
ফল-সবজির এই অলংকরণই মূলত ফুড কার্ভিং। এটি এমন একটি শিল্প, যা খাবার সাজাতে ও পরিবেশন করতে ব্যবহূত হয়। এটি খাবারকে আরো আকর্ষণীয় করে তোলে এবং পরিবেশনে আনে রুচি ও নান্দনিকতার ছোঁয়া। গ্রামে, শহরে গায়েহলুদ থেকে শুরু করে করপোরেট ইভেন্ট—সবখানেই জায়গা করে নিয়েছে এই শিল্প।
ফুড কার্ভিংয়ের ইতিহাস অনেক পুরনো। চীন দেশে প্রথম এর প্রচলন শুরু হয়। চীনের তাং রাজবংশে এর ব্যবহার দেখা গেছে প্রথমবার। থাইল্যান্ডে চতুর্দশ শতকে এক রাজসভায় কার্ভিং করে সবাইকে মুগ্ধ করেছিলেন ন্যাং নোপ্পামার্ট নামের এক ভৃত্য।

ফুড কার্ভিং নিয়ে বহু বছর ধরে কাজ করছেন আবিদা সুলতানা। ছোটবেলা থেকেই আঁকিবুঁকি পছন্দ করেন তিনি।
যশোরের জলিল রহমান ফুড কার্ভিং শুরু করেছিলেন গরুর খাবার হিসেবে আনা সবজি দিয়ে। মজা করে কাটতে কাটতেই নকশা তৈরি হয়ে যেত। পরে বাবার দেওয়া একটি ছুরিই তাঁকে অনুপ্রাণিত করে। এখন তিনি ঢাকার ফুড কার্ভিং শিল্পী, তাঁর প্রতিষ্ঠানের নাম ‘ঢাকা ফ্রুটস কার্ভিং’।

সোনিয়া শুরু করেছিলেন শখের বশে। জাতীয় মহিলা সমিতিতে ছোট্ট একটি কোর্স করেছিলেন। ফেসবুকে পেজ খোলেন—‘ফুড কার্ভিং বাই সোনিয়া’। গ্রাহকের কাছ থেকে নিয়মিত অর্ডার পান তিনি। আরেকজন ফারদিন খান। প্রথম দিকে পরিবারের অনেকেই ভালো চোখে দেখেনি তাঁর ফল কাটাকাটি। ‘ফল-সবজি কেটে সময় নষ্ট করছে ছেলে’—এমন মন্তব্যও শুনতে হয়েছে। দমে যাননি ফারদিন। গুগল-ইউটিউব দেখে শিখেছেন নানা কলাকৌশল। কয়েলের স্ট্যান্ড শাণ দিয়ে বানানো ছুরি দিয়ে শুরু করেছিলেন কাজ। এখন তাঁর ঝুলিতে এক হাজার দুই শর বেশি ডিজাইন।
মালিবাগের রুমানা হাসান জানালেন, ইউটিউবে দেখে তাঁরও শখ হয়, নিজের গায়েহলুদের আয়োজনেও ফুড কার্ভিং থাকুক। বাড়িতে এটি জানাতেই বড় ভাই মুন্না একজনকে নিয়ে এসেছিলেন। তিনি হলুদের ডালায় নানা পদের সবজি ও ফল দিয়ে পালকি, মিষ্টিভর্তি পালতোলা নৌকা, নৌকার মাঝি, বর-বউ পর্যন্ত সাজিয়েছিলেন। তিনি এত চমত্কার করে সবকিছু সাজিয়েছিলেন, মনে পড়লে এখনো আনন্দ হয় রুমানার।

রেহান কিছুতেই শাক-সবজি, ফলমূল খেতে চাইত না। তার মা নীলিমা শরীফ একজনের পরামর্শে নেট ঘেঁটে কিছু ফুড কার্ভিং দেখেন। রেহানও সেটি দেখতে পায়। চোখ-মুখ দেখে বুঝতে পারেন, ওর ভালো লেগেছে বিষয়টি। তখনই রেহানকে খাওয়ানোর বুদ্ধি খুঁজে পান নীলিমা। ‘কলা, খেঁজুর, আপেল আর শসা দিয়ে একটি গাছ বানানোর চেষ্টা করলাম মা-ছেলে দুজনে মিলে। রেহান তো সেদিন দারুণ খুশি। বানানো শেষে নানা-নানুকে দেখিয়ে সে খেয়েও নিল’, বললেন নীলিমা শরীফ। তাঁর মতে, শিশুদের খাওয়ানোর জন্য বেশ ভালো একটি শিল্প ফুড কার্ভিং। এর মধ্য দিয়ে শিশুকে শেখানোও যায়।
ফুড কার্ভিং শিল্পী আবিদা সুলতানা বলেন, ‘ফুড কার্ভিং এক ধরনের আর্ট। শিল্পী যেমন ক্যানভাসে ছবি আঁকেন, আমরা ফল-সবজির মাধ্যমে শিল্পের চর্চা করি। খাওয়ার আগে চোখ আর মনে এর সৌন্দর্য ছুঁয়ে যায়। টেবিলে খাবার উপস্থাপনাটাও অনেক গুরুত্বপূর্ণ। সুন্দরভাবে সাজানো খাবার অতিথিদের আলাদা আনন্দ দেয়। বিশেষ করে গায়েহলুদ, রিসেপশন বা করপোরেট ইভেন্টে ফুড কার্ভিং এখন অপরিহার্য হয়ে উঠেছে।’

একটি কার্ভিং খুব সহজ কাজ নয়। বিশেষ ধরনের নাইফসেট দরকার হয়। কার্ভিং নাইফ, স্কুপার, কাটার, পিলার ইত্যাদি। এগুলো দিয়েই আস্তে আস্তে শেপ ও নকশা তৈরি করা হয়। কয়েক ঘণ্টা ধরে একই ফল নিয়ে বসে থাকতে হয়। হাত কাঁপলে পুরো ডিজাইন নষ্ট হয়ে যেতে পারে। এসব সংরক্ষণও বেশ ঝামেলার। আপেল বা কলা কাটলেই কালো হয়ে যায়। তাই শিল্পীরা বিশেষ কৌশল ব্যবহার করেন। লেবু-লবণ পানিতে ভিজিয়ে রাখেন বা অনুষ্ঠানস্থলে গিয়ে শেষ মুহূর্তে কার্ভিং করেন।

বিয়ের মৌসুমে একজন ফুড কার্ভিং শিল্পীর আয় মাসে ৩০ থেকে ৭০ হাজার টাকা পর্যন্ত হতে পারে। প্যাকেজের দামও নানা রকম—কারো এক হাজার টাকার ছোট কাজ, আবার কারো লাখ টাকার বড় সেট। হোটেল-রেস্টুরেন্টে এখন খাবারের স্বাদ জরুরি, সঙ্গে তার চেহারাও। ‘আগে দর্শনদারি পরে গুণবিচারি’ প্রবাদটি সত্যি হয়ে ওঠে, যখন অতিথিরা খাওয়ার আগে মনভরে দেখতে শুরু করেন। সুন্দর কার্ভিং দেখে মুগ্ধ হয়ে ছবি তুলে নেন। ফুড কার্ভিংয়ের গুণে আমাদের উত্সবের খাবার টেবিল সৌন্দর্যের রঙে রঙিন হয়ে উঠেছে।
যা প্রয়োজন
ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, সিলেটসহ সারা দেশেই সুপারমার্কেটগুলোতে সহজেই পেয়ে যাবেন ফুড কার্ভিংয়ের জন্য প্রয়োজনীয় সব টুল। বাড়িতে যাঁরা শখের বশে ফুড কার্ভিং করতে চান, তাঁদের জন্য তিন থেকে পাঁচ কিংবা সাত পিসের সেট পাওয়া যায়। ছুরি, গোল চামচ, নানা আকৃতির বেলচা থাকে এসব টুলসেটের মধ্যে। এগুলো দিয়ে সহজেই নানা রকম আকর্ষণীয় শেপের কার্ভিং করতে পারবেন। এ ধরনের সেটের দাম নির্ভর করে কত পিস কার্ভিং টুল আছে তার ওপর। আপনার প্রয়োজন ও দক্ষতা অনুযায়ী ৪৫০ থেকে ৯৫০ টাকার মধ্যে ফুড কার্ভিং সেট কিনতে পারেন। পেশাদার ফুড কার্ভারদের সেটগুলোর দাম অবশ্য আরো বেশি। ১০ পিস, ১৫ পিস কিংবা ২০ পিসের বিশেষায়িত কার্ভিং টুলসেটের দাম পড়বে দুই হাজার ৫০০ থেকে চার হাজার টাকার মতো।
কিভাবে শিখবেন, কোথায় শিখবেন
টুলসেট নিয়ে বাড়িতেই ইউটিউব ভিডিও দেখে শেখা শুরু করতে পারেন। আরো যদি বিস্তারিত দিকনির্দেশনার প্রয়োজন মনে করেন, তাহলে ফুড কার্ভিংয়ের ওপর দু-তিন দিনের কর্মশালা থেকে শুরু করে দু-তিন মাসের পূর্ণাঙ্গ কোর্স এখন বাংলাদেশেই করা সম্ভব। ঐক্য এসএমই ট্রেনিং ইনস্টিটিউট থেকে মাত্র পাঁচ হাজার টাকায় ফুড কার্ভিংসহ ১০টি স্কিল শেখার সুযোগ রয়েছে। সনদপ্রাপ্ত পেশাদার শেফদের তত্ত্বাবধানে তিন মাসের পূর্ণাঙ্গ কোর্স করতে চাইলে যোগাযোগ করতে পারেন বিকন একাডেমি বাংলাদেশের সঙ্গে। এ ছাড়া ঢাকা কুলিনারি স্কুল, বাংলাদেশ ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট ইনস্টিটিউটসহ কিছু পাঁচতারা হোটেলের শেফরাও ব্যক্তিগত উদ্যোগে কর্মশালা পরিচালনা করেন। যাঁরা যুক্তরাজ্যের সিটি অ্যান্ড গিল্ডস এবং সুইজারল্যান্ডের এইচএসিসিপি অ্যান্ড হাইজিনের মতো রসনাশিল্পের গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক সার্টিফিকেশনের খোঁজ করছেন, তাঁদের জন্য পিসিএ প্রফেশনাল কুকিং একাডেমির তিন মাসের ফুড কার্ভিং কোর্সটি আদর্শ হতে পারে। আন্তর্জাতিক মানের এই কোর্স করতে খরচ পড়বে ৪৮ হাজার টাকা।