পরিচয়
শেরশাহ সুরি (Sher Shah Suri) ছিলেন ভারতীয় উপমহাদেশের একজন অসাধারণ শাসক। তাঁর আসল নাম ফরিদ খান। তিনি আফগান সূর গোত্রের মানুষ ছিলেন। জন্ম প্রায় ১৪৭২ খ্রিষ্টাব্দে বর্তমান ভারতের বিহার রাজ্যের সাসারাম অঞ্চলে। পরবর্তীতে যুদ্ধক্ষেত্রে সিংহের মতো বীরত্ব প্রদর্শন করার কারণে তাঁকে “শের খाँ” বলা হয়।
প্রথম জীবনের কষ্ট ও সংগ্রাম
ফরিদ খান তাঁর পিতার জমিদারির উত্তরাধিকারী হলেও পড়াশোনা ও সামরিক কৌশলে ছিলেন বেশি আগ্রহী।
প্রথমে বিহারের স্থানীয় শাসকদের অধীনে সৈন্যবাহিনীতে যোগ দেন।
বীরত্ব ও প্রখর মেধার কারণে ধীরে ধীরে সামরিক পদে উন্নতি লাভ করেন।
উত্থান
লোধি রাজবংশ পতনের পর ভারতের রাজনৈতিক অঙ্গনে বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। এই সুযোগে শের খাঁ নিজের ক্ষমতা বিস্তার করতে থাকেন।
তিনি বিহার ও বাংলার বিশাল অঞ্চল দখল করেন।
১৫৩৭ খ্রিষ্টাব্দে বাংলার সুলতান গিয়াসউদ্দিন মাহমুদের বিরুদ্ধে লড়াই করে সফল হন।
হুমায়ুনকে পরাজয়
মুঘল সম্রাট বাবরের মৃত্যুর পর তাঁর ছেলে হুমায়ুন দিল্লির সিংহাসনে বসেন।
শেরশাহ ও হুমায়ুনের মধ্যে কয়েকটি যুদ্ধ সংঘটিত হয়।
১৫৪০ খ্রিষ্টাব্দে কানৌজের যুদ্ধে শেরশাহ হুমায়ুনকে পরাজিত করে দিল্লির সিংহাসন দখল করেন।
এভাবেই তিনি “সুরি সাম্রাজ্য” প্রতিষ্ঠা করেন।
শাসনকাল (১৫৪০–১৫৪৫ খ্রিঃ)
যদিও তাঁর শাসনকাল মাত্র পাঁচ বছর স্থায়ী হয়েছিল, তবুও তিনি অত্যন্ত কার্যকর প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক সংস্কার করেন।
প্রশাসনিক সংস্কার
কেন্দ্র ও প্রাদেশিক পর্যায়ে সুশৃঙ্খল প্রশাসনিক ব্যবস্থা চালু করেন।
জমি জরিপ করে কৃষকদের কাছ থেকে ন্যায্য কর আদায় নিশ্চিত করেন।
দুর্নীতি দমন ও ন্যায়বিচারের জন্য কড়া আইন প্রণয়ন করেন।
অর্থনীতি ও বানিজ্য
তিনি একটি নির্দিষ্ট মুদ্রা ব্যবস্থা চালু করেন, যার মধ্যে রূপিয়া (Rupee) ছিল বিশেষ উল্লেখযোগ্য। এই মুদ্রা পরবর্তীকালে ভারতের মানক মুদ্রা হয়ে ওঠে।
সড়ক ও যোগাযোগ ব্যবস্থা
শেরশাহের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোড (সোনারগাঁও থেকে পেশোয়ার পর্যন্ত দীর্ঘ মহাসড়ক) নির্মাণ।
রাস্তায় কুতুবখানা, সারাই (সরাইখানা), কূপ ও বৃক্ষরোপণ করে যাত্রী ও বণিকদের সুবিধা দেন।
সামরিক ব্যবস্থা
শৃঙ্খলাপূর্ণ সৈন্যবাহিনী গঠন করেন।
সৈন্যদের বেতন নগদে প্রদান করতেন, যাতে দুর্নীতি কমে।
মৃত্যু
১৫৪৫ খ্রিষ্টাব্দে কালিঞ্জর দুর্গ অবরোধ করার সময় দুর্ঘটনায় গানপাউডারের বিস্ফোরণে তিনি গুরুতর আহত হন এবং পরবর্তীতে মৃত্যুবরণ করেন।
ঐতিহাসিক গুরুত্ব
শেরশাহকে “ভারতের নেপোলিয়ন” বলা হয় তাঁর অল্প সময়ে অসাধারণ শাসন ও সামরিক সাফল্যের কারণে।
তিনি ভারতের প্রশাসন, অর্থনীতি, যোগাযোগ ও সামরিক ব্যবস্থায় যে সংস্কার করেছিলেন, তার প্রভাব মুঘল ও পরবর্তী ব্রিটিশ শাসনামলেও বজায় ছিল।
সংক্ষেপে বলা যায়, শেরশাহ সুরি ছিলেন একজন দূরদর্শী, দক্ষ ও প্রাজ্ঞ শাসক, যিনি মাত্র পাঁচ বছরের মধ্যে ভারতীয় ইতিহাসে স্থায়ী দাগ রেখে গেছেন।