বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এমন কিছু কবি আছেন যাঁদের রচনাশৈলী, ভাবপ্রকাশ ও ব্যক্তিত্ব এক বিশেষ ধারা সৃষ্টি করেছে। তাঁদের মধ্যে অন্যতম কবি গোলাম মোস্তফা। তিনি ছিলেন মুসলিম জাগরণের কবি, জাতীয়তাবাদী ভাবধারার এক অনন্য প্রতিনিধি এবং একইসঙ্গে ধর্মচেতনা ও দেশপ্রেমের মিলনক্ষেত্র। তাঁর কাব্যকর্ম, প্রবন্ধ, অনুবাদ এবং সামাজিক অবদান বাংলা সাহিত্যের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। নিচে তাঁর জীবন, সাহিত্যকীর্তি ও প্রভাব নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।
কবি গোলাম মোস্তফার জন্ম ১৮৯৭ খ্রিস্টাব্দের ৭ জানুয়ারি, ঝিনাইদহ জেলার কোটচাঁদপুর উপজেলার এশিয়াবাড়িয়া গ্রামে। তাঁর পিতার নাম ছিল সেকেন্দার আলী এবং মাতার নাম জাহেদা খাতুন। তিনি ছিলেন একটি মধ্যবিত্ত কৃষক পরিবারের সন্তান। শৈশবে গ্রামীণ পরিবেশে বড় হলেও পরিবারে ধর্মীয় ও শিক্ষার প্রতি আগ্রহ তাঁকে প্রভাবিত করেছিল। ছোটবেলা থেকেই তিনি অধ্যবসায়ী ও মেধাবী ছিলেন।
প্রাথমিক শিক্ষা শেষে তিনি কলকাতার আলিয়ায় ভর্তি হন। পরবর্তীতে কলকাতা ইসলামিয়া কলেজে (বর্তমান মৌলানা আজাদ কলেজ) উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন। অল্প বয়স থেকেই তিনি বাংলা ও আরবি সাহিত্য, ধর্মীয় গ্রন্থ এবং বিশ্বসাহিত্য পাঠে আগ্রহী ছিলেন। শিক্ষাজীবনেই তাঁর সাহিত্যচর্চা শুরু হয় এবং তিনি মুসলিম সমাজের সাংস্কৃতিক ও সাহিত্যিক জাগরণের প্রয়াসে যোগ দেন।
গোলাম মোস্তফা ছাত্রজীবন থেকেই কবিতা লেখা শুরু করেন। মুসলিম জনজাগরণ, ইসলামী চেতনা, দেশপ্রেম ও সামাজিক বার্তা তাঁর কাব্যে বিশেষভাবে প্রতিফলিত হয়। প্রথমদিকে তিনি পত্রপত্রিকায় কবিতা লিখতেন। ধীরে ধীরে তাঁর লেখা পাঠকসমাজে সাড়া ফেলতে থাকে এবং তিনি একজন স্বতন্ত্র কবি হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন।
কবি গোলাম মোস্তফার সাহিত্যকর্ম বহুমাত্রিক। তিনি কবিতা, প্রবন্ধ, অনুবাদ, ইসলামী সাহিত্য ও জাতীয়তাবাদী ভাবধারায় সমৃদ্ধ রচনা করেছেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থসমূহ হলো—
কাব্যগ্রন্থ
বেলা অবেলা কালবেলা
আজান
ইসলামী জীবনী কাব্য
মুসলিম সাঁকো
শিশুর কাছে
প্রবন্ধ ও গদ্যগ্রন্থ
বাংলার মুসলমানের শিক্ষা সমস্যা
বাংলার মুসলমানের সমাজ সমস্যা
ইসলামী সাহিত্যচর্চা
অনুবাদ সাহিত্য
তিনি অনুবাদের মাধ্যমে ইসলামী জ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। উল্লেখযোগ্য অনুবাদ—
কোরআন শরীফের বাংলা অনুবাদ
রাসূলের জীবন
অন্যান্য আরবি-ফার্সি সাহিত্য অনুবাদ।
১. ইসলামী চেতনা – তাঁর কাব্যে ইসলামী জীবনাদর্শ, আধ্যাত্মিকতা ও ধর্মীয় মূল্যবোধ প্রবলভাবে প্রকাশ পেয়েছে।
২. জাতীয়তাবাদ – তিনি মুসলিম জাতীয়তাবাদের অন্যতম কণ্ঠস্বর ছিলেন। তাঁর কবিতায় মুসলিম সমাজের দুঃখ-কষ্ট, অধিকারবোধ ও আত্মমর্যাদার আহ্বান ব্যক্ত হয়েছে।
৩. দেশপ্রেম – তিনি ছিলেন দেশপ্রেমিক কবি। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের সময় তাঁর কবিতা মানুষের মাঝে দেশপ্রেম জাগিয়ে তুলেছিল।
৪. মানবতাবাদ – ধর্মীয় ও জাতীয় চেতনার পাশাপাশি তিনি মানবতার কল্যাণে কবিতা লিখেছেন।
৫. সহজ-সরল ভাষাশৈলী – তাঁর কবিতার ভাষা সাধারণ পাঠকের বোধগম্য। গভীর ভাবকে তিনি সহজ শব্দে প্রকাশ করেছেন।
কবি গোলাম মোস্তফা শুধু সাহিত্যিক নন, তিনি ছিলেন একজন সমাজসংস্কারকও। মুসলিম সমাজের শিক্ষার প্রসারে তিনি কাজ করেছেন। মুসলিম নারীশিক্ষা, আধুনিক শিক্ষা ও আত্মমর্যাদা বৃদ্ধির পক্ষে তিনি কলম ধরেছিলেন। তাঁর লেখনী মুসলিম সমাজকে চিন্তা-চেতনায় সমৃদ্ধ করেছিল।
বাংলা সাহিত্যে তাঁর অন্যতম কীর্তি হলো বাংলা ভাষায় কোরআন শরীফের অনুবাদ। তাঁর অনুবাদ সাধারণ মানুষের কাছে সহজবোধ্য হয়েছিল। এর মাধ্যমে বাংলা ভাষাভাষী মুসলমানরা কোরআনের মূল ভাব বুঝতে সক্ষম হন।
তাঁর সাহিত্যকীর্তি ও জাতীয় জীবনে অবদানের জন্য তিনি বহু সম্মাননা লাভ করেন।
পাকিস্তান সরকার তাঁকে “শায়েরে রাসূল” উপাধি প্রদান করে।
বাংলা সাহিত্য সমাজ তাঁকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে মুসলিম জাগরণের কবি হিসেবে অভিহিত করে।
কবি গোলাম মোস্তফা ছিলেন অত্যন্ত বিনয়ী, ধর্মপ্রাণ এবং নীতিবান ব্যক্তি। তিনি শিক্ষকতা পেশার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং জীবনের অনেকটা সময় সমাজসেবা, সাহিত্যচর্চা ও ধর্মীয় কাজে কাটিয়েছেন।
১৯৬৪ সালের ১৩ অক্টোবর তিনি ঢাকায় ইন্তেকাল করেন। মৃত্যুর পরও তাঁর রচনা ও স্মৃতি আজও বাঙালি মুসলমানের চেতনায় অমলিন।
কবি গোলাম মোস্তফা বাংলা সাহিত্যে মুসলিম জাগরণের অন্যতম পুরোধা। তিনি সাহিত্যকে ব্যবহার করেছেন সমাজ পরিবর্তন ও জাতীয় জাগরণের হাতিয়ার হিসেবে। তাঁর কাব্য মুসলিম সমাজকে নিজেদের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও ইতিহাস সম্পর্কে সচেতন করেছে। পাশাপাশি তিনি বাঙালি জাতীয়তাবাদী সাহিত্যেও বিশেষ স্থান দখল করে আছেন।
কবি গোলাম মোস্তফা ছিলেন একাধারে কবি, সমাজসংস্কারক, ধর্মচেতনার বার্তাবাহক এবং জাতীয়তাবাদী কণ্ঠস্বর। তাঁর কাব্য ও অনুবাদ সাহিত্য আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। তিনি আমাদের সাহিত্যভাণ্ডারকে যেমন সমৃদ্ধ করেছেন, তেমনি সমাজ ও জাতিকে দিয়েছেন দিকনির্দেশনা। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে তিনি সর্বদা মুসলিম জাগরণের কবি ও বাঙালির চেতনায় অনন্যসাধারণ কবি হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।