বেশ কয়েকটি কারণে অগ্ন্যাশয়ের প্রদাহ হতে পারে; যেমন—
► শরীরের অতিরিক্ত ওজন প্যানক্রিয়াটাইটিসের ঝুঁকি বাড়ায়।
► গলব্লাডার ও পিত্তনালিতে পাথর হলে সেটি পিত্তনালি বন্ধ করে দিতে পারে। এর ফলে দেখা দেয় অগ্ন্যাশয়ের প্রদাহ।
► ভাইরাসজনিত রোগ মামপসের উপসর্গ হিসেবে হতে পারে এটি।
► কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া; যেমন—স্টেরয়েড গোত্রের ওষুধ বা সোডিয়াম ভ্যালপ্রোয়েট।
► রক্তে ট্রাইগ্লিসারাইড নামক চর্বির আধিক্য।
► রক্তে ক্যালসিয়ামের মাত্রা খুব বেশি হলে।
► অগ্ন্যাশয়ে আঘাত পেলে।
প্যানক্রিয়াটাইটিসের লক্ষণ
রোগীরা পেটের ওপরের অংশে ব্যথা অনুভব করেন। একই স্থানে পেপটিক আলসার অথবা গ্যাস্ট্রিকের ব্যথাও হয়ে থাকে। তাই অনেক সময় প্যানক্রিয়াটাইটিসের ব্যথা নির্ণয় করা কঠিন হয়ে যায়। পিত্তথলিতে পাথর হলেও অনেকটা একই ধরনের ব্যথা অনুভূত হয়। বাকি দুটি রোগের ব্যথার সঙ্গে মূল পার্থক্য, অগ্ন্যাশয় আক্রান্ত হলে রোগীরা অনুভব করেন ব্যথা যেন সামনে থেকে পেছনে পিঠের দিকে এগোচ্ছে। রোগীরা উপুড় হয়ে সিজদা পজিশনে গেলে ব্যথা কিছুটা লাঘব হয়। ফলে দেখা যায় ক্রনিক অগ্ন্যাশয় প্রদাহের রোগীরা ব্যথা লাঘবের জন্য প্রায় সময় উপুড় হয়ে বাঁকা হয়ে আছেন। ব্যথার পাশাপাশি শুরু হতে পারে বমি বমি ভাব, হতে পারে বমি এবং শরীরে মাঝারি তাপমাত্রার জ্বর হতে পারে। ক্রনিক প্যানক্রিয়াটাইটিসের রোগীদের ওজন কমতে থাকে। খাদ্য হজম ব্যাহত হওয়ায় ডায়রিয়া দেখা দেয়। মলের সঙ্গে মিশে থাকে চর্বি। বিশেষ এই ধরনের মলকে চিকিৎসাবিজ্ঞানে বলে স্টাটোরিয়া।
জটিলতা
অ্যাকিউট প্যানক্রিয়াটাইটিসের জটিলতা হতে পারে ভয়ানক, মৃত্যুও হয় অনেকের। যে ধরনের জটিলতা দেখা দিতে পারে—
► রক্তচাপ হঠাৎ নেমে গিয়ে রোগী শকে চলে যেতে পারেন।
► দেহের হতে পারে অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণ, যা সহজে বাইরে থেকে বোঝা যায় না।
► কিডনিসহ অনেকগুলো অঙ্গ একই সঙ্গে অকার্যকর হয়ে যেতে পারে, যাকে বলা হয় ম্যাসিভ অর্গান ফেইলর।
► রেসপিরেটরি ডিস্ট্রেস সিনড্রোম বা ফুসফুসের ভয়ানক জটিলতা থেকে রোগী শ্বাস বন্ধ হয়ে মারা যেতে পারেন।
► রক্তে ক্যালসিয়ামের ঘাটতি দেখা দিতে পারে, যার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া মারাত্মক।
► অগ্ন্যাশয়ের প্রদাহজনিত জন্ডিস দেখা দিতে পারে দেহে।
► অগ্ন্যাশয়ে পুঁজ, ইনফেকশন ও পচন ইত্যাদি হয়ে কার্যকারিতা দ্রুত নষ্ট হয়ে যেতে পারে।
► অগ্ন্যাশয়ে সিউডোসিস্ট দেখা দিতে পারে। এতেও কমে কার্যক্ষমতা।
► বারবার প্রদাহ হওয়ায় দেখা দিতে পারে ডায়াবেটিস।
► প্যানক্রিয়াটাইটিস থেকে অগ্ন্যাশয়ে ক্যান্সারও দেখা দিতে পারে।
রোগ নির্ণয়
পেটের ওপরের অংশে তীব্র ব্যথা ব্যথা হলে তা গ্যাস্ট্রিকের ব্যথা ধরে নেওয়া যাবে না। অগ্ন্যাশয়ের প্রদাহ হয়েছে কি না, সেটি জানার জন্য চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। এমনটি হলে রক্তে অগ্ন্যাশয়ের উৎসচক বেড়ে যায়। রক্ত পরীক্ষা করে এটি নির্ণয় করা যেতে পারে। ক্রনিক প্যানক্রিয়াটাইটিসের ক্ষেত্রে এই পরীক্ষা কার্যকর নয়। সে ক্ষেত্রে রোগ নির্ণয়ের জন্য তখন ব্যবহৃত হয় আলট্রাসনোগ্রাফি কিংবা পেটের সিটি স্ক্যান। কোন পরীক্ষা কার্যকর হবে, সেটি রোগীর ইতিহাস ও শারীরিক অবস্থা পরীক্ষা করে সে অনুযায়ী নির্ধারণ করবেন চিকিৎসক।
চিকিৎসা
প্রদাহটি অ্যাকিউট, নাকি ক্রনিক এবং এর তীব্রতার ওপর নির্ভর করে চিকিৎসার ধরন। সরাসরি অগ্ন্যাশয়ের চিকিৎসা করার প্রয়োজন সাধারণত হয় না, উপসর্গগুলো নিয়ন্ত্রণ করে রোগীকে বাঁচিয়ে রাখার ওপরই জোর দেওয়া হয়। কিছু ক্ষেত্রবিশেষে রোগীকে নিবিড় পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রে রাখতে হতে পারে। জটিলতা দেখা দিলে যত দ্রুত সম্ভব তাত্ক্ষণিক ব্যবস্থা নিতে হবে, নইলে মৃত্যুঝুঁকি আছে।
প্রতিরোধ
প্রতিরোধের জন্য নিচের বিষয়গুলোর প্রতি যত্নশীল হতে হবে—
► দেহের ওজন নিয়ন্ত্রণ খুবই জরুরি। অনেক রোগের কারণ স্থূলতা।
► ধূমপান, অ্যালকোহল ও অন্যান্য মাদক সেবন থেকে দূরে থাকা।
► রক্তের চর্বির আধিক্য থাকলে, বিশেষত ট্রাইগ্লিসারাইডের আধিক্য দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া।
► ওষুধ সেবনের ক্ষেত্রে সাবধানতা অবলম্বন।