
সিদ্ধান্ত নিলেন নিয়মিত ব্যায়াম করবেন, কিন্তু সময় মেলে না। শহুরে জীবনে অফিস, সংসার, যানজট, হাজারটা ঝামেলা এড়িয়ে জিমে যাওয়ার ধৈর্যও অনেকের হয় না। অনেকেই আছেন, যাঁরা বাইরের জিমে যেতে লজ্জা পান কিংবা সংক্রমণের ভয়ে এড়িয়ে চলেন। ওয়ার্কআউটের ইচ্ছা থাকলেও নানা প্রতিবন্ধকতায় তা হয়ে ওঠে না।

কেন দরকার নিজের জিম
ঘরে জিম মানে নিজের সময়ে, নিজের মতো করে ব্যায়াম করার সুযোগ। সময় বাঁচে, খরচ বাঁচে, অস্বস্তি হওয়ার সুযোগ নেই, ভিড় নেই, লাইনে দাঁড়ানো নেই, ড্রেসকোড নেই। পরিবারের বয়স্ক সদস্য, অফিসে ব্যস্ত মানুষ, গৃহিণী কিংবা সদ্য ফিটনেসে মন দেওয়া তরুণ—সবাই উপকার পাবেন। সকালে উঠে হাঁটাহাঁটি, রাতে একটু স্ট্রেচিং কিংবা দুপুরে ১৫ মিনিট সাইক্লিং—সবই সম্ভব বাড়ির জিমে।

কতটুকু জায়গা
বাড়িতে জিম করতে যে অনেক জায়গা লাগে তা নয়। একটু খালি কোনা, বারান্দার একপাশ, এমনকি শোবার ঘরের মাঝখানের ৫ বাই ৫ ফুট জায়গাই যথেষ্ট। একপাশে শেলফ করে তাতে সরঞ্জামগুলো গুছিয়ে রাখলেন। এতে জায়গা কম লাগবে। দেখতেও এলোমেলো লাগবে না।
কী কী সরঞ্জাম
সবাই শরীরচর্চায় পটু নন। তাই ঘরের জিমে এমন সব সরঞ্জাম থাকা উচিত, যেগুলো ব্যবহার সহজ এবং নিয়মিত ব্যায়ামে কাজে দেবে। শুরু করতে পারেন রেজিস্ট্যান্স ব্যান্ড দিয়ে। ছোট, সস্তা, ফোল্ড করে ড্রয়ারে রাখা যায়। ডাম্বেল বা পানিভর্তি বোতলও ব্যবহার করতে পারেন। কার্ডিওর জন্য স্কিপিং রোপ খুব কার্যকর। অল্প জায়গায়ই মিনিট পাঁচেক স্কিপিং করলে পুরো শরীর গরম হয়। একটা যোগা বা এক্সারসাইজ ম্যাট রাখলে মেঝেতে অনায়াসে প্লাংক, পুশ-আপ, যোগা বা স্ট্রেচিং করা যায়। দরজার ফ্রেমে লাগানো পুল-আপ বার কিংবা ছোট সাইক্লিং মেশিনও অনেক কাজে আসে। অল্প জায়গায় রাখা যায়। এগুলোর বদলে চেয়ার বা টুল দিয়েও অনেক এক্সারসাইজ করা সম্ভব।
অনেকে ভাবেন এসব যন্ত্র কি নারীদের জন্য কঠিন? একদম না। নারী-পুরুষ-নির্বিশেষে ব্যায়ামের এই সরঞ্জাম ব্যবহার করতে পারবেন। শুধু ওজন ও রেজিস্ট্যান্স নিজের আরাম ও সক্ষমতা অনুযায়ী বেছে নিতে হয়। নারীরা চাইলে হালকা ওজন, ফ্রি-হ্যান্ড ও যোগাসনে বেশি ফোকাস করতে পারেন। পুরুষরা ডাম্বেল, রেজিস্ট্যান্স ব্যান্ড বা বার-এ একটু বেশি ওজনের দিকে যেতে পারেন। আসলে শরীর-মন বুঝে যেটা আরামদায়ক, সেটাই ঠিক।
কতক্ষণ করবেন
প্রথমে পাঁচ-দশ মিনিট কার্ডিওস্কিপিং, সাইক্লিং মেশিন কিংবা অন দ্য স্কট জগিং করুন। পরে বডিওয়েট এক্সারসাইজ পুশ-আপ, স্কোয়াট, লাঞ্জ, প্লাংক, সিট-আপ, ট্রাইসেপ ডিপস (চেয়ার ব্যবহার করে) বেছে নিতে পারেন। এরপর রেজিস্ট্যান্স ব্যান্ড বা ডাম্বেল দিয়ে বাইসেপ কার্ল, শোল্ডার প্রেস, ল্যাটারাল রেইজ, ট্রাইসেপ এক্সটেনশন করুন। সব শেষে ৫-১০ মিনিট স্ট্রেচিং বা সহজ যোগাসন শরীরে সতেজ ভাব যোগ করবে। নতুনরা কম সময় ও হালকা ইন্টেনসিটি দিয়ে শুরু করুন। দ্রুত ফল চাইবেন না, নিয়মিত হলে কিছুদিনের মধ্যে পরিবর্তন টের পাবেন। সপ্তাহে অন্তত চার-পাঁচ দিন আধাঘণ্টা থেকে এক ঘণ্টা সময় বরাদ্দ করলেই যথেষ্ট।
কাদের জন্য উপযোগী
বয়স্কদের জন্য হালকা স্ট্রেচিং, যোগব্যায়াম, শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম। যোগ ম্যাট, বল, ওয়াল সাপোর্ট উপযোগী।
গৃহিণীদের জন্য বাসার কাজের ফাঁকে ১৫-২০ মিনিট হালকা ব্যায়াম। ঘরের কাজই অনেকটা ফিটনেস, তার সঙ্গে কিছু স্ট্রেচিং ও স্কোয়াট বাড়তি উপকার দেবে।
অফিসে সারা দিন বসে কাজের ফলে ঘাড়, পিঠ ব্যথা করে। জিম বল, রোলার, ব্যাক স্ট্রেচার খুব উপকারী।
কিশোর-কিশোরী ও তরুণদের দরকার নিয়মিত কার্ডিও ও স্ট্যামিনা বাড়ানো এক্সারসাইজ। জাম্পিং রোপ, সাইক্লিং বা হালকা ওয়েট ট্রেনিং কাজে দেবে। অভিভাবকদের পর্যবেক্ষণ জরুরি।
কী খাবেন
পুষ্টিকর খাবার, প্রচুর পানি, দেশি ফল, শাক-সবজি, ডাল, ডিম, মাছ, দুধ, ওটস রাখুন রোজকার তালিকায়। খাবার হতে হবে কম তেলে রান্না, কম চিনি, কম লবণের। এতে শরীর ভালো থাকবে। ফাস্ট ফুড, সফট ড্রিংকস, অতিরিক্ত প্রসেসড খাবার পরিহার করাই ভালো। ব্যায়ামের আগে হালকা নাশতা (ফল বা বাদাম), পরে প্রোটিন ও কার্বোহাইড্রেট (ডিম, দই, কলা, ওটস) খেতে পারেন। পর্যাপ্ত পরিমাণ ঘুম দরকার।
খরচ কেমন
খরচ নির্ভর করে আপনি কতটা যন্ত্রপাতি রাখতে চান তার ওপর। একটি বেসিক জিম বানাতে খরচ হতে পারে পাঁচ হাজার থেকে ১৫ হাজার টাকা। ট্রেডমিল বা বাইক যোগ হলে সেটা ২৫-৪০ হাজার টাকায় গিয়ে ঠেকতে পারে। ভালো মানের রেজিস্ট্যান্স ব্যান্ড, যোগ ম্যাট, ডাম্বেল এ তিনটি দিয়েই শুরু করতে পারেন, খরচ ৩০-৩৫ হাজার টাকা।
যন্ত্রপাতিগুলো এক কোণে গুছিয়ে রাখুন। ছোট বাক্স বা শেলফ ব্যবহার করতে পারেন। ব্যায়াম মানে নিজের প্রতি যত্ন, পরিবার ও ভবিষ্যতের জন্য বিনিয়োগ। শুরুটা কঠিন মনে হতে পারে, কিন্তু অভ্যাস গড়ে তুললে এই ছোট্ট ফিটনেস কর্নারই আপনার সবচেয়ে প্রিয় জায়গা হয়ে উঠবে। আজ থেকেই চেষ্টা করুন। বাড়ির ছোট জিম, ছোট অভ্যাসই বদলে দেবে জীবন।
১। ব্যায়াম শুরুর আগে গরম পানিতে গোসল বা হালকা ওয়ার্মআপ করুন।
২। প্রথম ৭-১০ দিন প্রতিদিন ১৫ মিনিট করে অভ্যাস করুন। তারপর ধীরে ধীরে সময় বাড়ান।
৩। ইউটিউব বা ফিটনেস অ্যাপ দেখে ব্যায়ামের ধরন ঠিক করে নিতে পারেন।
৪। ভুলভাবে ব্যায়াম করলে শরীরের ক্ষতি হতে পারে।
৫। ব্যায়ামের সময় মোবাইল দূরে রাখুন। মনোযোগ জরুরি।
৬। যন্ত্র ব্যবহারের আগে ভালো করে পড়ে নিন বা বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন।