অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিসে আক্রান্ত রোগী কোন না কোন পর্যায়ে ডায়াবেটিক নেফ্রোপ্যাথিতে ভুগে থাকেন। যে সমস্ত ডায়াবেটিস রোগীর ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য প্রথম থেকেই ইনসুলিন ইনজেকশনের দরকার পড়ে তাদের এই রোগ বেশী দেখা যায়। এছাড়াও ডায়াবেটিস রোগী প্রস্রাবে জীবাণুজনিত রোগে এমনকি নেফ্রাইটিস জাতীয় কিডনি রোগেও ভুগতে পারে।
প্রাথমিক পর্যায়ে ডায়াবেটিক নেফ্রোপ্যাথির কোন উপসর্গ থাকে না। যখন উপসর্গ দেখা যায় ততদিনে কিডনির অনেকটা ক্ষতি হয়ে গিয়ে থাকে। প্রধান প্রধান উপসর্গ হচ্ছে উচ্চ রক্তচাপ এবং পায়ে পানি আসা। এদেরকে পরীক্ষা করে চোখের জটিলতা, ¯œায়ুতন্ত্রের জটিলতার উপস্থিতি লক্ষ করা যায়। সাধারণত ডায়াবেটিস হওয়ার পাঁচ থেকে পনের বছর পর এ ধরনের জটিলতা দেখা যায়। এই পর্যায়ে চিকিৎসায় খুব ভালো ফল লাভ করা যায় না আর সেই জন্যই এমন একপর্যায়ে নেফ্রোপ্যাথি ধরার চেষ্টা করা হয় যখন চিকিৎসা করে ভালো ফল লাভ করা সম্ভব। এই জন্যই প্রতিটি ডায়াবেটিস রোগীকে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়ার পর পরই প্র¯্রাবে অ্যালবুমিন আছে কি না তা পরীক্ষা করে দেখা হয়। আমরা যে পদ্ধতিতে প্রস্রাবে অ্যালবুমিন পরীক্ষা করে থাকি তাতে ২৪ ঘণ্টায় অ্যালবুমিন ৩০০ মিলিগ্রামের উপরে গেলেই ধরতে পারি। কিন্তু ডায়াবেটিক নেফ্রোপ্যাথির পর্যায়ে ২৪ ঘণ্টায় ৩০ মিলিগ্রাম অ্যালবুমিন গেলে ভাবা হয় যে, কিডনিতে জটিলতা শুরু হয়েছে। এই ধরনের রোগকেই ইনসিপিপিয়েন্ট বা প্রাথমিক ডায়াবেটিক নেফ্রোপ্যাথি বলা হয়ে থাকে এবং এদের কোন রকম উপসর্গ থাকে না।
পরীক্ষা :
প্রতিটি ডায়াবেটিস রোগীর প্রথমেই সকালের প্র¯্রাব পরীক্ষা করে প্র¯্রাবে অ্যালবুমিন বা আমিষ, সুগার বা শর্করা আছে কিনা তা দেখা উচিত। অনুবীক্ষণ যন্ত্রের সাহায্যে প্র¯্রাবে লোহিত কনিকা, শ্বেত কনিকা ও কাষ্ট দেখা হয়। যদি প্র¯্রাবে শ্বেত কনিকা পাওয়া যায়, প্র¯্রাব কালচারের মাধ্যমে জীবাণুজনিত ইনফেকশন আছে কিনা তা নির্ণয় করা হয়ে থাকে। ২৪ ঘণ্টার প্র¯্রাব পরীক্ষা করে কত পরিমাণ অ্যালবুমিন যাচ্ছে তা নির্ণয় করা হয়। ২৪ ঘণ্টার অ্যালবুমিন ৩০০ মিলিগ্রামের উপরে গেলেই ডায়াবেটিস নেফ্রোপ্যাথি ভাবা হয়। উন্নত বিশ্বে ৩০০ মিলিগ্রামের নিচে এবং ৩০ মিলিগ্রামের উপরে অ্যালবুমিন গেলেও তা ধরতে পারা যায়। প্রতিটি রোগীর রক্তের ইউরিয়া, ক্রিয়েটিনিন, সোডিয়াম, পটাশিয়াম, ক্লোরাইড, বাইকার্বোনেট পরীক্ষা করে দেখা যায়। প্র¯্রাবে যদি ৩০০ মিলিগ্রামের উপরে অ্যালবুমিন যায় এবং সঙ্গে সঙ্গে রক্তে ইউরিয়া ও ক্রিয়েটিনিন স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি থাকে তখন কিডনি অকেজো হওয়ার প্রাথমিক পর্যায় ধরা হয়। ২৪ ঘণ্টার প্র¯্রাবে যদি অ্যালবুমিন ৩ গ্রামের উপরে যায় তাহলে রোগীর শরীরে পানি জমতে শুরু করে। প্রতিটি রোগীর রক্তের কোলেস্টোরল এবং লাইপোপ্রোটিন একই সঙ্গে দেখে নেয়া উচিত। সঙ্গে সঙ্গে রক্তের প্রোটিনের পরিমাণ ও অ্যালবুমিনের পরিমাণও দেখে নেয়া প্রয়োজন। কোন অজ্ঞাত কারণে হেপাটাইটিস ‘বি’ ভাইরাস শরীরে জেঁকে বসে আছে কিনা তা জেনে নিতে হবে। কিডনির আলট্রাসনোগ্রাম করে তার শারীরিক অবস্থা, প্র¯্রাবের রাস্তা ও থলির অবস্থা জেনে নেয়া উচিত। প্রয়োজন বোধে কিডনির বায়োপসি পর্যন্ত করা যেতে পারে।
চিকিৎসা
(১) প্রাথমিক পর্যায়ে ডায়াবেটিক রোগীর নেফ্রোপ্যাথি ধরার সঙ্গে সঙ্গে উচ্চ রক্তচাপ হওয়ার লক্ষণও দেখা যায়। এই সমস্ত ক্ষেত্রে রোগীর ডায়াবেটিসকে পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখার চেষ্টা করা হয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ট্যাবলেটের পরিবর্তে ইনসুলিন দ্বারা ডায়াবেটিসকে নিয়ন্ত্রণের ভিতরে আনা হয়। এর সঙ্গে সঙ্গে খাবারের তালিকা সঠিক আছে কিনা তা পুংখানুপুংখভাবে দেখা হয়। প্র¯্রাবে যদি অ্যালবুমিন নির্গত হয় তাহলে এ সি ই ইনহিবিটর জাতীয় ওষুধ দেয়া হয়ে থাকে। এ সি ই ইনহিবিটর কিডনির ছাকনির উপর কাজ করে অ্যালবুমিন নির্গত হওয়ার পরিমাণকে কমিয়ে দেয়। রোগীর যদি এ পর্যায়ে উচ্চ রক্তচাপ থাকে তাহলে এই সঙ্গে তা অবশ্যই নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখার ব্যবস্থা করা হয় এবং তা এ সি ই ইনহিবিটর দ্বারা করাই শ্রেয়। এ সি ই ইনহিবিটর দ্বারা যদি উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের মধ্যে না থাকে তাহলে এ সি ই ইনহিবিটরের সঙ্গে ক্যালসিয়াম চ্যানেল ব্লকার জাতীয় ওষুধ দেয়া হয়ে থাকে। মনে রাখবেন ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ, উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ এবং প্র¯্রাবে আমিষ নির্গত হওয়ার পরিমাণ কমানোর ব্যবস্থা করলে নেফ্রোপ্যাথি হওয়া সত্ত্বেও কিডনি অকেজো হওয়ার প্রবণতা অনেক কমে যায়।আর যদি নেফ্রোপ্যাথি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে উচ্চ রক্তচাপ এবং কিডনি ফেইলিওরের লক্ষণসমূহ বিদ্যমান থাকে তাহলে এদের চিকিৎসা জটিলরূপ ধারণ করে। এই সমস্ত ক্ষেত্রে আমিষ নির্গত হওয়া কামানোর জন্য এ সি ই ইনহিবিটর জাতীয় ওষুধ দেয়ার পূর্বে সাবধানতা অবলম্বন করতে হয়। কিডনি ফেইলিওর বেশি পরিমাণে থাকলে এ সি ই ইনহিবিটর ওষুধ ব্যবহার ঝুঁকিপূর্ণ। এই সব পর্যায়ে রোগীর খাবারে আমিষের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখা হয় অর্থাৎ খাবারে আমিষের পরিমাণ শরীরের ওজনের উপর ভিত্তি করে (০.৫-০.৭৫ গ্রাম প্রতি কেজি শরীরের ওজন হিসাবে) নির্ধারণ করা হয়। ফলে শর্করা জাতীয় খাবার বেশি ধরা হয়। চর্বি জাতীয় খাবার নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখা হয়। অনেক রোগীর ডায়াবেটিক নেফ্রোপ্যাথি হওয়ার পর পা ও পেটে পানি আসে। এই সমস্ত ক্ষেত্রে পানি নিয়ন্ত্রণ করতে হয় যা ২৪ ঘণ্টায় ১ লিটারের ঊর্ধ্বে খাওয়া উচিত নয়। পানি শরীর থেকে বের করে দেয়ার জন্য লুপ ডাইয়ুরেটিকস জাতীয় ওষুধ দেয়া হয়ে থাকে। কিডনির কার্যকারিতা যত বেশি লোপ পায় লুপ ডাইয়ুরেটিকসের মাত্রা সেই অনুপাতে বাড়িয়ে দেয়া হয়। মাত্রা বেড়ে গেলেও ট্যাবলেট এক সঙ্গে সকাল বেলা দেয়াই ভালো। সাধারণত ৪০ মিলিগ্রাম থেকে শুরু করে ক্ষেত্র বিশেষে ৫০০ মিলিগ্রাম এবং অনেক ক্ষেত্রে স্পেশালিস্ট চিকিৎসকের অনুমোদনক্রমে ১০০০ মিলিগ্রাম পর্যন্ত দেয়া যেতে পারে। অনেকেরই ধারণা লুপ ডাইয়ুরেটিকস জাতীয় ওষুধ দেয়ার সঙ্গে সঙ্গে পটাসিয়াম জাতীয় ওষুধ দেয়া হয় অথবা পটাসিয়াম ধরে রাখতে পারে এই জাতীয় ডাইয়ুরেটিক দেয়া উচিত। আমাদের মনে রাখা উচিত কিডনির কার্যকারিতা লোপ পেলে পটাসিয়াম নিঃসরনের পরিবর্তে তা জমা হতে থাকে আর সে জন্যই এই সব ক্ষেত্রে পটাশিয়াম যুক্ত খাবার বা পটাসিয়াম ধরে রাখতে পারে এই ধরনের ওষুধ দেয়া উচিত নয়। আর পটাসিয়াম সিরাপ জাতীয় ওষুধ কোন অবস্থাতেই দেয়া ঠিক নয় কেননা এ ধরনের ওষুধে পটাসিয়ামের মাত্রা এতই কম থাকে যা অকার্যকর, উপরন্তু এ ধরনের ওষুধে শরীরের পাকস্থলী ও ক্ষুদ্রান্ত্রকে ক্ষতি করতে সাহায্য করে।রোগীর যদি উচ্চ রক্তচাপ থাকে তা অবশ্যই পূর্বের মতোই নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখতে হবে। কিডনির অকার্যকারিতা দেখা গেলে বিটা-ব্লকার জাতীয় ওষুধের ব্যবহার রোগীর জন্য ক্ষতিকারক হতে পারে। এই সমস্ত ক্ষেত্রে ক্যালসিয়াম চ্যানেল ব্লকার জাতীয় ওষুধ এবং প্রাজেসিন জাতীয় ওষুধ নিরাপদ।
কিডনি ক্রমান্বয়ে নষ্ট হতে হতে শেষ পর্যায়ে এসে গেলে ডায়ালাইসিস এবং কিডনি সংযোজনের চিন্তাভাবনা করা প্রয়োজন।
ডায়াবেটিক নেফ্রোপ্যাথি ছাড়াও ডায়াবেটিক রোগী প্র¯্রাবে জীবাণুজনিত ইনফেকশন এবং ¯œায়ুতন্ত্রের বৈকল্য রোগে ভুগতে থাকে। এদের প্র¯্রাব ধারণের ক্ষমতা অনেক সময় লোপ পায় অনেকের নেফ্রাইটিস জাতীয় রোগও একই সঙ্গে থাকতে পারে। এই সমস্ত রোগীর সঠিক রোগ নির্ণয় করে সঠিক চিকিৎসার ব্যবস্থা করা উচিত।