ধরিয়া তোমায় পুরিল তাহার আঁধার বিবর-পুরে।
সেই যে আদিম বন্ধন তব, সেই হতে আছ মরে
মরণের পরে নামিল ধরায় সেইদিন বিভাবরী’।
(নজরুল রচনাবলী, প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা-৯১)
প্রথাগত নারীভাবনায় নারীকে দেখা হয় ভীরু, অন্তঃপুরবাসী, সৌন্দর্যময় অলংকারে বিভূষিত কুণ্ঠিত আকারে। নজরুল নারীকে দেখতে চান এসবের বাইরে নতুনরূপে, পূর্ণাঙ্গ মানুষরূপে। নারীকে এই স্বাভাবিক প্রকাশের ক্ষেত্রে তিনি নারীর ব্যবহৃত অলংকারকে মনে করেন দাসত্বের চিহ্ন। তিনি নারীকে এই দাসত্বের চিহ্ন ফেলে অবরুদ্ধতা থেকে মুক্ত হওয়ার আহবান জানিয়েছেন—
‘চোখে চোখে আজ চাহিতে পার না; হাতে রুলি, পায়ে মল
মাথায় ঘোমটা, ছিঁড়ে ফেল নারী ভেঙ্গে ফেল ও শিকল!
যে ঘোমটা তোমায় করিয়াছে ভীরু ওড়াও সে আবরণ;
দূর করে দাও দাসীর চিহ্ন ঐ যত আভরণ!’
(প্রাগুক্ত, পৃষ্ঠা-৯১)
নজরুল চেতনাগতভাবে সকল প্রকার আধিপত্য ও অবরুদ্ধতার বিরুদ্ধে। এদিক থেকে তিনি পুরুষকে আবিষ্কার করেছেন আধিপত্যবাদী ও উত্পীড়ক হিসেবে। আর নারীকে মনে করেছেন আধিপত্যের শিকার এবং উত্পীড়িত হিসাবে। সাম্যবাদী নজরুল নারী পুরুষের এই পরিস্থিতিকে নারী পুরুষের অসাম্য হিসাবে দেখলেও শেষ পর্যন্ত তিনি একে মনে করেন পীড়ক এবং পীড়িতের সমস্যা হিসাবে। নজরুল এই অসাম্যের মধ্যে সাম্য বিধানের যে সূত্র নির্দেশ করেন, তা কেবল নারী পুরুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে এক সামগ্রিক সূত্রে হয়ে উঠেছে।
নারী অবলা নয়; তার মধ্যে যে আদ্যাশক্তির অমিত সম্ভাবনা নিহিত আছে, সে সম্পর্কে সে অচেতন বলেই নারী অবরুদ্ধ জীবনের অবমাননা মুখ বুজে সহ্য করে। তাই কবি জাগরণী মন্ত্রে নারীদের জাগ্রত করার প্রয়াস দেখিয়েছেন তাঁর নারী জাগরণীমূলক গান ও কবিতায়। নজরুল নারীর রণরঙ্গিণী মূর্তিই কামনা করেননি, তাকে প্রেমময়ী বধূ, স্নেহময়ী জননী ও প্রিয়
দয়িতারূপেও চিত্রিত করেছেন। তাঁর অজস্র গান ও কবিতায় তার প্রমাণ রয়েছে।নজরুলের গানে দেশপ্রেম নানাভাবে প্রকাশিত হয়েছে। এর মধ্যে নারী জাগরণ বা বাংলার নারীদের কুসংস্কারের অন্ধকার ভেঙে আলোতে বেরিয়ে আসার প্রেরণামূলক গান সংখ্যায় বেশি না হলেও উল্লেখযোগ্য। আপাতভাবে নারীর মানবিক অধিকার তথা তার শৃঙ্খলিত জীবনের কথা থাকলেও এর মধ্য দিয়ে সংগীতকার নজরুলের স্বদেশচেতনাই প্রস্ফুটিত। শুধু গানেই নয়, কবিতায়ও নজরুল আগেই বলেছেন—‘বিশ্বে যা কিছু মহান সৃষ্টি চির কল্যাণকর/অর্ধেক তার আনিয়াছে নারী অর্ধেক তার নর।’নজরুল জানতেন, এই সমাজ যে পিছিয়ে আছে, তার কারণ হচ্ছে অধিকারবঞ্চিত আমাদের নারীসমাজ। নারীরা সংসার-সমাজশিকলে বন্দি থাকায় আমাদের অর্থনৈতিক মুক্তি লাভ হচ্ছে না। তাই তাদের টেনে আনতে হবে সভ্যতার আলোয়। এই উপলব্ধি থেকে নজরুল নারী জাগরণমূলক স্বদেশি গান রচনা করেছেন। বাংলায় এ ধারার গান একেবারেই কম। তার মধ্যে নজরুলের নিম্নের প্রথম গানটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ ও অর্থবহ এবং বাকি গানগুলোও যথেষ্ট উল্লেখযোগ্য—১. ‘জাগো নারী জাগো বহ্নিশিখা’, ২. ‘আমি মহাভারতী শক্তি নারী’ ৩. ‘চাঁদের কন্যা চাঁদ সুলতানা’ ৪. ‘কোন অতীতের আঁধার ভেদিয়া’ ৫. ‘এসো শঙ্কর ক্রোধাগ্নি’ ৬. ‘গুণে গরিমায় আমাদের নারী আদর্শ দুনিয়ায়’ ৭. ‘জাগিলে পারুল কিগো সাত ভাই চম্পা ডাকে’ ৮. ‘মেলি শতদিকে শত লেলিহান রসনা’ ৯. ‘ঐ নন্দন নন্দিনী দয়িতা’ ১০. ‘তুমি মোর জননী ধরেছ জঠরে’ প্রভৃতি।এসব গান নারীদের পরমা শক্তির অংশরূপে বর্ণনা করে কবি তাদের অনুপ্রাণিত করবার প্রয়াস পেয়েছেন। কোথাও বর্তমান কালের নারীদের অনুপ্রাণিত করতে ইতিহাসখ্যাত বীর রমণীদের প্রশস্তি করেছেন। ‘জাগো নারী জাগো বহ্নিশিখা’ একটি প্রবল তেজোময় সংগীত। এর শক্তিদীপ্ত পৌরাণিক পূর্বোল্লেখ, বেগবান শব্দমালার সঙ্গে পরিপূরক খেয়াল অঙ্গের সুর গানটিকে এক দীপ্ত আহ্বানে পরিণত করেছে” (নজরুল-গীতি প্রসঙ্গ, করুণাময় গোস্বামী, বাংলা একাডেমি, ঢাকা, পৃষ্ঠা-১৪৩)।
নজরুলের চেতনায় যে দেশ ছিল, সেই দেশের নারীরাও তাই ভাষা পেয়েছে তাঁর গানে, সুরে—এ কথা বলা যায় নির্দ্বিধায়। প্রয়াণ দিবসে তাঁকে শ্রদ্ধাঞ্জলি।