সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬, ০৩:১৫ অপরাহ্ন
নোটিশঃ
জনপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল প্রমিনিউজবিডি ডটকম এর পরিক্ষামূলক সম্প্রচার চলছে। সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। তার মানে এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা লেখার অংশবিশেষ কিংবা ছবি বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রচার বা প্রকাশ করা নিষিদ্ধ।

নজরুলের পাঠকপ্রিয়তার যত কারণ

ঢাকা অফিস
  • আপডেট: শনিবার, ৩০ আগস্ট, ২০২৫
  • ১০ বার পড়া হয়েছে
কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর সমকাল থেকে আজ পর্যন্ত একই রকম জনপ্রিয়। জীবদ্দশায় কিছুসংখ্যক মানুষ তাঁর তীব্র সমালোচনা করেছেন। কেউ কেউ ব্যঙ্গ করেছেন। কবি সেগুলোর কখনো কখনো জবাব দিয়েছেন।কেউ বলেতেন তাঁর লেখার মান ভালো নয়, কেউ বলতেন তিনি কাফের, কেউ বলতেন হিন্দুঘেঁষা। অনেকেই ঈর্ষাকাতর হয়েও তাঁর প্রতি তির্যক বাক্য নিক্ষেপ করেছেন। সমালোচকের কটুকথায় থেমে যাননি কাজী নজরুল ইসলাম। কোনো সমালোচনাই কবিকে দমিয়ে রাখতে পারেনি।কাজী নজরুল ইসলাম পাঠকপ্রিয়তা অর্জন করেছেন। যখন তিনি লিখতেন, তখন পাঠকরা তাঁর লেখা পড়ার জন্য অধীর অপেক্ষায় থাকতেন। পত্রিকা খুঁজে নিয়ে পড়তেন তাঁকে। একজন লেখকের জন্য এটি পরম প্রাপ্তি।কবি হিসেবে তাঁর পরিচিতির পরিধি বিস্তৃত। তাঁর ‘বিদ্রোহী’ কবিতা তাঁকে অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে। অনেকে বলেছেন, কাজী নজরুল ইসলাম কেবল ‘বিদ্রোহী’ কবিতা লিখলেই তাঁকে ইতিহাস থেকে মুছে দেওয়া যেত না। কাজী নজরুল ইসলামের যে কবিতাগুলো বেশি পাঠকপ্রিয়তা অর্জন করেছে, সেগুলো মূলত সমাজের অসংগতি দূর করার জন্য লেখা। ‘প্রলয়োল্লাস’, ‘খেয়া-পারের তরণী’, ‘আজ সৃষ্টিসুখের উল্লাসে’, ‘শিকল পরার গান’, ‘সাম্যবাদী’, ‘মানুষ’, ‘নারী’, ‘বারাঙ্গনা’, ‘কুলি-মজুর’,‘আমার কৈফিয়ত’সহ বেশ কিছু কবিতা আছে, যেগুলো কবিকে বাঁচিয়ে রেখেছে।

কাজী নজরুল ইসলামের গান ভীষণ কারুকাজখচিত। বাণীর চেয়ে সুর অনেক সময় তুমুলভাবে মানুষকে আকর্ষণ করেছে। অনেক গান আছে, যেগুলো সংগীতবোদ্ধাদের কাছে রীতিমতো গবেষণার। তাঁর গানের বাণীও কখনো কখনো ছুঁয়ে গেছে। তাঁর ইসলামী সংগীত, হামদ-নাত ব্যাপকভাবে সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে ধীসম্পন্ন মানুষের মনে-মননে স্থান করে নিয়েছে।

‘ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে/এলো খুশির ঈদ/ তুই আপনাকে আজ বিলিয়ে দে/শোন্ আস্মানী তাগিদ\’ এই গানের কদর দিনের পর দিন বেড়েই চলছে। এই গান না বাজলে, না শুনলে যে রোজার ঈদ পূর্ণতা লাভ করে না। খোদার প্রেমের শারাব পিয়ে/বেহুশ হয়ে রই পড়ে। ছেড়ে মসজিদ আমার মুর্শিদ/এল যে এই পথ ধ’রে\’ এই গান মানুষের মুখে মুখে। এসব গানের বাণী কিংবা সুর সবকিছুই ছুঁয়ে যায়।কাজী নজরুল ইসলাম শ্যামাসংগীত লিখেছেন। ‘আমার হরি নামে রুচি’ নামেও গান লিখেছেন। অনেক মুসলমান কাজী নজরুল ইসলামের এই ধারার গান লেখা ভালোভাবে গ্রহণ করতে পারেন না। তাঁর শ্যামাসংগীতও বেশ উচ্চাঙ্গের। গানের মাধ্যমে কাজী নজরুল ইসলাম সংগীতপ্রিয়দের কাছে নিজের আসন পোক্ত করে নিয়েছেন। তাঁর গানের জগৎ সুবিস্তৃত। গণমুখী গান বিপ্লবে-বিদ্রোহে-লড়াইয়ে মানুষকে জাগিয়ে তোলে। এমনই শক্তি সেই গানে, মনে হয় যেন সংগীতের শক্তিতে মানুষ নেমে যাবে রণাঙ্গনে। বাস্তবে গেছেও তাই। যেহেতু কাজী নজরুল ইসলাম গণমানুষের কবি, তাই তাঁর গানের পরতে পরতে গণমানুষমুখিনতা স্পষ্ট।

কাজী নজরুল ইসলামের ‘চল্ চল্ চল্। চল্ চল্ চল্\/ঊর্ধ্ব গগনে বাজে মাদল/নিম্নে উতলা ধরণীতল/অরুণ প্রাতের তরুণ-দল/চল্ রে চল্ রে চল্’—এই গান-কবিতা যথার্থই রণসংগীত। যুদ্ধের দামামা বাজাতে এই গানের সুরে ও বাণীতে রোপিত আছে অমোঘ শক্তি। কাজী নজরুল ইসলামের আরো অনেক গান শুনলেই রক্তে স্পন্দন জাগে। তেমনি আরেকটি গান ‘কারার ঐ লৌহ-কবাট/ভেঙে ফেল্, কর্ রে লোপাট/রক্ত-জমাট/শিকল-পুজোর পাষাণ-বেদী/ওরে ও তরুণ ঈশান!/বাজা তোর প্রলয়-বিষাণ!/ধ্বংস নিশান/উড়ুক প্রাচী-র প্রাচীর ভেদি।’

সমাজে রাষ্ট্রীয় অত্যাচার যখন সীমাহীন পর্যায়ে পৌঁছে যায়, তখনো নজরুলের গান প্রাণসঞ্চার করে। রাষ্ট্রব্যবস্থাকে তখন চ্যালেঞ্জ করে তাঁর গান। ফলে শোষিত-বঞ্চিত-নিপীড়িত-ভাগ্যহত মানুষের কাছে নজরুল হয়ে ওঠেন নিত্যস্মরণীয়। ঔপনিবেশিক শাসক কিংবা নিজ দেশীয় শাসক—সবার অন্যায়ের বিরুদ্ধে কাজী নজরুল ইসলামের গান প্রবল বেগে শোষককে আঘাত করে। শিকলে বন্দি করলে বন্দির পক্ষে থাকা মানুষের সংগীত হয়ে ওঠে—‘এই শিকল-পরা ছল মোদের  এ শিকল-পরা ছল।/এই শিকল পরেই শিকল তোদের করব রে বিকল\/তোদের বন্ধ কারায় আসা মোদের বন্দী হতে নয়,/ ওরে ক্ষয় করতে আসা মোদের সবার বাঁধন-ভয়।’ ‘শিকল-পরার গান’ কবিতা মানুষের মনে মনে ধ্বনিত হয়।

কাজী নজরুল ইসলামের অনেক কবিতাও গান হিসেবে অনেক শ্রোতাপ্রিয়তা অর্জন করেছে। এ রকম একটি গান ‘দুর্গম গিরি কান্তার-মরু দুস্তর পারাবার হে/লঙ্ঘিতে হবে রাত্রি নিশীথে যাত্রীরা হুশিয়ার!’ এই গানটি মূলত ‘কাণ্ডারী হুশিয়ার’ কবিতা।

কাজী নজরুল ইসলামের ‘বিদ্রোহী’ কবিতাকেও গানে রূপ দেওয়া হয়েছে। তাঁর গান ঘুমন্ত মানুষকে সতেজ করে তুলবে। কাজী নজরুল ইসলামের আরেকটি কবিতা আছে, ‘ছাত্রদলের গান’। এই কবিতাটিও গান হয়ে বাজে। ‘আমরা শক্তি আমরা বল/আমরা ছাত্রদল।/মোদের পায়ের তলায় মূর্ছে তুফান/ঊর্ধ্বে বিমান ঝড়-বাদল।/আমরা ছাত্রদল\’ ছাত্রদের জাগানিয়া গান এটি।

গণসংগীতের ধারার বাইরেও তাঁর অনেক জনপ্রিয় গান আছে। এসব গানের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ‘খেলিছ এ বিশ্ব লয়ে বিরাট শিশু আনমনে।/প্রলয় সৃষ্টি তব পুতুল খেলা নিরজনে প্রভু নিরজনে\’ কাজী নজরুল ইসলামের এই গানটি সৃষ্টিলীলা নিয়ে লেখা। এই গানের বিষয়গত গভীরতা অতলস্পর্শী। এ গান ভীষণ কষ্টে থাকা মানুষের কষ্ট মোচন করতে পারে। তাঁর আরেকটি গান ‘আলগা কর গো খোঁপার বাঁধন/দিল ওহি মেরা ফঁস গয়ি।’ এই গানের ভাষা অতিক্রম করে ভাবে পৌঁছা কঠিন হলেও সুরের ব্যঞ্জনায় মানুষের মুখে মুখে এই গান।

কাজী নজরুল ইসলামের বেশ কিছু গান দারুণভাবে কালোত্তীর্ণ হয়েছে। সময় বদলেছে, বদলেছে সমাজকাঠামো, তবু আবেদন অনিঃশেষ অনেক গানের। ‘বাগিচায় বুলবুলি তুই ফুলশাখাতে/দিসেন আজি দোল্। আজো তার ফুল্কলিদের ঘুম টুটেনি/তন্দ্রাতে বিলোল্\’ তাঁর আরো কিছু গানের কথা এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে—‘করুণ কেন অরুণ আঁখি’, ‘এত জল ও-কাজল চোখে’, ‘আমার কোন্ কূলে আজ ভিড়ল তরী’, ‘প্রিয় যাই যাই বলো না’, ‘নয়ন-ভরা জল গো তোমার আঁচল ভরা ফুল’ ইত্যাদি।

কাজী নজরুল ইসলামের লেখার ভাষা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তিনি যা কিছু লিখেছেন, সেখানে ভাষা প্রয়োগের বিচিত্র ধরন আমরা লক্ষ করি। আরবি-ফারসি ভাষাও তাঁর কবিতায় উপর্যুপরি এসেছে। ভাষার প্রাঞ্জলতা না থাকলে তাঁর লেখা শিল্পমানে উন্নীত হতো না। আমরা কালে কালে কাজী নজরুল ইসলামকে অপরিহার্য হতে দেখেছি। সর্বত্রই তাঁর লেখা প্রাসঙ্গিক। ছোট ঘটনা থেকে বড় ঘটনা—সর্বত্রই কাজী নজরুল এসে যেন হাজির হন। জুলাই অভ্যুত্থানে গ্রাফিতি কিংবা দেয়াললিখনের দিকে তাকালে এই কবিকে বোঝা যায়। দেয়ালে দেয়ালে কাজী নজরুল ইসলাম নিজের উপস্থিতি জানান দিচ্ছেন।

এককথায় বলা যায়, কাজী নজরুল ইসলাম বিচিত্র পাঠকের মণিকোঠায়, বিচিত্র শ্রোতাদের পছন্দক্রমের শীর্ষে আছেন। তাঁর লেখার আঙ্গিকের চেয়ে বিষয় বড় হয়ে উঠেছে। এই কাজ তিনি সচেতনভাবেই করেছেন। পাঠক-শ্রোতার মন ও মননে কবি বেঁচে থাকবেন অনন্তকাল। তাঁর আবেদন অনিঃশেষ।

ভালো লাগলে সংবাদটি শেয়ার করুন

এই বিভাগের আরো সংবাদ
© All rights reserved © 2026 PromiNewsBD.com
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com