সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬, ০৮:০২ অপরাহ্ন
নোটিশঃ
জনপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল প্রমিনিউজবিডি ডটকম এর পরিক্ষামূলক সম্প্রচার চলছে। সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। তার মানে এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা লেখার অংশবিশেষ কিংবা ছবি বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রচার বা প্রকাশ করা নিষিদ্ধ।

স্টকলটে ফ্যাশন

ঢাকা অফিস
  • আপডেট: মঙ্গলবার, ১৯ আগস্ট, ২০২৫
  • ৫ বার পড়া হয়েছে
নিউমার্কেটের দুপুরে রোদ যেন ছেঁকা দিয়ে যায়। দোকানের ভেতর থেকে ভেসে আসে ক্রেতা-বিক্রেতাদের আলাপ, বাইরে টেবিল বা চট পেতে বসা দোকানির হাঁক, ‘ভাইয়া, টু হান্ড্রেড লাস্ট! লাস্ট!’ কাপড়ের গন্ধ, ঘামের গন্ধ আর হাজারো ট্যাগের অচেনা ভাষা মিশে যায় বাতাসে। এগুলোই স্টকলটের দোকান। দেশি-বিদেশি ফ্যাশনের অন্য রকম এক জগত্, যেখানে নতুনের ঝলক মিশে আছে বাতিলের চতুরতা।

 

স্টকলটে ফ্যাশন
খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে তবেই কিনে নিন পছন্দের পোশাকটি

যেভাবে স্টকলট

গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিতে বিদেশি ব্র্যান্ডের জন্য তৈরি পোশাক সব সময় নিখুঁত হয় না। কোনো কোনো পোশাকের সেলাই একটু বেঁকে গেছে, হয়তো রঙের শেডে হালকা তফাত, আবার অনেক সময় পুরো অর্ডার শেষ হওয়ার পর বিদেশি ক্রেতা তা বাতিল করে দেন সময়মতো ডেলিভারি না পাওয়ায়। এসব পোশাক ফ্যাক্টরির গুদামে পড়ে থাকে। এগুলোই স্টকলট।

এমন পোশাকের ব্যবসার সঙ্গে ১০ বছর ধরে জড়িত উত্তরার রাকিব হাসান। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে স্টকলট পোশাকের বাজার বেশ বড়। কারখানার মালিক থেকে শুরু করে ফুটপাতের বিক্রেতা—অনেক মানুষ এই ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। বাতিল হওয়া শিপমেন্ট বা অর্ডারকৃত চালানে কোনো ত্রুটি থাকলে সেগুলো বিভিন্ন হাত ঘুরে বাজারে চলে আসে।
আবার চাহিদার কারণেও অনেক গার্মেন্টস মালিক অতিরিক্ত পোশাক বানিয়ে বাজারে ছেড়ে দেন। ব্র্যান্ড ভ্যালু যাতে নষ্ট না হয় এ জন্য অনেক সময় এসব পোশাকের ট্যাগ কেটে বা নষ্ট করে ফেলা হয় কারখানা থেকে।’ 

স্টকলটে ফ্যাশন
বিক্রেতাদের মন-ভোলানো কথায় ভুলবেন না। দরদাম করে দেখেশুনে কিনে হাসিমুখে ফিরুন ঘরে

কী কী পাওয়া যায়

এসব মার্কেটে কী পাওয়া যায় না সেটিই বরং বলা মুশকিল। গ্লাভস, গাউন, জ্যাকেট, এমনকি রেইনকোটও পাওয়া যায়।

বিদেশযাত্রার আগে গরম কাপড়ের খোঁজে অনেকেই এসব দোকানে ভিড় করেন। বৃষ্টিরোধী রেইনকোট বা ধুলা থেকে বাঁচার ডাস্টকোটের মতো পোশাকও এসব মার্কেটে পাওয়া যায়। এ ছাড়া সাঁতারের পোশাক, অফিসের ফর্মাল পোশাক, পার্টি পোশাক, নাইট ড্রেস এবং বিচ ওয়্যারও পাওয়া যায়। 

ফ্যাশনে এগুলোর জনপ্রিয়তার কারণ

নাগালের মধ্যে পাওয়া যায় বাহারি ডিজাইনের হাল ফ্যাশনের পোশাক। এসব পোশাক তৈরি হয় রপ্তানির উদ্দেশ্যে। তাই কাপড়ের মানও হয় ভালো। এ ছাড়া বিদেশি ক্রেতারা বিভিন্ন সাইজের পোশাক তৈরির জন্য অর্ডার করে থাকেন। অতিরিক্ত ছোট বা অতিরিক্ত বড় সাইজের পোশাক অনেক দেশীয় রেডিমেড পোশাকের ব্র্যান্ড তৈরি করে না। আবার এসব পোশাক স্বল্প মূল্যে কিনতে পাওয়া যায়। এ বিষয়ে মিরপুরের মেহেদী হাসান জানান, তিনি একসময় গার্মেন্টস কারখানায় কাটিং মাস্টার ছিলেন। কারখানায় ছাঁটাই হওয়া কাপড় দেখে বুঝেছিলেন এখানে ভালো ব্যবসার সুযোগ আছে। এখন মিরপুর ১১ নম্বর সেক্টরে মোহাম্মদীয়া সোসাইটি মার্কেটে ছোট্ট দোকান রয়েছে তাঁর। সেখানে দাঁড়িয়ে বিদেশি ট্যাগওয়ালা শার্ট বিক্রি করেন, যার দাম ইউরোপে ৩০ ইউরো, তিনি দিচ্ছেন ৪০০ টাকায়। মেহেদীর মতে, ‘ক্রেতা যদি বুঝে কিনতে পারেন, স্টকলট তাঁর জন্য সেরা ডিল।’

স্টকলটে ফ্যাশন
স্টকলট পোশাকে দস্তুর ফ্যাশন

বাজারের ভেতরের গোপন রহস্য

মৌসুমভেদে গার্মেন্টসের জামাকাপড়ের সরবরাহ বেড়ে যায়; যেমন—ঈদের আগে, শীত আসার আগে বা বড়দিনের সময় স্টকলটের সরবরাহ বাড়ে। কারণ বিদেশি ব্র্যান্ডের মৌসুমি অর্ডার শেষ হয়ে তখন অতিরিক্ত মজুদ হয়। অনেক পোশাকেই থাকে ফরাসি, জার্মান বা জাপানি ভাষার ট্যাগ, যা ক্রেতাকে বাড়তি কৌতূহল দেয়।

কারা কিনছে

ছোট থেকে বৃদ্ধ সব বয়সী মানুষের জন্যই এসব মার্কেটে পোশাক পাওয়া যায়। তবে কিশোর ও তরুণ বয়সীদের মধ্যে এসব পোশাকের জনপ্রিয়তা বেশি। পশ্চিমা ধাঁচের ফ্যাশনের কাপড়গুলো পরে যেমন আরাম, তেমনি সাশ্রয়ী। ফ্যাশনসচেতন অনেকেই এক পোশাক বেশিদিন পরেন না, দ্রুত বদলাতে পছন্দ করেন। তাঁদের কাছে এগুলো বেশ জনপ্রিয়।

সহজলভ্যতা ও নির্ভরযোগ্যতা

উত্তরার রাজলক্ষ্মী মার্কেটের দোকানি ইসহাক মিয়া বলেন, ‘এসব দোকানে চাইলেই যেকোনো ডিজাইন বা কাপড়ের জামা পাওয়া যায় না। যখন যেমন আসে, তখন সেখান থেকেই পছন্দের জিনিসটি বেছে নিতে হয়। আজ নিলেন না, ভাবলেন কাল এসে নেবেন। কাল এসে ওই জামাটি আর না-ও পেতে পারেন।’

এটুজেডের এবারের প্রচ্ছদ মডেল সামিয়া ইসলাম জানান, তিনিও সময়-সুযোগ পেলে এসব মার্কেট ঘুরে ঘুরে পছন্দের পোশাক কেনেন। যেহেতু পুরো বাজারটি বিদেশি অর্ডারের লটের ওপর নির্ভরশীল, তাই সব সময় পছন্দের ডিজাইন ও রঙের কাপড় পাওয়া যাবে এমন গ্যারান্টি নেই। সাইজ মেলানোও অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে। তাই বেছে বেছে নিতে হয়।

মনে রাখতে হবে যা

কাপড়ের সেলাই, চেইন, বোতাম ভালো করে দেখে কিনুন। দামের সঙ্গে গুণগত মান মিলিয়ে নিন। ট্যাগে সাইজ আন্তর্জাতিক মাপে লেখা থাকায় ট্রায়াল দিলে ভালো হয়। বাড়তি বা সারপ্লাস পোশাকের পাশাপাশি বাতিল পোশাকও এসব দোকানে পাওয়া যায়। পাশাপাশি পুরনো কাপড় ধুয়ে রং করেও বিক্রি করেন অনেক অসাধু ব্যবসায়ী। কেনার সময় তাই খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে হবে কাপড়ের মান, রং, সেলাই, মাপ এবং ঠিকমতো কাটা হয়েছে কি না। ছাপা ডিজাইনের মধ্যেও থাকতে পারে অসংগতি, সেটিও দেখে নিতে হবে। এসব পোশাক কেনার বড় সমস্যা, এগুলোর কোনো গ্যারান্টি সাধারণত দেওয়া হয় না এবং এক্সচেঞ্জের সুযোগও কম। তাই কেনার সময় এসব বিষয় ভাবনায় রাখতে হবে।

ফিটিং করে নিন

তৈরি পোশাক কেনার সবচেয়ে বড় সমস্যা হয় মাপ নিয়ে। দোকানির কথায় কান না দিয়ে চেষ্টা করতে হবে পরে দেখার। সে উপায় না থাকলে অবশ্যই ফিতা দিয়ে মেপে মাপ মিলিয়ে নিতে হবে। যদি মাপে কিছুটা বড় হয়, চিন্তার কিছু নেই। গার্মেন্টসের পোশাকের বাজারগুলোতে ‘কাটিং টু ফিটিং’-এর দোকান থাকে। অভিজ্ঞ এসব দরজি অল্প সময়ের মধ্যে সাশ্রয়ী মূল্যে পছন্দের কাপড়টি মাপমতো ফিটিং করে দেবেন।

আপসাইক্লিং ও অন্যান্য

স্টকলট মানে শুধুই সস্তা পোশাক তা নয়, অনেক তরুণ ডিজাইনার এগুলো নিয়ে তৈরি করছেন নতুন পোশাক, যাকে বলে আপসাইক্লিং। পুরনো জামা নতুন ডিজাইনে বদলে অনলাইনে বিক্রি করে তাঁরা তৈরি করছেন নিজেদের ব্র্যান্ড। স্টকলটের প্রতিটি পোশাকের ভেতর লুকিয়ে আছে ভিন্ন ভিন্ন যাত্রাপথ। কখনো তা এসেছে ফ্রান্সের কোনো ফ্যাশন শো থেকে, কখনো ইতালির বাতিল স্টক থেকে। বঙ্গবাজারের গুদাম ও দোকানের এসব পোশাকের প্রতিটিরই আছে আলাদা গল্প, যা লুকিয়ে থাকে কাপড়ের ভাঁজে আর বিদেশি ট্যাগের আড়ালে।

থান কাপড়ের স্টকলট

তৈরি পোশাকের পাশাপাশি স্টকলট বাজারে পাওয়া যায় থান কাপড়। আন্তর্জাতিক ফ্যাশনজগতেও বাংলাদেশের স্টকলটের বেশ কদর। ইতালি, ফ্রান্স, জাপান ও কোরিয়ার নামি-দামি ব্র্যান্ডগুলোও বাংলাদেশ থেকে এসব কাপড় কিনে নিয়ে যায়। নিজেদের ডিজাইনে তৈরি করে পোশাক। আবার স্থানীয় বাজারে পাওয়া এই কাপড় থেকে তৈরি পোশাক বাংলাদেশ থেকে আন্তর্জাতিক বাজারেও পৌঁছায় নতুনরূপে। চাইলে এসব পোশাক নিজের পছন্দমতো বদলে নিতে বা আকার-আকৃতি ঠিক করিয়ে নিতে অল্টার করানোও সম্ভব। ঢাকার প্রায় প্রতিটি বড় শপিং মল ও মার্কেটে এমন দরজির দোকান আছে, যারা স্টকলট কাপড়ের জামাকাপড় সুন্দরভাবে কাস্টমাইজ করে দেয়।

দামাদামির বিকল্প নেই

নানা রকম পোশাকের নানা রকম দাম। তবে গার্মেন্টসের পোশাক বিক্রেতাদের মধ্যে অতিরিক্ত দাম চাওয়ার অভ্যাস আছে। কেনার সময় সঙ্গে অভিজ্ঞ কাউকে নেওয়া ভালো। দোকানির হাঁকানো দামে কখনোই কেনা উচিত না। কেনাকাটা করতে যাওয়ার আগেই দরদাম সম্পর্কে জেনে নেওয়া ভালো। দর সম্পর্কে ধারণা পেতে শুরুতেই না কিনে কয়েকটি দোকান ঘুরে দেখুন। কিংবা পাশে দাঁড়িয়েও দেখতে পারেন অন্য ক্রেতারা কোন পোশাকের কেমন দাম বলেন। এতেও দাম সম্পর্কে একটা ধারণা পেয়ে যাবেন।

কোথায় পাওয়া যায়

ঢাকার অলিগলি থেকে শুরু করে গুলশান, ধানমণ্ডি বা নিউমার্কেটের কাপড়ের দোকানগুলোতে পাওয়া যায় স্টকলট কাপড়ের পোশাক। বিশেষ করে পুরান ঢাকার চকবাজার, ইসলামপুর কিংবা নিউমার্কেটের দরজি ও কাপড়ের দোকানগুলোতে নানা ধরনের স্টকলট থান কাপড় মজুদ থাকে।

বঙ্গবাজার, গুলিস্তান, মৌচাক, সায়েন্স ল্যাব মোড়, কারওয়ান বাজার ও ফার্মগেটের পাশাপাশি এখন মিরপুর, শ্যামলী, রিং রোড, কৃষি মার্কেট, টাউন হল, ধানমণ্ডি, বনশ্রী এবং উত্তরায়ও গার্মেন্টস পোশাকের জনপ্রিয় বাজার রয়েছে। ছোট-বড় দোকানের পাশাপাশি ফুটপাতেও ভ্যানে করে হকাররা বিক্রি করছেন এসব পোশাক।

ভালো লাগলে সংবাদটি শেয়ার করুন

এই বিভাগের আরো সংবাদ
© All rights reserved © 2026 PromiNewsBD.com
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com