সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬, ০২:২২ অপরাহ্ন
নোটিশঃ
জনপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল প্রমিনিউজবিডি ডটকম এর পরিক্ষামূলক সম্প্রচার চলছে। সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। তার মানে এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা লেখার অংশবিশেষ কিংবা ছবি বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রচার বা প্রকাশ করা নিষিদ্ধ।

খাঁচার পাখি

ঢাকা অফিস
  • আপডেট: শনিবার, ২৩ আগস্ট, ২০২৫
  • ৭ বার পড়া হয়েছে

শামীমা একটি সরল গ্রামীণ কিশোরী। তার শরীর যেন প্রকৃতির নিজ হাতে আঁকা এক নিসর্গশিল্প পল্লীর চাঁদনি রাতে ফুটে ওঠা এক স্বপ্নমূর্তি। সদ্য প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করে সে স্থানীয় উচ্চবিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছে। বছর ঘুরতেই তার রূপে মুগ্ধ হয়ে উঠলো গ্রাম-শহরের অনেক তরুণ। কেউ সরাসরি, কেউবা পারিবারিকভাবে বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে এল।

রাস্তাঘাটে কিছু উচ্ছৃঙ্খল ছেলের উৎপাত দিনদিন বাড়তে থাকে। আর এসব সামাল দিতে গিয়ে শামীমার বাবা-মা পড়েন অস্বস্তিতে। বাবা আব্দুল গফুর মনে মনে স্থির করলেন তাড়াতাড়ি বিয়ে দিলেই যেন দায়মুক্ত হওয়া যায়। তাঁর বিশ্বাস, মেয়ের জীবনে গতি আসবে, সমাজও মুখ বন্ধ রাখবে।এমন সময় শহরের এক সম্ভ্রান্ত ব্যবসায়ী পরিবারের ছেলে, ফারদিন শামীমাকে বিয়ের প্রস্তাব দেয়। ত্রিশোর্ধ্ব ফারদিন বাবার ব্যবসার দেখভাল করে, যদিও নিজে কিছু করে না। তার বয়স শামীমার চেয়ে অন্তত বিশ বছর বেশি।কিন্তু গফুর মিয়ার চোখে বয়স নয়, টাকার জোরই মুখ্য। তাঁর বিশ্বাস, অর্থবান বর মানেই মেয়ের নিশ্চিত সুখ। তাই তিনি ফারদিনের সাথেই মেয়ের বিবাহের বন্দোবস্ত করেন।শামীমা এক সন্ধ্যায় বাবা-মায়ের মায়ের সামনে কাঁদতে কাঁদতে বলে, “আমি এখনই বিয়ে করতে চাই না। আমি পড়তে চাই, আমি কলেজে যেতে চাই, নিজের পায়ে দাঁড়াতে চাই। তারপর না হয় বিয়ে।”

বাবা তার কাঁধে হাত রেখে বলেন, “মা, আমরা তো তোমার মঙ্গল চাই। আমাদের পক্ষে এতদিন অপেক্ষা করা সম্ভব নয়। এটাই তোমার ভালোর জন্য।”বাধ্য মেয়ে শামীমা নিশ্চুপে মাথা হেঁট করে সবকিছু মেনে নেয়।শুধু শামীমার মা একটু আপত্তির স্বর তুললেন। একটু দুশ্চিন্তায় কপালে ভাঁজ ফেলে বললেন, “মেয়েটা তো এখনও কেবলই স্কুলে উঠেছে। বয়স কতই বা হলো? আর ছেলেটা… দেখতে ভালো, গড়ন-সড়নও মন্দ নয়, তবুও বয়সে অনেকটা বড়। এই বয়সের ফারাকটা কি ওদের মনে-মনে মিল হতে দেবে? মানসিক পরিপক্বতা কি এক হবে? সংসার তো শুধু শরীরের ব্যাপার নয়, মনের ব্যাপারও বটে।

কিন্তু আব্দুল গফুর ছিলেন রাগী ও একগুঁয়ে। স্ত্রীর কথায় কান দেয়নি।সব আয়োজন শেষে একদিন শামীমার বিয়ে হয় ফারদিনের সঙ্গে। সমাজ বলে ভালো ঘরে, ভালো বর পেয়েছে সে।প্রথম কিছুদিন সবাই মনে করল, সব ঠিকঠাকই চলছে। কিন্তু খুব তাড়াতাড়ি বেরিয়ে এল গৃহপালিত সত্য।

শামীমা একটি খাঁচায় বন্দি পাখি হয়ে পড়ে। শাশুড়ির সেবায় দিন কাটে, বাইরে যাওয়া তো দূরের কথা, নিজের বাবার বাড়িতেও যেতে পারে না ইচ্ছেমতো।ফারদিন মনে করত, স্ত্রীর উপর কর্তৃত্বই বুঝি স্বামীত্বের আসল পরিচয়। সংসারে পুরুষের চাওয়া-পাওয়া পূরণ হলেই সে নিজেকে সার্থক ভাবে। কিন্তু স্ত্রীর কি কোনো চাহিদা নেই? কোনো অনুভব নেই? এই প্রশ্নের প্রতি সে ছিল উদাসীন।শামীমা তাই প্রতিটি রাতেই অনুভব করত এক নিরব নিপীড়নের করাল ছায়া। দিনভর শাশুড়ির কাজে ব্যস্ত থেকেও মনটা ক্লান্ত হতো না, কিন্তু রাত যতই গাঢ় হতো, তার হৃদয়ে ভয় জমতে থাকত।

ফারদিনের ছায়াও তাকে আতঙ্কিত করত সে যেন মানুষ নয়, এক বাঘ; আর শামীমা একটি খাঁচাবন্দি পাখি, যে চিৎকার করেও নিজের কানেই নিজের আওয়াজ শুনতে পায় না। সে ভেসে থাকে এক বন্ধনহীন স্রোতে, যাকে বাইরে থেকে সবাই শান্তির জলধারা ভাবে, অথচ তা আসলে তারই বুকের জমে থাকা দগ্ধ অশ্রুর স্রোত।

শামীমার মনে হতো, তার এই ব্যথা, এই গুমরে গুমরে কান্না কি কখনো কেউ বুঝবে? সে তো শুধু
চেয়েছিল ভালোবাসার আলো মেখে আসা একটি স্বাভাবিক জীবন। কিন্তু তার ভাগ্যে জুটেছিল এক নীরব আত্মবিসর্জনের দীর্ঘ শ্বাস।একদিন সাহস করে ফারদিনকে বলে, “তুমি কি জানো আমি কেমন আছি? তুমি কখনও জেনেছো আমার কোনো ভালো লাগা কিংবা না-পছন্দ?”

ফারদিন তাচ্ছিল্যে হাসে। উত্তর দেয় না।কয়েকদিন পর এক রাতে, সহ্যের সীমা পেরিয়ে শামীমা এক কাপড়ে বাবার বাড়ি ফিরে আসে।মেয়েকে দেখে মা হাউমাউ করে কেঁদে ফেলেন। বিধ্বস্ত চেহারা, চলতে কষ্ট, সে যেন কোনো শরীর নয় এক ক্লান্ত আত্মার খালি খোলস মাত্র।মা’কে জড়িয়ে ধরে শামীমা বলে, “মা, আমি বাঁচতে চাই। আমি আর ও সংসারে ফিরতে পারব না।
তোমরা কি আমাকে একটু আশ্রয় দিতে পারো না? একটু ভালোবাসা?”মা আঁকড়ে ধরেন তাকে। কিন্তু বাবা গফুর মেয়েকে দেখে রেগে আগুন। বলেন, “কালই ফিরিয়ে দেবো তোকে। সংসার এমনই হয়। দুদিন পর সব ঠিক হয়ে যাবে। এখানে তোকে আমি রাখবো না।”

সেই রাতে শামীমা একটি চিরকুট লেখে “আমার মৃত্যুর জন্য কেউ দায়ী নয়। আমি শুধু স্বাধীনভাবে বাঁচতে চেয়েছিলাম। খাঁচা ভেঙে পালিয়ে এসেছিলাম, কিন্তু এখানেও ঠাঁই পেলাম না। ভালোবাসা মানে কি শুধু স্বামীকে তুষ্ট রাখা? বাবার কাছে কি আমি শুধু এক বোঝা ছিলাম? আমি এই জীবন থেকে মুক্তি চাই।”চিরকুটের পাশে একটি চেয়ার। তার ওপর উঠে ওড়না গলায় পেঁচিয়ে সিলিং ফ্যানে ঝুলে পড়ে শামীমা।পরদিন সকালে তাঁর নিথর দেহ দেখে মা মূর্ছা যান, আর বাবা ফুঁপিয়ে কাঁদেন “আমি তো চেয়েছিলাম সুখে থাকুক মেয়ে… আমি কি তবে ভুল করেছি?”হ্যাঁ, আব্দুল গফুর ভুল করেছিলেন। এক কিশোরীর মন মানে কচি মুকুল। তাকে সময়ের আগেই ছিঁড়ে নেওয়া মানেই মৃত্যুর পরোয়ানা।সমাজের চোখের ভয় আর টাকার মোহে সে তার মেয়ের ডানা কেটে দিয়েছিল। অথচ মেয়েরা পাখি নয় তারা মানুষ, অনুভূতির রক্ত-মাংসের শরীর। তিনি সময়ের আগেই মেয়েকে বন্দি করেছিলেন এক পাথুরে সংসারে।

শামীমার বিদায় শুধু একটি জীবন হারানো নয়, বরং আমাদের কাছে রেখে যাওয়া এক অনুচ্চারিত প্রশ্ন আজও কি মেয়েরা নিজের জীবন বেছে নেওয়ার অধিকার পায় না?”

ভালো লাগলে সংবাদটি শেয়ার করুন

এই বিভাগের আরো সংবাদ
© All rights reserved © 2026 PromiNewsBD.com
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com