সুদূর মরুভূমির বুকচিরে বয়ে চলা এক সুরের ধারা। সেই সুর যেন শুধু সুর নয়, তা যেন এক জীবন্ত গল্প, যা কানে কানে বলে চলে আরব আমিরাতের বেদুইনদের জীবনের কথা। এই গল্পটা হলো আল-তাগরুদা নামের এক প্রাণবন্ত কাব্যিক ঐতিহ্যের। এটা নিছক কোনো কবিতা নয়, এ যেন মরুভূমির বুকে জন্ম নেওয়া এক জলপ্রবাহ, যা তার চারপাশের ইতিহাস, জ্ঞান আর মানুষের ভালোবাসাকে বুকে ধারণ করে চলেছে।এর গুরুত্ব এতটাই বেশি যে ২০১২ সালে ইউনেসকো এটাকে মানবজাতির এক অমূল্য সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।
আল তাগরুদার জন্ম হয়েছিল মরুভূমি, পাহাড় আর গ্রামগুলোতে। এর জন্মদাতা ছিলেন মরুভূমির দীর্ঘ পথ ধরে হেঁটে চলা উটচালক আর পশুপালকরা। দীর্ঘ যাত্রার একঘেয়েমি কাটাতে, একে অন্যের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে, আর নিজেদের মনকে সতেজ করতে তারা এই কবিতা আবৃত্তি করত।
আল তাগরুদার আবৃত্তির সময় আরবি স্বরবর্ণগুলো একটু টেনে টেনে আর জোরালোভাবে বলা হয়। এর ফলে কবিতাটার একটা নিজস্ব সুর তৈরি হয়, যা শোনার মতো মন মুগ্ধ করে। আর এই কবিতাগুলো আরবি কাব্য পদ্ধতির এক বিশেষ ছন্দ অনুসরণ করে, যার নাম ‘সারি’ বা ‘রাজাজ’।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আল তাগরুদার রূপেও কিছুটা পরিবর্তন এসেছে। আগে যেখানে শুধু মুখে মুখে আবৃত্তি করা হতো, সেখানে এখন এটাকে লেখা হয়, এমনকি রেকর্ডও করা হয়। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে এর সরাসরি পরিবেশনাও দেখা যায়। এসব পরিবর্তনের কারণেই আল তাগরুদা আজও আধুনিক সমাজে নিজের প্রাসঙ্গিকতা ধরে রেখেছে।
আজকের দিনে আল তাগরুদার পরিবেশনা আরব আমিরাতের মানুষকে তাদের ইতিহাস, সংস্কৃতি আর ঐতিহ্য সম্পর্কে জানতে সাহায্য করে। এখন এটা দেখা যায় ক্যাম্পফায়ারের চারপাশে, বিয়েবাড়িতে, উটের দৌড় প্রতিযোগিতায় আর বিভিন্ন জাতীয় উৎসবে। শুধু পুরুষরা নয়, নারীরাও আল-সাদুর মতো সম্মিলিত কাজ করার সময় আল তাগরুদা রচনা করে আর আবৃত্তি করে।
আল-ওয়াজানের ওবায়েদ ইবনে-মা’আদেদ আল নুআইমি, আল-আইনের আহমদ ইবনে-সালেম বাল আবদা আল-শামসি এবং মোহাম্মদ ইবনে-হামেদ আল-মানহালির মতো অনেক বিখ্যাত আল তাগরুদা কবি আছেন। তবে এই ঐতিহ্যটা শুধু কবিদের হাতে আটকে নেই, অনেকেই নিজেদের মধ্যে এই কবিতা আবৃত্তি করেন। এটা কোনো ব্যক্তিগত প্রতিভা হলেও অনেক পরিবারে এর চর্চা বংশপরম্পরায় চলে আসছে।
আল তাগরুদা নিছক কোনো কবিতা নয়, এ হলো আরব আমিরাতের সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। বেদুইনদের জীবনের জ্ঞান, ইতিহাস আর সামাজিক বন্ধন এর মধ্যে মিশে আছে। সামাজিক আর অর্থনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এটা তার রূপ বদলেছে ঠিকই, কিন্তু এর মূল সৌন্দর্য আজও অমলিন। ইউনেসকোর স্বীকৃতি এটাকে আরো বেশি মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়েছে, যা এর ভবিষ্যেক উজ্জ্বল করেছে। আল তাগরুদা সমাজের মানুষকে এক সুতোয় গেঁথে রাখে এবং ঐতিহ্যের সঙ্গে আধুনিকতার এক সুন্দর সেতু হিসেবে কাজ করে। এই দারুণ শিল্পকে ভালোবাসা আর সম্মান জানানো আমাদের সবার দায়িত্ব।