মিলনের প্রথম উপন্যাস ‘যাবজ্জীবন’ আমি পড়েছি মাত্র বছর দশেক আগে। সেটি পড়ে আমার এই ধারণা পোক্ত হয়েছে যে, উপন্যাসের বয়ান যে কয়েকটি দৃষ্টিকোণ থেকে হয়, সেগুলোর মধ্যে সবচেয়ে জটিল যেটি, সেই প্রথম পুরুষ বর্ণনা, তা দিয়েই যেন তিনি জেনেশুনে শুরু করেছিলেন। গল্প লেখকদের জবানি থেকে জানি, নিজেও অনুভব করি, সবজান্তা বয়ানকারীর দৃষ্টিভঙ্গিটাই নিরাপদ। তিনি ঈশ্বরের মতোই সর্বজ্ঞ, ফলে তাঁর বিচরণ সর্বত্র। সেই তুলনায় প্রথম পুরুষ সীমাবদ্ধ। সেই সীমাতেই তাকে অসীম হতে হয়। তা ছাড়া একটা প্রশ্ন থেকেই যায়—প্রথম পুরুষ বর্ণনায় লেখক কি গল্পের ভেতরে নিজেকে ঢুকিয়ে দিতে পারেন? তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি কি চরিত্রের বর্ণনায়, কাজেকর্মে ফুটে ওঠে? প্রথম উপন্যাসেই মিলন বর্ণনার সোজা রাস্তা থেকে সরে এক আঁকাবাঁকা রাস্তায় ঢুকেছেন। উপন্যাসটি পড়তে গিয়ে একবারও মনে হয়নি, তিনি পথ হারিয়েছেন। তবে অভিজ্ঞতার কমতি তাঁকে ভুগিয়েছে। তাঁর চরিত্রগুলো রয়ে গেছে কিছুটা ছায়া হয়ে। যেন রং মেপে অ্যাক্রিলিকের পোঁচ দিতে গিয়ে কিছুটা অনুজ্জ্বল রং তাঁর হাতে উঠে এসেছে।
মিলনের যে বইটি আমার প্রথম পড়া, সেটি ‘পরাধীনতা’, যাতে মিলন নিজেই আছেন। তার আগে তাঁর নাম শুনেছি, কিন্তু তাঁর কোনো লেখাই পড়া হয়নি। তার কারণ ১৯৭৬ সাল থেকে নিয়ে পাঁচ বছর আমি নিজেই ছিলাম প্রবাসী। না, হাড়ভাঙা খাটুনি খাটা প্রবাসী শ্রমিক নয়, ছিলাম কলম-শ্রমিক। শ্রমে-ঘামে একটা ডিগ্রি পাওয়ার জন্য কাগজ-কলম নিয়ে ব্যস্ত। প্রবাসী শ্রমিকরা আমার থেকে অনেক উঁচুতে আছেন, কারণ তাঁদের পরিশ্রমে দেশের স্বস্তি বাড়ে। কিন্তু তাঁরাই সবচেয়ে বেশি বঞ্চনার শিকার। দেশে ফিরে মিলনের নাম এবং সুনাম শুনলাম। ‘পরাধীনতা’ বাজারে আসে সম্ভবত ১৯৮৫ সালে। আমাকে বইটা শুধু তাঁকে চেনাল না, তাঁর সঙ্গে পরিচয়ের পথটাও সুগম করে দিল। প্রবাসী শ্রমিকের কষ্টের জীবন সম্পর্কে এখন খবরের কাগজ আর দৃশ্যমাধ্যমে চোখ ফেললেই অনেক কিছু জানা যায়। কিন্তু মিলন যখন উপন্যাসটি লেখেন, তাঁদের দুর্দশার ছবিটি শুধু পরিবারের লোকজনই দেখতে পেতেন। বইটি পড়তে গিয়ে আমি নিজেও ভেবেছি, কতটুকু এই জীবনকে আমি দেখেছি, অথবা চিনেছি। এক কঠিন জীবন পার করা মানুষগুলোকে মিলন এঁকেছেন একটা একাত্মবোধ থেকে, ফলে ক্রোধ যতটা না তিনি অনুভব করেছেন, তার চেয়ে বেশি মমতা, নিজেকে যতটা না উন্মুক্ত করেছেন, তার চেয়ে বেশি প্রবাসজীবন নামের প্রপঞ্চকে। ঘটনাবিন্যাসে বৈচিত্র্যের খানিকটা অভাব, কিন্তু চরিত্রায়ণের শক্তি সেই অভাব মোচন করেছে।
মিলনের উপন্যাসগুলো নিয়ে এই কথাটি আমি দুবার বলতে চাই—যে কিছু উপাদান নিয়ে একটা উপন্যাস : কাহিনি, চরিত্র, স্থান-কাল-দ্বন্দ্ব-মিলন, সংলাপ-ভাষা, দৃষ্টিকোণ ইত্যাদি—তাঁর উপন্যাসে এদের একটা আরেকটার শক্তি জোগায়। এমনকি তাঁর প্রেমের কোনো কোনো উপন্যাস, যেগুলোকে সমালোচকরা তেমন আমল দিতে চান না, এক বর্ণনায় তো তাদের ‘মিষ্টি-মধুর’ আর ‘অম্ল-মধুর’ শ্রেণিতে সেগুলোকে ফেলা হয়েছে, চরিত্রায়ণের শক্তিতে অনেক চরিত্র প্রধান উপন্যাসকে ছাপিয়ে গেছে। কোনো চরিত্রই অখণ্ড কোনো পাথর নয়, তার পরিবর্তন আছে, তল আছে, গভীরতা-অসচ্ছলতা আছে, মনস্তত্ত্ব্বের একটা জটিল অঞ্চলও তার আছে। প্রেম এসবের ওপর সবুজ বা নীল রং ঢেলে দিতে পারে না। আমি মনে করি চরিত্র নির্মাণে; নানা মাত্রায়, পরতে পরতে, উচু-নিচু ভূমিতে, জল-জঙ্গলে ছড়িয়ে থাকা তাদের মনস্তত্ত্বের রসায়ন উন্মোচনে, চরিত্রদের আন্ত সম্পর্কের বিভিন্ন প্রকাশে এবং মোটাদাগে তাদের হয়ে ওঠা দেখানোয় মিলন তাঁর কুশলতার প্রধান প্রকাশ ঘটিয়েছেন।
মিলনের উপন্যাস পড়ে আমার আরেকটি বিষয় মনে দাগ কেটেছে—বিষয়ের প্রতি তাঁর বিশ্বস্ততা। ইতিহাস নিয়ে তিনি লিখেছেন ইতিহাসের নানা পাঠের ভুক্তভোগী এবং অনুসরণকারী হিসেবে, মুক্তিযুদ্ধকে দেখেছেন একজন মুক্তিপাগল বাঙালি হিসেবে, গ্রামকে দেখেছেন গ্রামের মানুষের চোখ দিয়ে, শহরকে শহরের চৌখোপে বন্দি নাগরিকের দৃষ্টিতে, প্রেমকে প্রেমিক, ব্যর্থ প্রেমিক, উদাসী প্রেমিক—এ রকম নানা প্রেমিকের দৃষ্টি দিয়ে, আর নারীকে দেখেছেন এক সংবেদী, প্রতিবাদী, সমব্যথী, মা ও মাতামহীর দীর্ঘ কিন্তু অন্তরঙ্গ দৃষ্টি দিয়ে। এই বিশ্বস্ততা সব সময় সততার কষ্টিপাথরে হয়তো যাচাই হয় না, কিন্তু বিশ্বস্ততায় কোনো ভঙ্গি অথবা আলস্য না থাকলে তা নিশ্চয় গ্রহণযোগ্য হয়।
মিলন যে জীবনগুলো এঁকেছেন কাঠকয়লা আর কালি দিয়ে, সেগুলো সাদা-কালো বটে, তাদের প্রকাশও প্রবল ও স্পষ্ট, কিন্তু তাদের জীবন এই কয়লা-কালির কালো রংয়ে ছাওয়া নয়। তারা প্রকৃতির মানুষ, তারা সমর্পিত সমাজ ও সময়ে, ফলে সমাজ ও সময়ের সঙ্গে তাদের দ্বন্দ্ব-সংঘাতে নানা রঙের প্রকাশ ঘটে। মিলন এ বিষয়টি আরো স্পষ্ট করেছেন তাঁর নাটকে—যাদের সংখ্যা, আবারও, সেই আকাশলগ্ন—দেড় শটির মতো। তাঁর কিছু নাটক আমি দেখেছি, যেগুলোতে সংলাপ একটা বড় শক্তি জোগায়। ভাষা মানুষকে প্রকাশ করে। তাঁর উপন্যাসে মিলন ভাষাকে নানাভাবে ব্যবহার করেছেন। কতভাবে? যদি জানতে চান, ‘নূরজাহান’ উপন্যাসটি পড়ে দেখতে পারেন।
মোটাদাগে ভাষার প্রশ্নে মিলন তিনটি অবস্থান গ্রহণ করেছেন। ভাষার প্রথম অবস্থানটি তাঁর নিজের, চরিত্রদের, বর্ণনার সাধারণ প্রচলিত ভাষার পরস্পর সংযোগ থেকে সৃষ্ট। মানুষের সমাজ, শ্রেণি, পেশা, ভৌগোলিক অবস্থান—এসব বিবেচনায় ভাষার নানা ব্যবহার নিশ্চিত হয়। তাঁর উপন্যাস পড়লে একটা সহজ পরিবেশনার যে আমেজ পাওয়া যায়, তা ভাষার ওই গতিশীলতা থেকে তৈরি। ভাষার দ্বিতীয় অবস্থান মনস্তত্ত্বে। মানুষ কি তার সব ভাব ও কথা ভাষায় প্রকাশ করতে পারে? বুকফাটা কান্নার বা নিকটজন থেকে বঞ্চনা বা সহিংসতার ভাষা কী হতে পারে? এইসব অনুভবের প্রকাশে, অথবা মনের কূল ছাপিয়ে ওঠা অনুভূতিকে ভাষাবন্দি করার ক্ষেত্রে সহজতা সব সময় প্রত্যাশিত নয়। দ্বন্দ্বের প্রকাশে জটিলতা থাকে, জটিলতা আধুনিক জীবনের একটা বৈশিষ্ট্য। মিলনের অনেক উপন্যাসে সহজ-জটিলের সহাবস্থান ভাষার স্থিতিস্থাপকতার একটা পরীক্ষা নেয়। সেই পরীক্ষায় মিলন সফল। ভাষার আরেক অবস্থান ভাষাহীনতায়—তবে ভাষাহীনতা মানে ভাষার অভাব নয়। নীরবতা ভাষাকে অস্বীকার করে না, যেহেতু নীরবতাও একটা ভাষা। নীরবতার মতো উহ্যমানতাও একটা ভাষা। কারো চোখের ভাষা সবাই পড়তে পারে না, কেউ একজন হয়তো সবচেয়ে সহজেই তা পড়ে। মিলনের একটা শক্তি এই আভাসিত, উহ্যমান, অনুচ্চারিত কিন্তু ইঙ্গিতে-অনুমানে বাঙ্ময় ভাষাকে তার বর্ণনার একটা নিশানা করাটা। তবে শুধু বর্ণনা নয়—বর্ণনা তো লেখকের কাজ—অনুমানেও। অনুমানটা পাঠকের।
গত শতকের সত্তরের দশক যেমন ছিল আমাদের মঞ্চনাটকের নতুন সৃষ্টির একটা যুগ, আশির দশক তেমনই ছিল টেলিভিশন নাটকের। এই ধারার নাটকে প্রাণ সঞ্চার করেছিলেন হুমায়ূন আহমেদ। একেই তো তাঁর হাতে ছিল উপন্যাস রচনায় এক বিরল আলকেমির চাবিকাঠি, টেলিভিশন নাটকে তাঁর জনপ্রিয়তা তাঁকে নিয়ে গেল জনপ্রিয়তার সাগরমাথা পর্বতশিখরে। যখন অনেকেই ভেবেছে হুমায়ূন যেখানে আছেন, তাঁর ধারেকাছে কেউ যেতে পারবে না, দু-একজন লেখক তাঁর কিছুটা পেছনে হাঁটতে শুরু করলেন। একসময় হুমায়ূন আহমেদের সঙ্গে মঈনুল আহসান সাবের আর ইমদাদুল হক মিলনের নাম উচ্চারিত হতে শুরু করল। পাঠক এই দুজনের বই কিনতে শুরু করল। শুধু বাংলাদেশে নয়, পশ্চিমবঙ্গেও দেখেছি মিলনের পাঠকসংখ্যা প্রচুর। কলকাতার এক বইমেলায় আমি গিয়েছি, বিমানের ভিন্ন উড়ালে মিলনও গিয়েছেন। মেলায়ই দেখা। আমার সঙ্গে তাঁর সম্পর্কটা হৃদ্যতায় মোড়া। আমরা মেলায় হাঁটলাম, চা খেলাম, তাঁর ছবিসহ বইয়ের বিজ্ঞাপন লাগানো বড় ব্যানার বিকেলের বাতাসে উড়তে দেখলাম। একসময় মিলন বিদায় নিয়ে একটা বইয়ের স্টলে গিয়ে বসলেন, একটা বেশ লাইন দাঁড়িয়ে গেছে ততক্ষণে, তাঁর বই হাতে তাঁর স্বাক্ষর জোগাড়ের আশায় থাকা ক্রেতাদের।
জনপ্রিয়তাকে আমাদের দেশে নেতির চোখেই দেখা হয়, যদিও এর জুতসই কোনো কারণ নেই। জনপ্রিয় লেখকের বই পাঠক পড়ে আনন্দ পায় বলেই তারা সেসব কেনে। হুমায়ূন আহমেদ উত্কৃষ্ট উপন্যাস লিখেছেন, মিলনও। সেই উত্কৃষ্ট উপন্যাসগুলোকে জনপ্রিয় বলে সরিয়ে রাখার কোনো কারণ নেই। এরা উত্কৃষ্ট নিজ গুণে, প্রকাশকদের ভোটে নয়। মিলনের দৃষ্টি শুধু প্রেম ও শরীরানুভূতিতে নিবিষ্ট নয়, শরীর নিয়ে যে বেচাকেনা হয়, রাজনীতি হয়, অকারণ ট্র্যাজেডি হয়, তাতেও। তাঁর কিছু চরিত্র যদি টাইপ চরিত্রের মতো হয়, অন্যগুলো হয় গভীর-দ্বন্দ্বমান, মৌলিকতায় দীপ্যমান। তাঁর গ্রাম আমাদের পরিচিত, যেহেতু আমাদের সবার ভেতর একটা গ্রাম আছে, না হয় এক-দুই প্রজন্ম আগে ফেলে আসা গ্রামের স্মৃতি আছে, কিন্তু এই পরিচিতের আড়ালে যে গ্রাম সাবটেক্সটের মতো জেগে থাকে, সেই গ্রাম যাতে বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অংশটা লেখা হয়ে গেছে, ছোট-বড় সব মাপের মানুষের থাকা হয়ে গেছে, যা একটা রঙ্গমঞ্চের মতো আদি কোনো ঘটনাকে অনেকবার অনেকভাবে মঞ্চায়ন করে যাচ্ছে, তাঁর লেখায় সেই গ্রামের উপস্থিতি প্রবল।
আমার মনে হয়, মিলন সামান্য-অসামান্যের সহাবস্থান ও দ্বন্দ্বে যে প্রাণের সঞ্চার হয়, তার সন্ধানে আছেন।
মিলন তাহলে সত্তরে পা দিলেন। তাঁকে সত্তরের ঘোলাটে ঘাটে স্বাগত। এই ঘাটটা থেকে দিনশেষের শেষ খেয়াটা ছাড়ে। আমি জানি, এই খেয়াঘাটে বসে মিলন চোখ মেলবেন চারদিকে, হয়তো ফিরে যাবেন ভোরের অথবা মধ্যাহ্নের দেশে। হয়তো ঘোলাটে পানি ঠেলে পরিষ্কার কিছু আবিষ্কার তাঁর হাতে ধরা দেবে। তাঁর কাজই হচ্ছে অদলবদল করা।
আশা করি, মিলন তাঁর সক্রিয়তাটা তাঁর কলমে ধরে রাখবেন।
জন্মদিনে তাঁকে একজন অগ্রজের শুভেচ্ছা।