“ডেঙ্গু এখন শুধু একটি মৌসুমি রোগ নয়, বরং জনস্বাস্থ্য সংকটের নাম।” – জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের এমন মন্তব্য বারবারই শোনা যাচ্ছে।
বাংলাদেশে বর্ষা মৌসুম এলে সাধারণ মানুষের মনে যে আতঙ্ক ভর করে, তার নাম ডেঙ্গু আর চিকুনগুনিয়া। এডিস মশা-বাহিত এই দুটি ভাইরাসজনিত রোগ কেবল মানুষের স্বাস্থ্যে আঘাত হানছে না, বরং স্বাস্থ্যখাতে বিপুল চাপ ও অর্থনৈতিক ক্ষতি ডেকে আনছে।
রোগের ইতিহাস- একটু পিছন ফিরে দেখা যাক।
চিকুনগুনিয়া: আফ্রিকাজাত এই রোগ বাংলাদেশে প্রথম ২০০৮ সালে স্পোরাডিক আকারে আসে অর্থাৎ অল্প অল্প কোথাও কোথাও ছিল। ২০১৭ সালে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় ব্যাপক প্রাদুর্ভাব ঘটে।
রোগের প্রকৃতি ও উপসর্গ-
ডেঙ্গু:
হাই ফিভার (১০৪ক্ক পর্যন্ত)। চোখের পেছনে ব্যথা। জয়েন্ট ও হাড়ে ভয়াবহ ব্যথা (“ব্রেকবোন ফিভার”) ।গুরুতর ক্ষেত্রে রক্তক্ষরণ, শক সিনড্রোম, মৃত্যু।
চিকুনগুনিয়া:
হঠাৎ জ্বর। তীব্র জয়েন্ট পেইন (কারও কারও মাসের পর মাস স্থায়ী)। র্যাশ, চোখ লাল হওয়া। দীর্ঘস্থায়ী দুর্বলতা ও কর্মক্ষমতা হ্রাস।
বর্তমানে বাংলাদেশের চিত্র:
২০২৩ সালে ডেঙ্গুতে ১,৬০০ জনের বেশি মানুষ মারা যায় (বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ)।
একই বছরে আক্রান্ত হন ৩ লক্ষাধিক মানুষ।
চিকুনগুনিয়ার প্রাদুর্ভাব তুলনামূলক কম হলেও, আক্রান্ত রোগীদের ৪০-৬০% মাসের পর মাস জয়েন্ট পেইনে ভোগেন।
২০২৫ সালেও আক্রান্তের সংখ্যা খুব বাড়ছে, বিশেষ করে ঢাকায় হাসপাতালের বেড সংকট তীব্র হয়েছে।
কেন বাংলাদেশে প্রাদুর্ভাব এত বেশি?
১. অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও খারাপ ড্রেনেজ ব্যবস্থা
২. আবর্জনার স্তূপ, জমে থাকা পরিষ্কার পানি
৩. নিয়মিত ফগিং ও কীটনাশকের অকার্যকারিতা
৪. জনসচেতনতার ঘাটতি
৫. জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে দীর্ঘ বর্ষা মৌসুম ও উষ্ণ আবহাওয়া
জনস্বাস্থ্য ও অর্থনীতিতে আঘাত-মৃত্যু ও অক্ষমতা: ডেঙ্গু মৃত্যুর কারণ, আর চিকুনগুনিয়া ব্যাপকভাবে কর্মক্ষমতা হ্রাস করছে।
হাসপাতাল চাপ: প্রতিদিন হাজারো রোগী ভর্তি হচ্ছে, বেড ও রক্ত সংকট দেখা দিচ্ছে।
অর্থনৈতিক ক্ষতি: কর্মক্ষম মানুষ কর্মহীন হওয়ায় উৎপাদনশীলতা হ্রাস, পরিবার ঋণে জর্জরিত হয়ে পড়ছে।
শিক্ষা ব্যাহত: স্কুলে উপস্থিতি ইতোমধ্যে কমে গিয়েছে, বিশেষত শহরাঞ্চলে।
সরকারের উদ্যোগ:
সিটি করপোরেশনের ফগিং ও মশক নিধন অভিযান
হাসপাতালগুলোতে বিশেষ ওয়ার্ড খোলা
স্কুল-কলেজে পরিচ্ছন্নতা নির্দেশনা
টিভি-রেডিও ও পত্রিকাতে সচেতনতামূলক বিজ্ঞাপন
তবে প্রশ্ন থেকে যায়-এই উদ্যোগগুলো কতটা কার্যকর?
একজন নগরবিদ বলেন, “ফগিং করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। শহরের পানি জমে থাকা ও আবর্জনা না সরালে এডিস মশা কখনোই কমবে না।”
করণীয় ঠিক করতে হবে দ্রুত:
ব্যক্তিগত স্তরে:
টব, টায়ার, বোতল, কুলার ইত্যাদিতে পানি জমতে না দেওয়া
মশারি ব্যবহার
দিনের বেলায় ফুলহাতা জামা
সমষ্টিগত স্তরে:
পাড়া-মহল্লায় পরিচ্ছন্নতা অভিযান
স্কুল-কলেজে শিক্ষার্থীদের সচেতনতা বৃদ্ধি
স্বেচ্ছাসেবী টিমের মাধ্যমে ড্রেন পরিষ্কার
সরকারি স্তরে:
কার্যকর ও বৈজ্ঞানিক কীটনাশক ব্যবহার
টেকসই নগর পরিকল্পনা
হাসপাতাল পর্যাপ্ত বেড ও টেস্ট কিট নিশ্চিত করা
ল্যাব পরীক্ষা সহজ ও সাস্রয়ী করা।
গবেষণা ও ভবিষ্যতের করণীয়:
ডেঙ্গু ভ্যাকসিন ডেংভেক্সিয়া: বিশ্বের কিছু দেশে ব্যবহৃত হলেও বাংলাদেশে এখনও অনুমোদন নেই।
চিকুনগুনিয়া: এখনও নির্দিষ্ট ভ্যাকসিন নেই, তবে গবেষণা চলছে।
দীর্ঘমেয়াদে: জলবায়ু পরিবর্তন, নগর পরিকল্পনা ও পরিবেশ ব্যবস্থাপনাকে গুরুত্ব দিতে হবে।
সবশেষে বলা যায়, বাংলাদেশ আজ সত্যিই চিকুনগুনিয়া ও ডেঙ্গুর কবলে পর্যুদস্ত। প্রতিদিন মানুষের মৃত্যু, অকার্যকর ফগিং, হাসপাতালের চাপ-সব মিলে পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিয়েছে।
তবে এই সংকট মোকাবিলা অসম্ভব নয়। ব্যক্তিগত সচেতনতা, সামাজিক উদ্যোগ, সরকারি পরিকল্পনা ও বৈজ্ঞানিক গবেষণা-এই চার স্তম্ভই পারে বাংলাদেশকে ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার অভিশাপ থেকে মুক্ত করতে।
“ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া প্রতিরোধের মূলমন্ত্র হলো-
‘পানি জমতে দেব না, মশা জন্মাতে দেব না।’”