সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬, ০১:৩৬ অপরাহ্ন
নোটিশঃ
জনপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল প্রমিনিউজবিডি ডটকম এর পরিক্ষামূলক সম্প্রচার চলছে। সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। তার মানে এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা লেখার অংশবিশেষ কিংবা ছবি বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রচার বা প্রকাশ করা নিষিদ্ধ।

পাট রপ্তানিতে সুদিন ফিরবে কবে

ঢাকা অফিস
  • আপডেট: শনিবার, ৩০ আগস্ট, ২০২৫
  • ২২ বার পড়া হয়েছে
পাট বাংলাদেশের সোনালি আঁশ। মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ২ শতাংশ উপার্জিত হয় পাট ও পাটপণ্য থেকে। তৈরি পোশাক শিল্পের পর এটি দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম রপ্তানি খাত। পাট থেকে আহরিত মোট বৈদেশিক মুদ্রার প্রায় এক-চতুর্থাংশ আসে কাঁচা পাট রপ্তানি থেকে।

বর্তমানে আমাদের কৃষকদের বড় সমস্যা পাট পচানো। বর্ষার পানি দ্রুত নেমে যাওয়ায় এবং প্রয়োজনীয় বৃষ্টির অভাবে অনেক সময় ঠিকভাবে পাট জাগ দিতে পারেন না কৃষকরা। বিকল্প হিসেবে রিবন রেটিং বা পাটের ছালকরণ ও পচানো পদ্ধতির শরণাপন্ন হন অনেক কৃষক। তবে এ সম্পর্কে কৃষকদের প্রশিক্ষণের অভাব প্রযুক্তি সম্প্রসারণে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এবার মৌসুমের শুরুতে প্রয়োজনীয় পানির অভাবে পাট জাগ দেওয়ার সমস্যা হচ্ছিল। তবে সম্প্রতিক পর্যাপ্ত বৃষ্টিতে তা সহজ হয়েছে। পাটবীজের অপ্রতুলতা এ দেশে পাট চাষের আরেকটি সমস্যা। দেশে উৎপাদিত বীজে চাষ হয় প্রায় ২০ শতাংশ জমি। বাকি জমির চাষ হয় আমদানীকৃত বীজ দিয়ে, যার গুণগত মান সম্পর্কে অনেক সময় কোনো নিশ্চয়তা থাকে না ।

নব্বইয়ের দশকে এ দেশে পাটের চাষ হতো প্রায় ১২ লাখ হেক্টর জমিতে। ক্রমেই তা নেমে আসে সাড়ে চার  লাখ হেক্টরে। অতি সম্প্রতি তা বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে সাত থেকে সাড়ে সাত লাখ হেক্টরে। তা ছাড়া হেক্টরপ্রতি উৎপাদনও উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বেড়েছে। এতে পাটের মোট উৎপাদন দাঁড়িয়েছে বছরে কমবেশি ৮০ লাখ বেলে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে পাটের আবাদ হয়েছে সাত লাখ পাঁচ হাজার হেক্টর জমিতে। সম্ভাব্য মোট উৎপাদন দাঁড়াবে ৮৫ লাখ বেলে। এ বছর পাটের উৎপাদন ভালো হয়েছে। দামও ভালো পাচ্ছেন কৃষকরা। প্রকারভেদে খামার প্রান্তে প্রতি মণ পাটের দাম পাওয়া যাচ্ছে তিন হাজার ৫০০ থেকে চার হাজার টাকা। পক্ষান্তরে উৎপাদন খরচ দুই হাজার ৫০০ থেকে তিন হাজার টাকা। প্রতি মণ পাটে কৃষকদের লাভ এবার গড়ে প্রায় এক হাজার টাকা।

পাটের আন্তর্জাতিক মূল্য নির্ধারিত হয় মূলত এফওবি নারায়ণগঞ্জ মূল্যের ভিত্তিতে। সে মোতাবেক এখন প্রতি মণ পাটের এফওবি মূল্য প্রকারভেদে চার হাজার ৩০০ থেকে পাঁচ হাজার ২০০ টাকা। এর প্রায় ৮০ শতাংশই পাচ্ছেন উৎপাদনকারী কৃষক। অভ্যন্তরীণ খরচ ও ব্যবসায়ীদের মুনাফা মিলে যাচ্ছে বাকি প্রায় ২০ শতাংশ। সেদিক বিবেচনায় এবার পাটের বাজার দক্ষ। তবে সমস্যা রয়েছে পাট রপ্তানির ক্ষেত্রে। এতে রপ্তানি আয় কমছে। এ ক্ষেত্রে প্রধান সমস্যাটি হচ্ছে পাটপণ্যে সীমিত মূল্য সংযোগ ও বহুধাকরণ। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক স্থবিরতার কারণেও পাটপণ্যের চাহিদা বাড়ছে না। অন্যদিকে ভারতের অ্যান্টিডাম্পিং নীতির আরোপ ও শুল্ক বৃদ্ধির কারণে কাঁচা পাট ও পাটপণ্যের রপ্তানি হ্রাস পাচ্ছে। চোরাপথে অবৈধ রপ্তানি বৃদ্ধি পাচ্ছে। সম্প্রতি স্থলপথে বাংলাদেশের পাটজাত পণ্য আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে ভারত। আগে বেনাপোল, হিলি ও ভোমরা স্থলবন্দর দিয়ে পাট ও পাটজাত পণ্য রপ্তানি করা হতো ভারতে। এতে সময় কম লাগত এবং খরচ কম হতো। এখন মুম্বাইয়ের নাভা শেভা সমুদ্রবন্দর দিয়ে তা রপ্তানি করতে হবে। এতে সময় লাগবে বেশি। খরচ বাড়বে। বাংলাদেশ থেকে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ১৫৭ কোটি ডলারের পাটপণ্য রপ্তানি হয়েছে ভারতে, যা মোট রপ্তানির ৩.৭৫ শতাংশ। এর মাত্র ১ শতাংশ রপ্তানি হতো সমুদ্রপথে। এখন পুরোটাই নোঙর করবে মুম্বাই সমুদ্রবন্দরে। এতে বাংলাদেশের পণ্য প্রতিযোগিতার সক্ষমতা হারাবে।

দেশের অভ্যন্তরেও পাটপণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে অনেক সমস্যা বিদ্যমান। এবারের বাজেটে কাঁচা পাট রপ্তানির ক্ষেত্রে ০.৫ শতাংশ উেস কর আরোপ করা হয়েছে। নগদ সহায়তার ওপর প্রবর্তন করা হয়েছে ১০ শতাংশ কর। বহুমুখী পাটপণ্যের ক্ষেত্রে নগদ সহায়তা ১৫ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ করা হয়েছে। সাধারণ পাটপণ্যের ক্ষেত্রে রপ্তানি সহায়তা ৭ থেকে কমিয়ে নির্ধারণ করা হয়েছে ৫ শতাংশ। পাটের সুতা রপ্তানিতে আগে ৫ শতাংশ নগদ সহায়তা দেওয়া হতো, এখন তা ৩ শতাংশে নামানো হয়েছে। এগুলো পাট রপ্তানিকে নিরুৎসাহ করবে।

আগামী দিনগুলোতে পাট খাতের রপ্তানি বাড়ানোর জন্য পাটপণ্যের বহুধাকরণ নিশ্চিত করতে হবে। রপ্তানির গন্তব্য সম্প্রসারিত করতে হবে। ভারতের বিভিন্ন শুল্ক ও অশুল্ক বাধার বিষয়ে দ্বিপক্ষীয় আলোচনার আয়োজন করতে হবে। একই সঙ্গে বিকল্প বাজার খোঁজার উদ্যোগ নিতে হবে। অভ্যন্তরীণভাবে পাটপণ্যের ওপর বিভিন্ন কর রহিত করতে হবে। পাটশিল্পের আধুনিকায়ন নিশ্চিত করতে হবে এবং নতুন মেশিন স্থাপন করতে হবে। পাট খাতে বিনিয়োগ ও রপ্তানি সহায়তা বাড়াতে হবে। সংশ্লিষ্ট রপ্তানিকারকরা বলছেন, ভবিষ্যতে পাট ও পাটজাত পণ্য রপ্তানি করে বছরে প্রায় পাঁচ বিলিয়ন মার্কিন ডলার আয় করা সম্ভব। তবে সে সুদিনের জন্য অপেক্ষা করতে হবে।

২০২১ সালে বিশ্বে পাটের মোট উৎপাদন ছিল ৩.৪৬ মিলিয়ন টন। ভারতের উৎপাদন ছিল ১.৭২ মিলিয়ন টন এবং বাংলাদেশের উৎপাদন ছিল ১.৬৮ মিলিয়ন টন। বাংলাদেশ ও ভারত মিলে বিশ্বের প্রায় ৯৮ শতাংশ পাট উৎপাদন নিয়ন্ত্রণ করছে। পাট ও পাটজাত পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে বিশ্ববাজারে এখনো বাংলাদেশের আধিপত্য বিরাজমান। বিশ্বের মোট পাট রপ্তানির ৭৯ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে বাংলাদেশ। তা ছাড়া ভারত ৪.৮ শতাংশ এবং তানজানিয়া, বেলজিয়াম, কেনিয়া ও মালয়েশিয়া মিলে ১৩ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। কাঁচা পাট রপ্তানির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের শরিকানা ৯৭ শতাংশ এবং পাটজাত দ্রব্যের ক্ষেত্রে ৬০ শতাংশেরও বেশি।  বর্তমানে পাটের বাজার সম্প্রসারণের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে পৃথিবীর অনেক দেশে। এর কারণ পলিথিন ও সিনথেটিকের ব্যবহার বিশ্বব্যাপী নিরুৎসাহ করছেন পরিবেশবাদীরা। পলিথিন ও সিনথেটিক দ্রব্য পচনশীল নয়। পরিবেশের জন্য এগুলো মারাত্মক ক্ষতিকর। অন্যদিকে পাট পরিবেশবান্ধব। তাই এর চাহিদা রয়েছে বিশ্বব্যাপী। তা ছাড়া অভ্যন্তরীণ বাজারেও পাটের চাহিদা বৃদ্ধি পাচ্ছে ১৯টি পণ্যের মোড়কে পাটের ব্যাগ/থলে/বস্তা ব্যবহারের আইন প্রণয়ন করার কারণে। ভবিষ্যতে পাটের উৎপাদন, অভ্যন্তরীণ ব্যবহার ও রপ্তানি আয় লাগাতার বৃদ্ধি পাবে—এই প্রত্যাশা।

 

লেখক : কৃষি অর্থনীতিবিদ

ভালো লাগলে সংবাদটি শেয়ার করুন

এই বিভাগের আরো সংবাদ
© All rights reserved © 2026 PromiNewsBD.com
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com