শেষবার বান্দরবান গিয়েছিলাম চার বছর আগে। এ বছর আবার যাওয়ার প্ল্যান করলাম, কোরবানির ঈদের প্রায় ১০ থেকে ১২ দিন আগে। ঈদের ছুটিতে [৮ জুন ২০২৫] বন্ধুরা মিলে ছুটলাম পাহাড়ে। আমাদের গন্তব্য বান্দরবানের আলীকদম উপজেলার গহিনে, থানকোয়াইন ঝরনা।
বৃষ্টি হলে ভয়াবহ রূপ ধারণ করে এই তৈনখাল। সেদিন মোটামুটি শান্ত রূপই ছিল। আস্তে আস্তে নৌকা বাঁক নিচ্ছিল আর সবুজ আলপনায় মোড়া বিশাল সব পাহাড়ের সামনে দিয়ে আমরা এগোচ্ছিলাম। এত দিন পর পাহাড় দেখে আনন্দে, বিস্ময়ে হতবাক হয়ে পড়ছিলাম।
জার্নিটা প্রায় আড়াই ঘণ্টার। এতেই আমি ভাবছিলাম, কত শত পথ পেরিয়ে আমরা না জানি কোন গহিনের পানে ছুটে যাচ্ছি। অথচ পুরো ট্রেকিং তখনো বাকি। এসব ভাবাবেগের মধ্যেই বন্ধু অভিযান ট্যাং, স্যালাইন মিশিয়ে বানাল এক ধরনের পানীয়। আফরিনা খাওয়াল লিচু। খেয়ে যেন ঘোর কাটল সবার। সবাই মিলে হৈচৈ করে অনেকক্ষণ ধরে চলল ফটো সেশন। পাহাড়ের বুকে সবুজের হরেক রকম শেড দেখতে দেখতে আমরা বিমোহিত। দুই ঘণ্টা পর দৌছড়ি বাজারের ঘাটে নামলাম, প্রায় ৪০ মিনিটের মতো ওখানেই কাটালাম। গরমে সবারই হাঁসফাঁস অবস্থা। স্যালাইন, কলা, চিপস—এসব খেয়েদেয়ে বসতে না বসতেই সবাই সবার গল্পের ঝাঁপি খুলতে শুরু করল, নানা রকম গল্প।
এরপর শুরু হবে সেদিনের মূল ট্রেক। দৌছড়ি বাজার থেকে আরেকটু এগিয়ে ঠিক মাঝদুপুরে প্রখর রোদের ভেতর আমাদের শুরু হলো ট্রেকিং। গন্তব্য থানকোয়াইন ঝরনা। প্রত্যেকের কাঁধে ভারী ব্যাগ, কারো হাতে মুরগি, কারো হাতে ডিমের কেস, পানির বোতল, কলার ব্যাগ। এই ট্রেকিং খুব একটা কঠিন না হলেও একটি ঘটনায় আমরা সবাই মানসিকভাবে কিছুটা বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিলাম। যাত্রার একদম শুরুতেই একটি ঝিরি পার হতে হয়। তারপর আরো মোটামুটি ১৫ মিনিট হাঁটার পর আমরা রাইথুমনী পাড়া পৌঁছাই। গরমের কারণে বেশ কষ্ট হচ্ছিল সবার। পাড়ায় একটি দোকানে বসে চা-পানি খেয়ে, একটু চাঙ্গা হয়ে আবার রওনা করি। বিপত্তিটা বাধে তখনই। আমাদের গাইড বিশু দাদা লাপাত্তা! কিছু সময়ের জন্য কোথাও যেন ঢুকে পড়েন তিনি। এদিকে আমরা ভুলে ঝিরি পার না হয়ে একটি খাড়া রাস্তা ধরি। অনেকটা চলে যাওয়ার পর যখন আমরা ভুল ধরতে পারি, তখন ফিরতি পথে ওই খাড়া পাহাড় থেকে নামতে প্রচণ্ড কসরত করতে হলো। পিচ্ছিল একটি জায়গা দিয়ে নাজিফা আর অভিযান একসঙ্গে পা হড়কায়। একটুর জন্য বড় কোনো বিপদ থেকে ওরা রক্ষা পায়। ওই ঘটনায় আমি রীতিমতো ট্রমাটাইজড হয়ে পড়ি, যে কারণে জায়গাটা পার হতে আমার বেশ বেগ পেতে হয়। অর্ণব আমাকে সেখানে অনেক সাহায্য করে। পরের পথ ততটা কঠিন ছিল না।
আমাদের আরো কয়েকবার ঝিরি পার হতে হয়। কখনো কখনো বুক সমান পানিও পার হই। টিমের ছেলেগুলো প্রতিবার সেই ঝিরিপথে আমাদের ব্যাগ-মালপত্র পার করে দিল।
এত চড়াই-উতরাই পার করে তবেই চোখে পড়ল ঝরনা। ছোটবেলায় পড়া সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের কবিতা ‘ঝর্ণা’ মনে দোল খেয়ে যায়। মনে মনে আওড়াতেও থাকি
“ঝর্ণা! ঝর্ণা! সুন্দরী ঝর্ণা!
তরলিত চন্দ্রিকা! চন্দন-বর্ণা!
অঞ্চল সিঞ্চিত গৈরিকে স্বর্ণে,
গিরি-মল্লিকা দোলে কুন্তলে কর্ণে,
তনু ভরি’ যৌবন, তাপসী অপর্ণা! ঝর্ণা!…”
শান্ত সুন্দর একটি ঝরনা এই থানকোয়াইন। ব্যাগ রেখে আমরা দ্রুত নেমে পড়ি। ঠাণ্ডা পানিতে দুই ঘণ্টা ঝাঁপাঝাঁপি করে মনের আশ মেটাই। শ্যাম্পু করি, স্নান করি। কী যে মজা! ঝরনা থেকে উঠে ঠিক ওপরেই এক জুম ঘরে ছিল আমাদের সেদিন রাতের আবাস।
এবারই প্রথম আমি ঝরনার পাশে রাত কাটালাম। এ যেন স্বপ্নের মতো। জুম ঘর থেকে ঝরনাটা অপরূপ লাগছিল। সারাক্ষণ জলের ঝিরঝির শব্দ। বিকেলে কমলা রঙের আলোতে ঝরনা ও আকাশকে অপার্থিব লাগছিল। সন্ধ্যায় আমরা খেলাম নুডলস, আর রাতে বিশুদার রান্না করা মুরগি-ভাত। এত মজার রান্না! সেই স্বাদ এখনো মুখে লেগে আছে। জুম ঘরে কোনো আলো নেই। মোম জ্বালিয়ে আমরা আবারও গল্প, হাহা-হিহিতে মাতলাম। নেটওয়ার্কবিহীন স্থানে স্বপ্নের মতো সুন্দর সময় কাটিয়ে তবেই আমরা ঘুমালাম।