সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬, ০৩:১৬ অপরাহ্ন
নোটিশঃ
জনপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল প্রমিনিউজবিডি ডটকম এর পরিক্ষামূলক সম্প্রচার চলছে। সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। তার মানে এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা লেখার অংশবিশেষ কিংবা ছবি বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রচার বা প্রকাশ করা নিষিদ্ধ।

বদরুদ্দীন উমর বিষয়ক প্রত্যয় ও সংশয়

ঢাকা অফিস
  • আপডেট: শনিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৫
  • ২৫ বার পড়া হয়েছে

১৯৩১ সালের ২০ ডিসেম্বর পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমানে জন্মগ্রহণ করা বদরুদ্দীন উমর ২০২৫ সালের ৭ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশের ঢাকায় প্রয়াত হলেন। ৯৪ বছরের দীর্ঘ জীবন। দীর্ঘ জীবনের সুকৃতি যেমন থাকে, দুষ্কৃতিও কম থাকে না। উমরের জীবনে সুকৃতির অংশই বিপুল, ভুলভ্রান্তিও কম নয়।

অন্যদিকে রেহমান সোবহানের অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ সেটিকে আরো বস্তুনিষ্ঠ করে তুলেছে। পরবর্তীকালে ‘পূর্ববাঙলার ভাষা আন্দোলন ও তৎকালীন রাজনীতি’ (১ম খণ্ড ১৯৭০, ২য় খণ্ড ১৯৭৫, ৩য় খণ্ড ১৯৮৫) নিয়ে তিন খণ্ডের গবেষণামূলক কাজটি তাঁকে বাঙালি বৌদ্ধিক মহলে বিশেষভাবে মান্যগণ্য করে তোলে। এর ভেতরে তিনি লিখেছেন, ‘চিরস্থায়ী বন্দোবস্তে বাঙলাদেশের কৃষক’ (১৯৭২), ‘ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ও উনিশ শতকের বাঙালী সমাজ’ (১৯৭৪), ‘যুদ্ধোত্তর বাঙলাদেশ’ (১৯৭৫), ‘যুদ্ধপূর্ব বাঙলাদেশ’ (১৯৭৬), ‘বাঙলাদেশে মার্কসবাদ’ (১৯৮২), ‘বাঙলাদেশে বুর্জোয়া রাজনীতির চালচিত্র’ (১৯৮২), ‘ভারতীয় জাতীয় আন্দোলন’ (১৯৮৪)—এটা মূলত বক্তৃতা; এমন দারুণ সব বক্তৃতাও তিনি বেশ কিছু দিয়েছেন, তা নিয়ে ‘স্মারক বক্তৃতা সমগ্র’ (২০২০) নামে আলাদা বইও আছে।উমর মূলত বাংলায় এবং কিছু ইংরেজিতে বাংলাদেশের রাষ্ট্র, সমাজ, রাজনীতি নিয়েই নিরন্তর লিখে গেছেন।
দিনরাত চিন্তা করেছেন রাজনীতির ভাঙাগড়া নিয়ে। বইয়ের সংখ্যা নানা দিক থেকে ধরতে গেলে দেড় শর কাছাকাছি। বলা হয়, বাংলাদেশে বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে তিনিই সবচেয়ে বড় একজন প্রতিষ্ঠানবিরোধী মানুষ। জনপরিসরে এও চালু আছে যে লেখার ক্ষেত্রে তিনি সত্য বৈ মিথ্যা লেখেননি। কয়েকটি খটকাও আছে তাঁকে নিয়ে।

আমরা সবাই জানি, কোনো গোয়েন্দা উপন্যাসে কেউ আসলে মিথ্যা বা বেখাপ্পা কথা বললেই তাকে সন্দেহের চোখে দেখা শুরু হয়ে যায়। তখন দেখা হয়, তাহলে অপরাধ বা অপরাধীর সঙ্গে কোনো একটি সূত্রে ওই লোকের যোগ আছে। গ্রিক নাটকে যে চরিত্রের ট্র্যাজেডি ঘটে, তার এমন একটি দোষ থাকে, সেটিকে বলে হেমার্শিয়া (যেমন—রাজা ইডিপাসের হেমার্শিয়া ছিল ‘সবকিছু জানার অতি আগ্রহ’ বা ‘সবজান্তা না হলে জীবন বৃথা’; সবকিছু জানতে গিয়ে সে নিজেকে অন্ধ করে ফেলে—কী ভয়াবহ শিক্ষা!)সেটি অতি ছোট্ট দোষ হলেও ওই ছোট্ট দোষটি তার সমস্ত সামর্থ্যকে নস্যাৎ করে দেয়। উমরের তেমন কিছু হেমার্শিয়া আছে। অনেকেরই মতে, উমরের ক্ষেত্রে এর একটি হলো, শেখ মুজিবুর রহমানের মূল্যায়নে নেতিবাচকতা। যদিও তিনি তাঁর ‘আমাদের সময়কার জীবন’ (১৯৯৬) বইতে ‘শেখ মুজিবুর রহমান’ প্রবন্ধে যথারীতি মিঠে-কড়া সমালোচনার পর এই লিখে ইতি টেনেছেন, ‘সর্বশেষে এ কথা বলা দরকার যে শেখ মুজিবুর রহমান নিজের গুণাবলি ও কর্মদক্ষতার কারণে এ দেশের একজন অতি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ব্যক্তি হিসেবে ভূমিকা পালন করেছিলেন। ঐতিহাসিকভাবে এটা অস্বীকার করা ইতিহাস বিষয়ে মূর্খতার শামিল। কিন্তু সেই সঙ্গে এ কথাও বলা দরকার যে এ দেশের রাজনীতিক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকার মূল্যায়ন তাঁর মৌলিক শ্রেণি চরিত্র, তাঁর শ্রেণিগত আচরণ এবং সেই শ্রেণির সঙ্গে শ্রমজীবী জনগণের মৌলিক স্বার্থের বিরোধকে বাদ দিয়ে সম্ভব নয়।’

ফলে বুঝতে পারি, তিনি সত্যটি কিছুটা হলেও নিজের কাছে স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছেন। যদিও মার্ক্সবাদ যথাযথভাবে যে বিশ্ববীক্ষা, ইতিহাস অধ্যয়ন, উৎপাদনব্যবস্থার স্বরূপ উদ্ঘাটন, শ্রেণি ও রাষ্ট্রের চরিত্র বুঝতে সহায়তা করে, ব্যক্তির সময় ও পরিসরকে নিরন্তর প্রশ্নের মাধ্যমে গতিশীলতা দেয়—সেখানে উমর অদ্ভুত এক ডগমেটিক প্রবণতার শিকার। যেমনটা নীরদচন্দ্র চৌধুরী বলেছিলেন, ‘উপমহাদেশের এ-অঞ্চলে কোনো ইন্টেলিজেন্সিয়া নেই, আছে মূলত কিছু ডগমেটিক চিন্তাচর্চাকারী।’ মজার ব্যাপার, নীরদবাবু নিজেও স্বয়ং তাঁর এই কথারই একটি প্রকৃষ্ট দৃষ্টান্ত, যদিও রসবোধ এবং বিশ্লেষণে নীরদবাবুর তুলনা মেলা ভার।

মার্ক্সবাদ উমরের ক্ষেত্রে ডায়নামিক না হয়ে ডগমেটিক হয়ে গিয়েছিল। বলা বাহুল্য, এটা মার্ক্সবাদের দোষ নয়। ফলে তিনি সৃষ্টিশীল চিন্তাবিদ না হয়ে লেখকজীবনের প্রথম চার দশক কিছু কাজের ধারায়ই পরবর্তী ক্ষেত্রে প্রায় একই খাতে ও গতে নিজেকে নিয়ে গেছেন। নিজের ধাত থেকে বেরিয়ে আসতে পারেননি। যদিও ব্যক্তিগত সততা, সরকারি সুযোগ-সুবিধা প্রত্যাখ্যান, বিশেষ করে কোনো ধরনের পুরস্কার না নেওয়ার বিষয়টিকেও অনেকে বড় করে তুলতে চান। এঁরাও ওই ডগমেটিজমের/সংস্কারবদ্ধতার শিকার। উমর কেন পুরস্কার নেবেন? তিনি কোনো সৃষ্টিশীল মানুষ নন, কবি-সাহিত্যিকও নন। গবেষক হিসেবে বা প্রবন্ধ লেখক হিসেবে নিতে পারতেন। কিন্তু সব সময়ের গবেষকও নন। প্রবন্ধ লেখকও থাকেননি চিরদিন। পরিণত হয়েছিলেন কলাম লেখকে। সুভাষণে বলা যায়, তিনি ছিলেন এ দেশের একজন রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সাংস্কৃতিক পালাবদলের ভাষ্যকার। তাঁর পুরস্কার না নেওয়াটা কোনো মাত্র মহত্ত্বের মধ্যেই পড়ে না। এটা তাঁর কাণ্ডজ্ঞানের প্রকাশমাত্র। উমর সেই কাণ্ডজ্ঞানের পরিচয় দিয়েছেন বৈকি।

সারা জীবন উমর নিরবচ্ছিন্নভাবে লিখে গেছেন আর রাজনৈতিক নেতা হতে চেয়েছেন। রাজনৈতিক দল করা, দল ভাঙায় তাঁর ভূমিকা শেষাবধি গৌণ। কারণ বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসেও সেটি প্রবল নয়। তাঁর মুখ্য ভূমিকা তিনি একজন লেখক। এবং বাংলাদেশের ইতিহাস ও পালাবদল বুঝতে হলে যে কজন লেখকের লেখার সামনে আমাদের দাঁড়াতে/বসতে হবে, উমর তাঁদের একজন। এটুকু অর্জন নিশ্চয়ই ছোট কোনো বিষয় নয়! তদুপরি তিনি কোনো ক্ষেত্রেই যুগপ্রবর্তক কোনো ব্যক্তি নন, নতুন চিন্তার সংযোজনকারী প্রতিভাও নন। তিনি অত্যন্ত পরিশ্রমী লেখক এবং সৎ মানুষ; সৎ বলতে অর্থনৈতিকভাবে সৎ নিশ্চয়! কিন্তু বুদ্ধিবৃত্তিক সততা তিনি ব্যক্তিগত নানা স্বভাবজাত সীমাবদ্ধতার কারণে শেষাবধি ধরে রাখতে পারেননি বলেই অনেকে মনে করেন। সবকিছুর প্রগতিশীল ভূমিকা থাকতে হবে, রাজনীতির মানুষ মাত্রই প্রচুর লেখাপড়া করতে হবে, শ্রেণিচরিত্র, শ্রেণিস্বার্থ ছাড়া মানুষকে আরো বিচিত্র দিকে যে দেখা যায়, বোঝা যায়—সবচেয়ে বড় কথা, যুগ ও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাঁরই প্রায় সমবয়সী জুর্গেন হেবারমাসেরা যে ভূমিকা পালন করেছেন, মার্ক্সবাদী চিন্তাকে নতুনত্ব দিয়েছেন, সমাজতত্ত্বের ক্ষেত্রে সৃষ্টিশীল তত্ত্ব, দৃষ্টি এবং অনুশীলনে প্রভাব-জাগানিয়া ভূমিকা পালন করেছেন—সে তুলনায় উমরের ভূমিকা মিলিয়ে দেখলেই আমরা তাঁর কীর্তি ও কৃত্যগুলো বুঝতে পারব। ভাবা যাক না, হেবারমাস কোনো দিন কাউকে কোনো মুদ্রিত সাক্ষাৎকারে জুতাপেটা করার কথা বলতে পারেন? বলা সম্ভব? বুদ্ধিজীবীর বিশেষ আভিজাত্য থেকে চ্যুত হননি হেবারমাসরা। বুদ্ধিবৃত্তিক মানুষকে সফস্টিকেটেড ও অ্যারিস্টোক্র্যাট/অভিজাত হতেই হয়, আর সাধারণ মানুষকে ডেমোক্রেটিক/গণতান্ত্রিক—এইটুকু অর্জন আমরা জাতিগতভাবে লাভ করিনি। উমরদের এতে কোনো দায় নেই কি? কৃতিত্বটুকু পাবেন, দায়টুকুও না নিয়ে উপায় কি! ‘নিজেকে সদাসর্বদা সঠিক মনে করার মতো ভুল’ করার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবীদের চেয়ে আর কে বেশি এগিয়ে? তিনি সব দল-মত-পথের বিরোধিতা করেছেন, কিন্তু ‘নিজের বিরোধিতা’ করার হিম্মত তাঁর দেখা যায়নি। নিজের দাঁড়ানোর জামিকে বারবার পরীক্ষা করার প্রবণতাও তাঁর ছিল না।

বাংলা ভাষা আন্দোলন নিয়ে গবেষণা, গণমানুষের মুক্তির পথ ও প্রক্রিয়া নিয়ে ভাবা এবং বাংলাদেশের রাজনৈতিক নষ্টামিগুলো ও বিপুল সম্পদ লুটপাটকে তিনি খোলাসা করেছেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি যে ধারার রাজনীতিতে সম্পৃক্ত ছিলেন, তাঁর নিজের কথায় বোঝা যায় সেটি কতটা বিভ্রান্ত ছিল। না বললেও বোঝা যায়, জন-আকাঙ্ক্ষা নিয়ে তাঁদের পার্টিলাইন কী মারাত্মক বিভ্রান্তই না ছিল! এবং এই বিভ্রান্তি তিনি নিজে সারা জীবন কাটিয়ে উঠতে পারেননি। তিনি বারবার বলেছেন, বাম পন্থায় এবং কমিউনিস্ট রাজনীতির ক্ষেত্রে আবদুল হক, মোহাম্মদ তোয়াহা বড় ক্ষতি করছেন; অথচ সেই দায় তাঁর কাঁধেও এসে পড়ে। তিনিও স্বয়ং সংস্কারবদ্ধ মানুষের মতো জীবন পার করে গেলেন। রাসেল বলেছিলেন, ‘সঠিক চিন্তা ও ভুল চিন্তা বলে কিছু নেই। কাজ হচ্ছে চিন্তা করা।’ ‘ভাবো ভাবো ভাবো, ভাবা প্র্যাকটিস করো।’—ঋত্বিক ঘটকের এই কথা খুব সহজ কথা তো নয়। উমর মার্ক্স ও রাসেল—যুগপৎ চর্চা করলেও কোনোটাই তাঁকে ডগমেটিক থেকে ডায়নামিক করে তোলেনি—বললে কি খুব ভুল বলা হবে? ফলে এ দেশীয় বাম পন্থায় নানা পক্ষ-বিপক্ষের ফেরে পড়ে যে ক্ষতিটা বাংলাদেশের প্রগতিশীল মানসিকতাকে চরায় আটকে দিয়েছে, উমরদের মতো মানুষদের দায় না নিয়ে উপায় থাকে না।

‘সাম্প্রদায়িকতা’, ‘সংস্কৃতির সংকট’, ‘সাংস্কৃতিক সাম্প্রদায়িকতা’র মতো চক্ষুরুন্মীলন করা (আই ওপেনার) বইগুলোর মাধ্যমে যে ধারার তিনি সূচনা করেছিলেন; যে তিনটি বইয়েরই নভেলাইজেশনই (উপন্যাসীকরণ) হলো মূলত আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের ‘খোয়াবনামা’—সেই উমর বয়সের কারণেই হোক বা যে কারণেই হোক, লেখালেখিতে ধার হারিয়ে যত দিন গেছে ভার বাড়িয়েছেন। বিরোধিতার ধারাবাহিকতা রক্ষা করা ছাড়া কোনো ধারায় কোনো ধার আর নতুন করে দেখা দেয়নি।

তাজউদ্দীন আহমদের সঙ্গে গভীর যোগাযোগ অথচ নিত্য বঙ্গবন্ধুর বিরোধিতা করা উমরের মানে কী; রেহমান সোবহানের মতো মানুষও যেখানে বঙ্গবন্ধু মূল্যায়নে অকুণ্ঠভাবে ইতিবাচকতা দেখাতে পারেন, উমর সেখানে তাঁর মার্ক্সবাদী সংস্কারবদ্ধতা অতিক্রম করতে পারেন না, যে মার্ক্সবাদ স্বয়ং একটি দুর্দান্ত গতিশীল বিষয়। বোধ করি এর ভেতরে গভীর কারণ আমরা জানি, রসবোধ হারিয়ে ফেলা। বিশেষ করে সাহিত্য বিষয়েও তিনি আগ্রহ রাখতে পারেননি। ভাষাগত দিকেও বোঝা যায় তাঁর গদ্যের শক্তিমত্তা ততটা ছিল না, যেটা মার্কসের আজীবন গভীর সাহিত্যপ্রীতির ফলে মার্ক্সের জার্মান গদ্য, জার্মান গদ্যের ইতিহাসেও অনন্য। সেখানে উমরীয় গদ্যের ভূমিকা কেবল বিষয়ের বিশ্লেষণেই ফুরিয়ে গেছে। এর কারণও আছে : নিত্যনতুন চিন্তা করার চেয়ে পত্রপত্রিকার পেট ভরানোর লেখা ও কলাম লিখতে তিনি অক্লান্ত শ্রম দিয়ে গেছেন, আর সেই লেখাগুলো জড়ো করেই তৈরি হয়েছে একের পর এক বই। রচনাগুলোর বেশির ভাগেই সারবস্তু তেমন ছিল না। এই কাজটিও লেখক বদরুদ্দীন উমরের ক্ষতি করেছে। ‘সংস্কৃতি’র মতো মননতীব্র পত্রিকা দীর্ঘদিন ধরে সম্পাদনা করলেও দুঃখজনকভাবে নিজের সত্যিকারের আত্ম-আবিষ্কার ঘটানো যায়নি। অপরিচয়ের ভারে নিজেরও ক্ষতি তাঁর কম হয়নি। (সেই অপরিচয়টি কী? একটু পরেই বলা হচ্ছে।)

উমর বিপুল পরিমাণ লিখেছেন, এর ভেতরে বেশ কিছু বই, অন্তত কুড়ি/ত্রিশটা বই স্থায়ী মূল্য পাবে বলে আশা করা যায়। কলামের সংকলনের বদলে, তাঁর প্রথম দিককার বস্তুনিষ্ঠ ও বিষয়নিষ্ঠ ভালো বইগুলো আমাদের প্রাপ্তি হয়ে রইল। মোটামুটি আশির দশক অবধি তাঁর প্রকাশিত বইগুলোর তালিকায় মনন-আকর্ষণীয় বইয়ের সংখ্যা কম নয়। বলা যায়, একটির চেয়ে আরেকটি বই মনোযোগী পাঠকের আগ্রহ তৈরি না করে পারে না।

এবার তাঁর সম্পর্কে সেই ‘অপরিচয়ের’ কথাটি বলতে হয় : বদরুদ্দীন উমর দশ শতাংশ রাজনীতিবিদ হয়ে তিনি ছিলেন মূলত নব্বই শতাংশ রাজনীতিবিদ; আর নব্বই শতাংশ লেখক হয়ে তিনি ছিলেন মাত্র দশ শতাংশ লেখক। যদিও লেখার কাজটিই করেছেন (নিজেই বলেছিলেন, তাঁর ইচ্ছা ছিল একটা প্রোডাক্টিভ জীবন তিনি কাটিয়ে যাবেন, তিনি সে জীবনটাই কাটিয়ে গেছেন); কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, তাঁর বাংলা ভাষা তথা বাংলা গদ্যটি তেমন শক্তিশালী নয়, বক্তব্যের বাহন ছাড়া ভাষাগত দ্যুতি তাঁর ছিল না। আর লেখা বলতে যে নতুন চিন্তা, লেখার ভেতরে কথা থাকা, কথাগুলোকে লেখায় পরিণত করে তোলা, হোক তা বঙ্কিমের মতো বা রবীন্দ্রনাথের মতো বা জুর্গেন হেবারমাসের মতো, সেখানে তো ভয়াবহ শূন্যতাই দেখা যায়; নব্বইয়ের দশক থেকে, আরো স্পষ্ট করে বললে, ২০০০ সালের পরে সেখানে মূলত এক অতি ফলনশীল শূন্যতাই প্রকট থেকে প্রকটতর হয়ে ফলেছে।

ভালো লাগলে সংবাদটি শেয়ার করুন

এই বিভাগের আরো সংবাদ
© All rights reserved © 2026 PromiNewsBD.com
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com