১৯২৩ সালের ১৪ এপ্রিল নজরুল জেল-জুলুমের বিরুদ্ধে একটানা অনশন শুরু করলে কবির জীবন সংকটাপন্ন হয়ে পড়ে। রবীন্দ্রনাথ থেকে শুরু করে দেশের মানুষ উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার মধ্যে দিনাতিপাত করেন। সে সময় নজরুলের অনশনের কারণ নিরসনের জন্য বিদেশি সরকারের ওপর চাপ প্রয়োগের জন্য চিত্তরঞ্জন দাশের সভাপতিত্বে ২১ মে গোলদীঘির ময়দানে এক জনসভার আয়োজন করা হয়। সভায় শ্রীমৃণালকান্তি বসু, মাওলানা মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান এছলামাবাদী, হেমন্তকুমার সরকার, অতুলচন্দ্র সেন, ড. সোহরাওয়ার্দি প্রমুখ নজরুল সাহিত্য ও সংগ্রামের প্রশংসা করে বক্তৃতা করেন। এই সভার কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়িত হওয়ায় নজরুলের পক্ষে অনশন ভাঙা সহজ হয়।
১৯২৪ সালে চিত্তরঞ্জন তারকেশ্বরে অসচ্চরিত্র ধর্মব্যবসায় মোহান্তর বিরুদ্ধে আন্দোলন করলে নজরুল তাঁর সঙ্গে যোগ দেন; এবং ‘মোহান্তের মোহ অন্তের গান’ রচনা করেন। ১৯২৫ সালের মে মাসে ফরিদপুরে বঙ্গীয় রাষ্ট্রীয় সমিতির কনফারেন্সে সভাপতিত্ব করেন চিত্তরঞ্জন দাশ। কাজী নজরুল ইসলাম চিত্তরঞ্জন দাশ ও মহাত্মা গান্ধীর সঙ্গে ফরিদপুরের সম্মেলন থেকে ফিরে আসার এক মাস পর ৫৪ বছর বয়সে দার্জিলিংয়ে মারা যান দেশবন্ধু। আকস্মিক মৃত্যু সংবাদে নজরুল শোকবিহ্বল হয়ে পড়েন। শ্রীপ্রাণতোষ চট্টোপাধ্যায় লেখেন, “দেশবন্ধুর মৃত্যু সংবাদ শুনে কবি কয়েক মুহূর্ত নিশ্চুপ থেকে দশ মিনিটের মধ্যে ‘অর্ঘ্য’ গানটি রচনা করেন।” এ সময় নজরুল আরো একটি অভিনব কাজ করেন। দেশবন্ধুর কনিষ্ঠা কন্যা এ কথা উল্লেখ করেন, “আমার আজও মনে আছে পিতৃদেব অন্তিম শয়ানে শায়িত—হঠাৎ কোথা থেকে অদ্ভুত প্রকৃতির এক যুবক অবিন্যস্ত তার কেশদাম, পরনে একটি বিচিত্র ধরনের পোশাক, ঝড়ের বেগের মতো ছুটে এলেন—হাতে এক টুকরা কাগজ। কাউকে কিছু না বলে সেই কাগজের টুকরাতে লিখে শবদেহের ওপর রাখলেন—‘হায় চিরভোলা হিমালয় হতে অমৃত আনিতে গিয়া/ ফিরিয়া এলে গো নীল কণ্ঠে মৃত্যু গরল পিয়া।’ ইনি সেই আমার ভ্রাতৃপ্রতিম কাজী নজরুল ইসলাম।”
শোকাহত নজরুল একের পর এক লিখলেন ‘অকাল সন্ধ্যা’, ‘ইন্দ্র-পতন’, ‘সান্ত্বনা’ ও ‘রাজ-ভিখারী’। ‘ইন্দ্র-পতন’ কবিতাটি দেশবন্ধুর মৃত্যুর ১২ দিন পর সাপ্তাহিক আত্মশক্তি পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল। কিন্তু কয়েকটি শব্দ ও চরণের প্রয়োগ নিয়ে আপত্তি ওঠে। বই প্রকাশের সময় সেগুলো বাদ দেওয়া হয়। প্রবাসীর তথ্য অনুসারে জানা যায়, ৪০ পাতার বইয়ের দাম ছিল এক টাকা।
১৯২৫ সালটি ছিল নজরুলজীবনের অত্যন্ত সৃজনশীল কাল। এই বছর কবি ‘চিত্তনামা’ ছাড়াও ‘ছায়ানট’, ‘সাম্যবাদী’ ও ‘পুবের হাওয়া’ কাব্যগ্রন্থ তিনটিও প্রকাশ করেন। দেশপ্রেম, স্বাধীনতাসংগ্রাম, অসাম্প্রদায়িক চেতনা এবং শোকের গভীর প্রকাশ হিসেবে ‘চিত্তনামা’ কাব্যগ্রন্থটি শতবর্ষেও সমান প্রাসঙ্গিক।