আমার শোবার ঘরের পাশ ঘেঁষে অনেক দীর্ঘ গাছ। গাছের শাখা-প্রশাখায়, পাতার ফাঁকে ফাঁকে পাখিরা আলাপ করছে। ভাবি, ওরা কি এত কথা বলছে গাছের সঙ্গে? ওরা কি আমাকে নিয়ে কথা বলছে কিছু, ঠিক আমার পরিবার, আত্মীয়, বন্ধুবান্ধবের মতো? ভোরের প্রথম আলো ফুটতেই ক্লান্ত লাগছে। অথচ এক সপ্তাহ আগেও আমি একজন সুখী মানুষ ছিলাম। ঘুম ভেঙে গাছের তলায় মাদুর বিছিয়ে ইয়োগা করতাম, প্রাণভরে শ্বাস নিতাম, বই পড়তাম, চুপচাপ বসে থাকতাম, চা পান করতে করতে পাখি, গাছেদের সঙ্গে অনর্গল কথা বলতাম। হাঁটতে গিয়ে হাসনাহেনা, বেলি, রঙ্গন, জবা, গাঁদা, ভাটফুল ওদের সঙ্গে দেখা হতো। ওরা আমাকে ঘিরে থাকত কিংবা আমি ওদের ঘিরে থাকতাম। ওদের ফুরফুরে হাওয়ায় কী এক গোপন আপন আনন্দে হাড়পাঁজরে অলখ রং লাগত। গলা বেয়ে অপার মুগ্ধতায় রবীন্দ্রনাথ আসতেন। স্কুলে বাচ্চাদের পড়াই আমি। এর বাইরে গর্বিত হওয়ার মতো তেমন কিছুই করিনি জীবনে। তবুও এই দেশে জন্মেছি, এই সোনাঝরা দেশ আমার, এই হাওয়া-বাতাস আমার—ভেবে গর্বে বুক ভরে যেত।
আত্মা মরে গেলে বুঝি সব কিছু ফ্যাকাসে হয়ে ওঠে। ওরা এখনো ঘিরে আছে, শুধু আমি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছি। এখন গাছগুলোর দিকে তাকিয়ে মনে হচ্ছে, কত লাশ খাড়া হয়ে আছে, পাখিদের কিচির-মিচির মনে হয় শকুন ডাকছে, ফুলেদের মৃত পরাগরেণু, একটাও ভ্রমর করে না গুনগুন, একটাও প্রজাপতি নেই কোথাও।
মাথার শিরা যেন ছিঁড়ে যাচ্ছে। বসা থেকে বিছানায় এলিয়ে পড়ি। প্রাণের ভেতর শীত অনুভব করি, শরীর থরথর কাঁপছে। কপালে হাত ছুঁয়ে টের পাই, জ্বর এসেছে। রাত-দিন মৃত্যু প্রত্যাশিত আমার মধ্যে জীবনের জন্য মায়া জাগে। বেঁচে থাকার বড় লোভ হয়। মৃত্যুর হাত থেকে পালানোর চেষ্টায় বিছানা থেকে হুমড়ি খেয়ে পড়ি। বাথরুমে গিয়ে চোখেমুখে অনবরত পানি ছিটাই; মাথায়, কপালে ভেজা গামছা বেঁধে ওষুধ খাই। কিছুটা সময় পর আমার শরীর হাঁপ ছেড়ে একটু ভালো বোধ করলে এরপর আবার সেই ভয়াল দানবগুলো মূর্ত হয়ে ওঠে, গ্রাস করে আমার স্মৃতিতে। পুনরায় মৃত্যু ভাবনা আমাকে আঁকড়ে ধরে।
আমার স্কুলের বাচ্চাদের কথা মনে পড়ে। ওদের অলৌকিক মুখোচ্ছবি, নিষ্পাপ হাসি, মধুর স্বরে ‘আপা’ ডাক শোনার জন্য তৃষ্ণা অনুভব করি। আমার বর্ণ-গন্ধ হারানো সেদিনের পর নিষ্পাপ শিশুগুলোর সামনে যাওয়ার মনোবল হারিয়ে ফেলেছি। পোশাক পরিহিত আমি ভয়ে আয়নার সামনে দাঁড়াই না, পরিবারের সামনে যাই না, কিভাবে ওদের সামনে গিয়ে দাঁড়াব! সেদিনের সেই চলন্ত বাসে কজন ধর্ষকের ছুরির মতো আমাকে বিদ্ধ করা, আমার জীবনের বাস্তবতা পাল্টে দেওয়া, আমাকে ক্ষতবিক্ষত করা সেই উলঙ্গ সময় হতে কোনোভাবেই মুহূর্তের জন্যও বের হতে পারছি না। এক সপ্তাহ আগে ফেলে আসা জীবনের কত লাল-নীল গল্প আপন মনে আওড়াই, ভেতরের জরাজীর্ণ প্রাণ ভোমরাটাকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য, কিন্তু অদ্ভুতভাবে শরীর নামের একটা খোলস নিয়ে আমি আমার সেই পতনের সময়েই আটকে থাকি।
বাঁচার যতই লোভ হোক; জানি, জীবনের রুঢ় বাস্তবতার কঠিন নিষ্পেষণ ছাড়া কিছুই আর অবশিষ্ট নেই সামনে। ভয়ে ছটফট করতে করতে চার দেয়ালের মধ্যে কম্বলের তলায় আশ্রয় নিই। পুরো পৃথিবী অর্থহীন লাগে। বিছানায় সেঁটে থাকা আমি জীবিত, নাকি মৃত—বুঝি না। খানিকটা তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়ি। দেখি, খাটের ওপর চটে মোড়ানো একটা মৃতদেহ রাখা। মৃত ব্যক্তিটি আমি। খুঁটে খুঁটে শেষবারের মতো আমি আমাকে দেখছি, অনুভব করছি। কোথাও কোনো ভয় নেই।
তন্দ্রা কেটে গেলে কম্বল ছুড়ে ধড়ফড় উঠে বসি। কী রকম চক্কর খাচ্ছে মাথা। চারপাশ ঘোরগ্রস্ত লাগছে। আমার ঘরে কেউ নেই কেন, ভেবে কষ্ট পাই। পরমুহূর্তেই মনে পড়ে, আমিই তো কাউকে ঘরে আসতে দিই না। কম্পিত দেহটা নিজের দুই হাতে জড়িয়ে ধরে নিজেকে নিজে প্রশ্ন করি, আমি কী ধীরে ধীরে ভারসাম্যহীন হয়ে পড়ছি?
একটু স্থির হতেই সেদিনের সেই ভয়াল সময়টা এগিয়ে আসে, ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে মস্তিষ্কের অলি-গলিতে। মৃত্যু আঙুল তাক করে আমার দিকে। বেঁচে থাকার তরে প্রাণে আর এক ফোঁটাও উত্তাপ অবশিষ্ট নেই। আমার জীবনের সব আলো ওই ধর্ষকের দল নিভিয়ে দিয়েছে।
বিছানা ছেড়ে উঠে বসি। প্রায় উন্মাদ অবস্থায় আয়নার সামনে গিয়ে বসি, নিজের দিকে তাকিয়ে থাকি। ঘাড়, স্তন, পেট, উরু, গলার দগদগে ঘা কাপড়ের আড়ালে লুকিয়ে রাখলেও ঠোঁটের জমাটবাঁধা রক্ত আমাকে শুধু মৃত্যুর কথা বলে। এই আমাকে আমি কোথায় লুকাই? কিভাবে বাঁচাই? উত্তর পাই না।
ঘরের মেঝেতে সকালের নরম রোদ এসে আল্পনা আঁকছে। আয়না থেকে চোখ সরিয়ে সেদিকে মনোযোগ দিতে দেখি, মৃত্যু দাঁত বের করে হাসছে। একদিকে জীবনের হাতছানি, অন্যদিকে মৃত্যু, মাঝখানে আমি দাঁড়িয়ে আছি। জীবন এবং মৃত্যুর মর্মান্তিক এই যুদ্ধটা ক্রমেই আমাকে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে একটু একটু করে শেষ করে দিচ্ছে।
মনে পড়ে, কিশোরী বয়সে চড়ুইভাতি খেলার সময় পুকুর ধারের পাশে সাপের খোলস চোখে পড়লে ভয়ে চোখ বুঁজে কাঁদতে থাকি। কান্নার শব্দ শুনে আমাদের পরিবারের সাহায্যকারী সামিয়া দৌড়ে এসে মাটি থেকে ঝুরঝুরে খোলসটি ওর চোখের সামনে ধরে বলে, ‘আহারে, সাপের মতো যদি আমিও খোলস ছেড়ে আপনার ত্বকের মতো ঝকঝকে হয়ে উঠতে পারতাম।’ তখন প্রকৃতিতে বসন্তকাল। সামিয়ার কথা শুনে আমি কিছু না বুঝে হাসলেও ওর চোখের কোণে জল, আর মুখে ভারী আঁধার জমাটবাঁধতে দেখেছি।
আজ ভীষণ সামিয়ার মুখটা মনে পড়ছে। আসলে মুখ নয়, ওর রক্তাক্ত বুকটা চোখের সামনে ভাসছে। এতিম সামিয়ার গায়ের রং ছিল পোড়ামাটির মতো। আমাদের গ্রামে তখন সবে বিদ্যুৎ এসেছে। ঘরের কাজ সেরে সাঁঝবেলায় পাশের বাড়িতে সামিয়া টেলিভিশন দেখতে যায়। টেলিভিশন দেখা শেষে ঘরে ফেরার সময় ওকে পেছন দিক থেকে হিংস্র জানোয়ারের দল ঘিরে ধরে। অন্ধকার আরো গাঢ় হয়ে আসে। সামিয়া ঘরে আসেনি বলে মা কুপি হাতে মুখস্থ পথ ধরে পাশের বাড়ির দিকে হাঁটছেন। পথের পাশে বাঁশঝাড়ে গোঙানির শব্দ শুনে সেদিকে তাকিয়ে কিছুক্ষণ মা নিশ্চল বৃক্ষের মতো দাঁড়িয়ে থাকেন। মা সামিয়াকে বুকের সঙ্গে জড়িয়ে ধরলে ওর স্তনের রক্তে মায়ের বুক ভেসে যায়। মায়ের কানের কাছে ‘জব্বার মেম্বার ও তার চেলাচামুণ্ডারা’ বলে সামিয়া পুরোপুরি জ্ঞান হারায়।
পয়সাওয়ালা লোক জব্বার মেম্বার গ্রামবাসীর পঞ্চায়েতে সবাইকে বশ করে উল্টো সামিয়ার চরিত্র খারাপ বলে কুৎসা রটিয়ে দেয়। সামিয়া ঘর থেকে বের হলেই পাড়া-প্রতিবেশীসহ গ্রামের সবাই মুখ ফিরিয়ে নেয়, বাজে কথা বলে। ধর্ষক জব্বার মেম্বার গ্রামের জনারণ্যে মুক্ত পাখির মতো মিশে গেলেও একদিন কাউকে কিছু না বলে সামিয়া হারিয়ে যায়।
সামিয়ার কথা ভেবে যেন শ্বাস রোধ হয়ে আসছে। ওর খোলস পাল্টানোর ইচ্ছা আমাকে আজ ভীষণভাবে আক্রান্ত করেছে। হাতের কাছে একটা ব্লেড পেলে ওই নর্দমার কীটগুলোর ঢালা বিষ, ক্লেদযুক্ত শরীরের চামড়া সাপের মতো খুলে ফেলতাম। আমার নির্দাগ শরীরের দিকে তাকিয়ে তখন কেউ বলবে না, আমি ধর্ষিতা।
ভয়ানক অস্থিরতা নিয়ে এক ঝটকায় বাদামি রঙের চাদরটা হাতে তুলে নিই। জীবনের ভার আমি আর বইতে পারছি না। ফ্যানের সঙ্গে চাদরটা বেঁধে বিপন্ন আমি দেয়ালে মাথা ঠুকতে থাকি।
লামিয়া, লামিয়া! মা ডাকছেন। আমার পা আটকে যায়। মায়ের নিঃশ্বাস, স্নেহ, ঘ্রাণ আমাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে।
পাহাড়ের মতো ভারী শরীর, মন টানতে টানতে কক্ষের দরজা খুলে দেখি, মায়ের পেছনে আমার স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা এবং বাচ্চারা দাঁড়িয়ে আছে। চোখের পলকে বাচ্চারা এসে আমাকে ‘আপা, আপা’ বলে জড়িয়ে ধরে। একেকটা বাচ্চা যেন একেকটা দেশলাই। ওদের আলো, হাসি, প্রাণের উচ্ছ্বাসে আমার ভেতরের শক্তিশালী আত্মঘাতক মুষড়ে পড়ে, হালকা বোধ করি। ওদের কলকাকলীতে আমার মৃত্যু বেলুন হয়ে উড়তে থাকে, উড়তে উড়তে আমার চিন্তা রেখার বাইরে চলে যায়। বাচ্চাদের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আমি আকাশ দেখছি, প্রকৃতি দেখছি, সুন্দর কিছু ভাবতে পারছি।
প্রধান শিক্ষিকা আমাকে পাশে বসিয়ে মাথায় হাত রেখে বলেন, ‘তুমি একা না, আমরা সবাই আছি তোমার সঙ্গে। আমাদের দেশের সব মানুষের মগজ পচে যায়নি। দোষীরা নিশ্চয়ই ধরা পড়বে, শাস্তি পাবে। এই অন্ধকার চিরদিন থাকবে না। ধীরে ধীরে সব বদলে যাবে। বাচ্চাদের উষ্ণতা অনুভব করো, সূর্যের আলো গায়ে মাখো, প্রাণ খুলে শ্বাস নাও। তুমি মানুষ গড়ার কারিগর। যত দ্রুত সম্ভব স্কুলে যোগ দাও। আমরা তোমার অপেক্ষায় আছি।’
প্রধান শিক্ষিকার সঙ্গে সারি সারি বিস্মিত চোখের বাচ্চাগুলো যখন মেরুদণ্ড সোজা করে, মাথা তুলে সুস্থির হেঁটে যায় আমার সামনে দিয়ে, তখন এক আশ্চর্য শান্তিদায়ী হাওয়া বয়ে যায় আমার আপাদমস্তকে। আমার মগজের নিউরনগুলো পাখির মতো আদিগন্ত মাঠে উড়ছে, খেলছে, গেয়ে চলেছে। আমার চোখে রংধনুর সাত রং জেগে ওঠে, বাচ্চারা সব কটি রং নিয়ে ছবি আঁকছে, সাঁকোর ছবি। আমি সেই সাঁকো ধরে মাথা তুলে ক্লাসরুমে ওদের সামনে গিয়ে দাঁড়াই। বাচ্চারা নৃত্যগানে মেতে উঠলে মনে হয় যেন থোকা থোকা কুর্চি ফুল ফুটেছে শ্রেণিকক্ষে। আনন্দ উপচে পড়ছে যত্রতত্র। ওরা আমার দিকে প্রজাপতির রং ছুড়ে দিলে একটা আলোর দুয়ার খুলে যায়। সেই দুয়ারের দাওয়ায় বসে তুমুল বাতাসে, বাচ্চাদের সঙ্গে আমার গল্প চলছে তো চলছেই, একদম ফুরাতেই চায় না। দূরে কোথাও তখন আলি আকবর খাঁর সরোদ বাজছে, আর শহর সেজেছে স্বতঃপ্রস্ফুটিত বাসন্তী রঙে।