্ণ এবারের নোবেল পুরস্কারের জন্য। সমালোচকরা বানভিলকে প্রুস্তের সঙ্গে তুলনা করেন। তবে তিনি নিজে মনে করেন, ইয়েটস ও হেনরি জেমস তাঁর ওপর বেশি প্রভাব ফেলেছেন।
বৈচিত্র্যে ভরা রুশ লেখক মিখাইল শিসকিনের জীবন। পরিচয়ের দিক থেকে তিনি রুশ-সুইস। মাতৃভাষা ছাড়াও তিনি জার্মান ভাষায় লেখেন। পাঠকের কাছে তাঁর পরিচিতিও ব্যাপক। আরেকজন রুশ লেখক দিমিত্রি বাইকফ। তাঁকেও সম্ভাবনার তালিকায় রাখা যেতে পারে। সাহিত্যের অন্যান্য শাখায় লেখালেখি ছাড়াও তিনি জীবনী লিখেছেন পাস্তারনাক, ম্যাক্সিম গোর্কি প্রমুখের। রুশ ঔপন্যাসিক, ছোটগল্পকার ও নাট্যকার লুদমিলা পেট্রুশেভসকায়ার নামটাও আসে সম্ভাবনাময় লেখক হিসেবে। শৈলীর দিক থেকে তাঁকে চেখভের সঙ্গে এবং নবাগতদের ওপর প্রভাব ফেলার দিক থেকে সোলঝেনিৎসিনের সঙ্গে তুলনা করা হয়।
অনেক দিন ধরেই আলোচনায় আছেন সিরিয়ার কবি আলী সাইদ অ্যাডোনিস। এ সময়ের আরব সাহিত্যের প্রধান কবিদের অন্যতম তিনি। তাঁর কবিতার মধ্যে রাজনীতির যথেষ্ট স্পষ্ট প্রতিফলন দেখা যায়। নোবেল পুরস্কার ঘোষণার সময় এলে প্রতিবছরই তাঁর নাম আলোচনায় আসে।
আন্তর্জাতিক পাঠকের বেশ প্রিয় কথাসাহিত্যিক ইসাবেল আইয়েন্দে। তিনি বিশ্বপাঠকের কাছে স্প্যানিসভাষী সর্বাধিক পঠিত লেখকদের অন্যতম বলে বিবেচিত। লেখায় জাদুবাস্তবতার ব্যবহার এবং গল্প বলার অসাধারণ ক্ষমতা তাঁর। পাঠকদের পছন্দের সঙ্গে নোবেল কমিটির পছন্দের মিল হয়ে গেলে আইয়েন্দে এবার নোবেল পুরস্কার পেয়ে যাবেন।
ভাষার দিক বিবেচনায় ইংরেজির বাইরে দক্ষিণ কোরিয়ার কবি কো উনের সম্ভাবনা একেবারে কমে গেছে তা নয়। বরং কথাসাহিত্যের নোবেল পুরস্কারের বিশাল কাতারের মাঝে কবিতার রং আরো একবার লাগতে পারে।
বয়স কম হলেও নাইজেরিয়ার চিমামন্দা নগোজি আদিচি পাঠকদের কাছে এরই মধ্যে লেখার মানের জন্যই জনপ্রিয়তা অর্জন করেছেন। তাঁর লেখার ওজন কোনো দিক থেকেই কম নয়। আচেবের যোগ্য উত্তরসূরি তিনি। অগ্রজের অপ্রাপ্তি হয়তো তাঁর মাধ্যমেই পূরণ হতে পারে এ বছর।
নোবেল পুরস্কারের প্রাপক হিসেবে সোমালিয়ার ঔপন্যাসিক নুরুদ্দিন ফারাহ, চীনের কবি বেই দাও, স্পেনের ঔপন্যাসিক হুয়ান মারসে, ইরানের কথাসাহিত্যিক মোহাম্মদ দৌলতাবাদি, বেলজিয়ামের কবি লিওনার্দ নোলেনস প্রমুখের যে কারো নাম উচ্চারিত হতেই পারে। পূর্ব আফ্রিকার অগ্রগণ্য লেখকদের অন্যতম নুরুদ্দিন ফারাহ উপন্যাস, ছোটগল্প, প্রবন্ধ ও নাটক লেখেন।
ইসরায়েলের অন্যতম জনপ্রিয় কবি অগি মিশোলও আন্তর্জাতিক পাঠকের কাছে বেশ পরিচিত। নোবেল কমিটি তাঁকে বেছে নিলেও অবাক হওয়ার মতো কিছু হবে না। তাঁর কবিতা একাধিক ভাষায় অনুবাদ করা হয়েছে। ২০১৭ সালে ম্যান বুকার ইন্টারন্যাশনাল পান ইসরায়েলি লেখক ডেভিড গ্রসমান। এবার তাঁর পুরস্কার পাওয়ার বিষয়টি বেশ জোরালো। জন্মস্থান, সেখানকার রাজনীতি ও ইতিহাস তাঁর লেখক মানস তৈরিতে বিশেষ ভূমিকা রেখেছে।
অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসী লেখক অ্যালেক্সিস রাইটও নোবেল পুরস্কার পেয়ে যেতে পারেন। গত ২০ বছরে পরিবেশ ও মানুষের শিকড়ের কথা তিনি অনেক লিখেছেন। কথাসাহিত্য ছাড়াও তাঁর প্রবন্ধের বইগুলোতেও অ্যালেক্সিসের শক্তি প্রকাশ পেয়েছে। এ বছর ইউক্রেনের কিংবা রাশিয়ার ভিন্নমতাবলম্বী কোনো লেখকও পেতে পারেন নোবেল। সেরহি ভিক্টরোভিচ ঝাদান ইউক্রেনের কবি, ঔপন্যাসিক, অনুবাদক, প্রবন্ধকার, সংগীতজ্ঞ ও সমাজকর্মী। সম্ভাব্য আরেকজন ইউক্রেনীয় লেখক হলেন ইউরি অঁভদ্রেখোভিচ। তিনি কবিতা, অনুবাদ ও কথাসাহিত্যের জন্য পাঠকমহলে পরিচিত। ইউক্রেনের কবি, গদ্য লেখক ও প্রকাশক লিনা ভাসিলিভনা কোস্তেনকো সাবেক সোভিয়েত ভিন্নমতাবলম্বী হিসেবে পরিচিত। ইউক্রেনের গীতিকবিতার ধারা ফিরিয়ে আনার কৃতিত্ব দেওয়া হয় তাঁকে। আরেকজন ইউক্রেনীয় লেখক ও বুদ্ধিজীবী আঁদ্রে কুরকভও নোবেল পুরস্কার পাওয়ার মতো পরিচিত।
এই আলোচনার মধ্যে কিংবা বাইরে আমাদের পরিচিত কেউ নোবেল পুরস্কার পেলে ভালো লাগবে। একদম অপরিচিত কেউ পেলে তখন বিবেচ্য বিষয় হবে, তিনি পাঠক বিচারে কতখানি গ্রহণযোগ্য। অবশ্য আমাদের ভালো লাগা মন্দ লাগা নিয়ে নোবেল কমিটির কিছু যায় আসে না। শেষ পর্যন্ত আমরা অপেক্ষায় রইলাম নোবেল কমিটির খেয়ালের প্রতিফলন দেখার জন্য।