বাড়ির কিছুটা দূরে ফিশারিতে নজরদারি করে বাড়ি ফিরছিল চল্লিশোর্ধ আমান। কিন্তু সালেকদের বাড়ির পাশে এসে থমকে দাঁড়াল সে। কী মধুর কণ্ঠে মিলাদ শরিফ পড়া হচ্ছে। এর আগেও তার বহুবার এমন হয়েছে যে, মিলাদ শরিফ পড়লে তার সমস্ত অন্তরজুড়ে প্রশান্তির ছোঁয়ায় মনটা হালকা হয়ে যায়।
খাওয়া-দাওয়ার পর্ব শেষে হুজুরের সাথে বাড়ি ফেরার পথে হুজুর মুচকি হেসে টেনে তার পরিশ্রমী কাঁধে হাত রেখে বললেন, আমান, জেল থাইকা কোনদিন ছাড়া পাইলা কও দেকিন! জেল থেকে শিখলা তো কিছু? এবার নামাজ-রোজা ঠিকমত কইরো..আমতা আমতা করে সে জবাব দিল, এইতো হুজুর, মাস দুয়েক হইলো, বউ বাচ্চার কোলে ফিইরা আইছি আল্লাহর মেহেরবানী আর আপনাদের অশেষ দোয়ায়। আগামী শুক্রবার আপনার দাওয়াত থাকল, ছেলে হইছে, নাম রাখার পর্বটা শেষ করতে হইব।আলহামদুলিল্লাহ্! আসব, আসব! হুজুর হেসে সায় দিলেন। তার কথাবার্তায় ভালো পরিবর্তন লক্ষ্য করছিলেন তিনি।জোছনামাখা বর্ষারাত। শাপলা-ভরা বিল, ঝোপঝাড়ে জোনাকির রাত্রিবিলাসে, চাঁদের আলোয় বকুলপুর গ্রামটা যেন উৎসবের সাজে সজ্জিত। মৃদু বাতাস সমস্ত পরিবেশকে যেন চাপমুক্ত করে তুলছে।
হুজুরের কথায় আমানের মনে হঠাৎ ভেসে উঠল সেদিনের ঘটনা সাদেকের গায়ে হাত তোলার অদমনীয় মুহূর্তটা।
সাদেক বলে, ভাই, আমি সিস্টেমের বাইরে যাব কিভাবে? ধৈর্য ধরেন তো একটু।
আমানের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে ফেলে এই সাদেক! তর্কের জের ধরে একপর্যায়ে তাদের মধ্যে হাতাহাতি হয়। সাদেকের মাথায় আঘাত করে রক্তাক্ত করে বসে আমান।
আমান রগচটা মানুষ ছিল, সেদিন মাথা ঠিক না থাকায় এই কা-টি ঘটিয়ে নিজেই সংশোধন হয়ে আসে জেলের ভাত খেয়ে। কিন্তু ইউনিয়নের সেই জনবিড়ম্বনার চিত্র একই রয়ে গেল।
আকিজ বিড়ি টানতে টানতে দক্ষিণ পাড়ার ব্রিজ থেকে নামার সময় হোঁচট খায় সে; বিড়বিড়িয়ে বলে রাস্তারও দেখি মরণ দশা: ওয়ার্ড মেম্বাররা নাকে তেল দিয়ে ঘুমায় শালারা। হাঁটতে শুরু করল বাড়ির দিকে। বিড়ির আগুন আর জোছনার আলোয় অদ্ভুত সংঘর্ষ খেল ঘটে গেল কিন্তু সেটা তার চোখে পড়ল না।
পশ্চিম পাড়া থেকে মিলাদের সুমধুর সুর ভেসে এল কানে। বাড়িতে নবজাতক শিশু কোলে নিয়ে বসে আছে তার স্ত্রী, বেশি রাত বাইরে থাকা উচিত নয় স্ত্রী বলে দিয়েছিল। মিলাদে যোগ দিবে কিনা, দ্বিধায় দাঁড়াল সে ছলিমা বুড়ির দোকানের পাশে!
ঠিক তখনই শ্রাবণের অপ্রস্তুত মেঘ এসে জোছনা নিভিয়ে দিল। মেঘজাল-অন্ধকারে শুধু বিড়ির ফুঁকো আগুন দেখা গেল, আমানকে আর দেখা গেল না!