সাত বছর আগের ঘটনা। চুয়াডাঙ্গা সদরের বেলগাছি গ্রামের স্কুল শিক্ষক ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষক বখতিয়ার হামিদের সঙ্গে বেলগাছির বকচর বিলে ঘুরছি। লম্বাটে সরু বিল। তবে জলচর পাখিদের বসবাস ও চারণের জন্য বেশ উপযোগী।তাই বিভিন্ন প্রজাতির বক, ডাহুক, জলমুরগি, মাছরাঙা, সরালি হাঁস ও অন্যান্য জলচর পাখির অভাব নেই।শরতের তালপাকা গরমে ঘামতে ঘামতে ক্যামেরা হাতে বিলের এদিক-সেদিক ঘুরে বেড়াচ্ছি, হঠাৎ ঝুমবৃষ্টি। ক্যামেরা দ্রুত ব্যাগে ঢুকিয়ে ফেললাম। বৃষ্টিতে বেশ আরাম পেলাম।তবে বিলের শোভা যে পাখিটির খোঁজে এসেছি, ছানাসহ সেটিকে দেখেও বৃষ্টির জন্য ভালো ছবি তুলতে পারলাম না।
পত্রঝরা বনের পেখম তোলা ময়ূর বা নীল ময়ূর (Common Peafowl) এ দেশের প্রকৃতি থেকে হারিয়ে গেছে। আর পাহাড়বাসী মিশ্র চিরসবুজ বনের সবুজ ময়ূরের (Green Peafowl) দেখা পাওয়া তো ভাগ্যের ব্যাপার। তবে দুই প্রজাতির সত্যিকারের ময়ূর দেশ থেকে হারিয়ে গেলেও লম্বা লেজের জলের শোভা জলময়ূর কিন্তু ভালোভাবেই বেঁচে আছে। প্রতিবছর বর্ষা-শরতে তাকে দেখা যায় দেশের যেকোনো অঞ্চলের বিলে। অবশ্য শীতে তাকে চেনাই যায় না। কারণ তখন ময়ূরের মতো লম্বা লেজটি খসে পড়ে।
এ সময়টা জলের ময়ূরের প্রজনন মৌসুম। আর তাই প্রতিবছর এ সময়টা ক্যামেরা হাতে শ্রীমঙ্গলের বাইক্কা বিল, হাইল হাওর, চুয়াডাঙ্গার বেলগাছি, রাজশাহীর মোহনপুর বা ঢাকার কেরানীগঞ্জে ওদের খোঁজে ঘুরে বেড়াই।
লম্বালেজি জলের এই ময়ূরগুলো আর কেউ নয়, এ দেশের সচরাচর দৃশ্যমান আবাসিক পাখি নেউ, নেউপিপি, পদ্মপিপি, মেওয়া বা জলময়ূর। ইংরেজি নাম Pheasant-tailed Jacana। জ্যাকনিডি জ্যাকনিডি (Jacanidae) গোত্রের পাখিটির বৈজ্ঞানিক নাম Hydophasianus chirurgus (হাইড্রোফ্যাসিয়ানাস চিরুরগাস)।
বাংলাদেশ ছাড়াও দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে পাখিটিকে দেখা যায়। প্রাপ্তবয়স্ক জলময়ূর লম্বায় ৩৯ থেকে ৫৮ সেন্টিমিটার, যার মধ্যে লেজই ১১ থেকে ১২ সেন্টিমিটার। কিন্তু প্রজননকালে লেজ ১৯ থেকে ৩৭ সেন্টিমিটার পর্যন্ত হতে পারে। প্রসারিত অবস্থায় ডানা ৬৩ থেকে ৬৯ সেন্টিমিটার হয়। পুরুষ পাখি বা জলময়ূরের ওজন ১১৩ থেকে ১৩৫ গ্রাম ও স্ত্রী পাখি বা জলময়ূরীর ওজন ২০৫ থেকে ২৬০ গ্রাম।
জলময়ূর-জলময়ূরীর পালকের রঙে পার্থক্য নেই। তবে প্রজননকালে জলময়ূরী অত্যন্ত সুন্দরী হয়ে ওঠে। তখন মাথা, গলা ও ডানার পালক-ঢাকনি হয় সাদা। ঘাড় সোনালি-হলুদ, পিঠ গাঢ় বাদামি, বুক-পেট কালচে-বাদামি ও লেজ হয় কালচে। একটি কালচে-খয়েরি রেখা মাথা ও ঘাড়-গলার সাদা এবং সোনালি-হলুদ রংকে পৃথক করেছে। চোখের রং বাদামি। চঞ্চু নীলচে ও পা নীলাভ-কালো। প্রজননহীন পাখির দেহের রং বেশ ফ্যাকাসে, দেহের নিচটা হয় সাদা ও বুক বাদামি।
জলময়ূর স্বাদু পানির জলাভূমি—যেমন হাওর, বিল, হ্রদ প্রভৃতিতে বাস করে। দেশের প্রায় সব বিভাগেই দেখা যায়। গ্রীষ্মে একাকী বা জোড়ায় এবং শীতে ঝাঁক বেঁধে চলে। ভাসমান পাতার ওপর হেঁটে হেঁটে জলজ উদ্ভিদে থাকা কীটপতঙ্গ ও অমেরুদণ্ডী প্রাণী খায়। সচরাচর ওড়ার সময় ‘নে-উ-ইউ-নে-উ-ইউ-নে-উ-ইউ–’ শব্দে ডাকে।
মে থেকে সেপ্টেম্বর প্রজননকাল। জলময়ূর শাপলা ও পদ্ম পাতা বা এ জাতীয় ভাসমান কোনো উদ্ভিদের পাতার ওপর বাসা বানায়। জলময়ূরী তাতে চারটি চকচকে জলপাই-বাদামি রঙের ডিম পেড়ে চলে যায়। জলময়ূর একাই ডিমে তা দেয়। ডিম ফুটে ছানা বেরোয় ২৩ থেকে ২৬ দিনে।
ছানারা ডিম থেকে ফোটার সঙ্গে সঙ্গে হাঁটতে, সাঁতার কাটতে ও ডুব দিতে পারে। ছানারা প্রায় দুই মাস বয়স পর্যন্ত বাবার সঙ্গে থাকে। জলময়ূরের আয়ুষ্কাল চার থেকে পাঁচ বছর। তবে ১০ বছরও বাঁচার রেকর্ড আছে।
লেখক : ড. আ ন ম আমিনুর রহমান, পাখি ও বন্যপ্রাণী প্রজনন ও চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ, গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়