অন্তর্বর্তী সরকার সম্প্রতি রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ২৬টি পাটকলের মধ্যে ২০টি বেসরকারি খাতে ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বেসরকারি বিনিয়োগ, আধুনিক প্রযুক্তি ও বাজারকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গির মাধ্যমে খাতকে পুনরুজ্জীবিত করার লক্ষ্যে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে এই সিদ্ধান্ত ঘিরে নতুন করে প্রশ্ন ও বিতর্ক দেখা দিয়েছে।
বাংলাদেশ পাটকল করপোরেশনের (বিজেএমসি) অধীনে থাকা রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন পাটকলগুলো একসময় দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের অন্যতম প্রধান খাত ছিল।কিন্তু বছরের পর বছর লোকসান, প্রযুক্তিগত দক্ষতার অভাব ও অদক্ষ ব্যবস্থাপনার কারণে এগুলো এখন সরকারের জন্য বোঝায় পরিণত হয়েছে।
বিজেএমসির যশোর জুট মিল যাচ্ছে আকিজ জুট লিমিটেডের কাছে। এ নিয়ে রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ উঠলেও বিজেএমসি বলছে, নিয়ম মেনেই প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে।
এ ছাড়া খালিশপুর জুট মিল পাচ্ছে রেডিয়েন্ট ফার্মাসিউটিক্যালস এবং দ্য ক্রিসেন্ট জুট মিল পাচ্ছে বিশ্বাস পোলট্রি অ্যান্ড ফিশ ফিডস লিমিটেড।নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন অর্থনৈতিক বিশ্লেষক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা যদি রাজনৈতিক সংযোগকে ইজারা প্রক্রিয়ায় ঢুকতে দিই, তাহলে প্রকৃত বিনিয়োগকারীরা নিরুৎসাহ হবে। রাষ্ট্রীয় সম্পদের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে হলে প্রক্রিয়াটির ওপর জনগণের আস্থা জরুরি।’
তিনি বলেন, পাটশিল্পের এই নতুন বেসরকারীকরণ উদ্যোগে যেমন সম্ভাবনার আলো আছে, তেমনি সংশয়ের ছায়াও রয়েছে। সফলতা নির্ভর করবে তিনটি বিষয়ের ওপর। তা হলো রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়া, উৎপাদনমুখী বাস্তব বিনিয়োগ এবং শ্রমিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা। অন্যথায় মালিকানাধীন জুট মিলগুলোর ইতিহাসের আবার পুনরাবৃত্তি ঘটবে, লোকসান থেকে সেটি যাবে জমির বাণিজ্যে।
এ প্রসঙ্গে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আব্দুল রউফ বলেন, ‘কারখানাগুলো এখনো সরকারের হাতেই আছে। বেসরকারি খাতে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ইজারা বা লিজ দেওয়া হচ্ছে।’ তিনি জানান, বিগত সরকারের সময় ইজারা কার্যক্রম ঢিলাঢালা থাকলেও বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার বন্ধ থাকা পাট ও বস্ত্রকল দ্রুত উদ্যোক্তাদের হাতে ছেড়ে দিতে চায়।
সচিব বলেন, ‘বন্ধ ২৫টি পাটকলের মধ্যে ১৩টি চালু করা হয়েছে। প্রতিটি কারখানা ভালোভাবে চলছে। বাকি ১২টিও যাতে দ্রুত চালু করা যায়, সেই ব্যবস্থা করা হচ্ছে।’
বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘তৈরি পোশাকের পাশাপাশি বিকল্প রপ্তানি খাত গড়ে তোলা জরুরি। পাটশিল্প সেই সুযোগ এনে দিতে পারে, যদি আমরা সঠিক পথে এগোতে পারি। তিনি বলেন, ‘বন্ধ পাটকলগুলো চালু হলে এ দেশে কর্মসংস্থান হবে। রপ্তানি আয় বাড়বে। ফলে সমগ্র অর্থনীতিতে গতি বাড়বে।’
বিজেএমসির সাতটি মিলের ইজারা প্রক্রিয়াধীন : বিজেএমসির মোট ২৫টি পাটকলের উৎপাদন কার্যক্রম ২০২০ সালের ১ জুলাই সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করেছিল তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার। এরপর কো-অপারেটিভ জুট মিল পুনর্গ্রহণ করে সংস্থাটির মিলের সংখ্যা হয় ২৬। এর মধ্যে জুটো ফাইবার গ্লাস ইন্ডাস্ট্রিজ নামের একটি কারখানায় ঢাকাই মসলিন হাউস স্থাপন করতে বাংলাদেশ তাঁত বোর্ডের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
সর্বশেষ নিয়ন্ত্রণে থাকা ২৫টি মিলের মধ্যে আইনগত জটিলতায় বাগদাদ-ঢাকা কার্পেট ফ্যাক্টরি ও আলীম জুট মিল এবং জমির অবস্থান ও বাণিজ্যিক বিবেচনায় অন্য মিলগুলো থেকে ভিন্নতর হওয়ায় ঢাকা ও চট্টগ্রামের তিনটি মিল (করিম জুট মিল, লতিফ বাওয়ানী জুট মিল ও আমিন জুট মিল) ইজারা দেওয়া হয়নি। ইজারার জন্য নির্বাচিত বাকি ২০টি মিলের মধ্যে এখন ১৩টির ইজারা সম্পন্ন হয়েছে।
ইজারা দেওয়া মিলগুলো হলো বাংলাদেশ জুট মিল, যশোর জুট ইন্ডাস্ট্রিজ, দৌলতপুর জুট মিল, কার্পেটিং জুট মিল, মিলস ফার্নিশিংস, গালফ্রা হাবিব, গুল আহমদ জুট মিল, ইউএমসি জুট মিল, খালিশপুর জুট মিল, ইস্টার্ন জুট মিল, আরআর জুট মিল, হাফিজ জুট মিল ও দ্য ক্রিসেন্ট জুট মিলস।