মৌলিক কবিসত্তার পাশাপাশি শামসুর রাহমানের কাব্যানুবাদক পরিচয়টিও নতুন নয়। গত শতকের ষাটের দশকে প্রকাশিত তাঁর দুটি অনূদিত কাব্যগ্রন্থ ‘রবার্ট ফ্রস্টের নির্বাচিত কবিতা’ (১৯৬৮) ও ‘খাজা ফরিদের কবিতা’ (১৯৬৯) অনুবাদক হিসেবে তাঁর সামর্থ্য ও বৈচিত্র্যতৃষ্ণার পরিচয়বাহী। এই দুটি পূর্ণাঙ্গ বইয়ের বাইরে থাকা পাবলো নেরুদা, হোর্হে লুইস বোর্হেস, পল এলুয়ার, তাদেউশ রোজেভিচ, ই ই কামিংস, মার্সেলিনো দোস সান্তোস, সানানা গুসমাও, কাইফি আজমি, সিম হান এবং ই সাঙ-হোয়া—এই ১০ কবির কবিতার রাহমানকৃত অনুবাদ নিয়ে বহু পরে প্রকাশ পায় আরেকটি বই, ‘হাওয়ায় ভেসে আসা স্বর’ (২০১০)। তবে তাঁর হাতে হওয়া বিদেশি কবিতার আরো অনুবাদ এখনো অগ্রন্থিতই রয়ে গেছে।
প্রেমে পড়া নারী
হ্যাঁ, সত্যি তোমাকে আমি একান্ত কামনা করি, ভেসে
চলি ধীরে, আমার নিজের হাত থেকে নিজেকেই
হারাই, তোমার দিক থেকে যা কিছু আমাতে মেশে
অন্ধকার অবিচল বালির স্রোতের মতো এসে—
নই তার সমকক্ষ, নৈরাশ্যে পাবো না তার খেই।
তখন সেসব দিনে ছিলাম নিবিষ্ট, অবিহ্বল—
আমাকে ডাকেনি কেউ, হয়নিকো ফাঁস কোনো কথা,
পাথরের মতো ছিল আমার সকল নীরবতা,
যেখানে একটি নদী ঝির ঝির বয় অবিরল।
এখন, যা হোক, বসন্তের এইসব দিনে ধীরে
ধীরে কোনো কিছু সেই নির্জ্ঞান আঁধার ঘিরে
থাকা ঝলসিত বছরের পাখা দিয়েছে গুঁড়িয়ে।
আমার দরিদ্র উষ্ণ এ জীবন ক্রমে যাচ্ছে চলে
এমন কারুর হাতে কোনো এক ক্ষমতার বলে
যে জানে না কাল আমি কী ছিলাম, ছিলাম কী নিয়ে!
তোমাকে নিবিড় বাঁধি
তুমি, যাকে বলি না রাত্তিরে আমি কাঁদি
শুয়ে শুয়ে,
তুমি, যার সত্তা আমার আলোকে
আর্ত করে দোলনার চিৎকারের মতো
যে তুমি বলো না তুমি আমার জন্যেই
তোমার বেঞ্চিতে জেগে থাকো কী সাদা পাণ্ডুর—
ভাবছো বিস্মিত
অত্যন্ত উজ্জ্বল প্রভা না নিভিয়ে আমরা কেন যে
সয়ে যাই শুধু?
এমন পাণ্ডুর সব প্রেমিক-প্রেমিকাদের দ্যাখো—
একবার ওদের জবানবন্দী শুরু হয়ে গেলে
কত তাড়াতাড়ি ওরা মজে মিথ্যাচারে।
আমাকে নিঃসঙ্গ করো তুমি।
পারি শুধু তোমাকেই
করতে বিনিময়, মুহূর্তের জন্যে তুমি, তারপর মর্মরিত
তরুশ্রেণী অথবা সুরভি কোনো বিরামবিহীন।
আহ্, ওরা সকলেই এ মুহূর্তে আমার বাহুতে
ভীষণ নিঃসঙ্গ হয়ে গেছে,
তোমার তোমার শুধু নবজন্ম হয় বার বার :
কেননা যেহেতু আমি তোমাকে ধরিনি কোনোদিন
তোমাকে নিবিড় বাঁধি দৃঢ় আলিঙ্গনে।