সভাপতির বক্তব্যে অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ বলেন, ‘আমাদের এই কৃষিভিত্তিক জীবনে নিঃশব্দে বহুদিন ধরে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলো অপরিমেয় শক্তির অধিকারী। সেই শক্তিকে তিনি (এস এম সুলতান) তাঁর ছবিতে ফুটিয়ে তুললেন। তাঁর ছবিতে মানুষ প্রকৃতির চেয়েও বড় হয়ে উঠেছে। প্রকৃতি তো নতুনভাবে জন্ম নেবে না, কিন্তু মানুষ নতুন বিশ্বাস আর উদ্দেশ্য নিয়ে নতুনভাবে জন্ম নিতে পারে। এই শক্তিকে তিনি চিনেছিলেন, আর এ কারণেই তাঁর মানুষের চেহারা আমাদের কাছে আলাদা মনে হয়।
গবেষক ড. শাহমান মৈশান মূল প্রবন্ধে বলেন, এস এম সুলতান মানুষের চেয়ে বড় কিছু ভাবতে রাজি ছিলেন না। ঔপনিবেশিক শাসনের সাংস্কৃতিক বিবর্তনের প্রেক্ষাপটে তিনি নিজস্ব ভাষা নির্মাণ করেছেন এবং আধুনিকতার সরকারি কাঠামো প্রত্যাখ্যান করেছেন।
শিল্পী মনিরুল ইসলাম বলেন, সুলতানের ছবিতে কোনো প্রচলিত প্রেক্ষাপট বা শেডিং নেই, কিন্তু স্বশিক্ষিত এই শিল্পী নিজস্ব ধারা গড়ে তুলেছেন।
শিল্প সমালোচক অধ্যাপক আবদুস সাত্তার মনে করেন, এস এম সুলতানের আধ্যাত্মিক শিল্পভাবনা এখনো পুরোপুরি উন্মোচিত হয়নি।
অধ্যাপক আবুল মনসুর বলেন, সুলতান ঔপনিবেশিকতার বিরুদ্ধে বহু আগে থেকেই উচ্চারণ রেখেছিলেন, অথচ দীর্ঘদিন দৃশ্যকলার জগতে অবহেলিত ছিলেন।
শিল্প সমালোচক মোস্তফা জামান বলেন, একাত্তরের পর সুলতানের ক্যানভাসে ঐক্য, যূথবদ্ধতা ও লৌকিক-অলৌকিকতার মেলবন্ধন আরো তীব্র হয়ে ওঠে।
বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান আবুল খায়ের জানান, নড়াইলে সংরক্ষণের অভাবে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে সুলতানের আঁকা ৬৮ ফুট দীর্ঘ ‘রুরাল কালচারাল’। শিল্পবোদ্ধাদের তিনি ছবিটি রক্ষার আহবান জানান।
অনাড়ম্বর নড়াইল : ১৯২৪ সালের ১০ আগস্ট নড়াইলের মাছিমদিয়ায় বাবা মেছের আলী ও মা মাজু বিবির ঘরে জন্মগ্রহণ করেন চিত্রশিল্পী এস এম সুলতান। সুলতানের জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে কোরআনখানি, দোয়া ও সুলতানের সমাধিতে পুষ্পমাল্য অর্পণ করবে সুলতান ফাউন্ডেশন।
গত বছর গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী পরিস্থিতির কারণে নড়াইলে বিশ্ববরেণ্য চিত্রশিল্পী এস এম সুলতানের জন্মশতবর্ষের আয়োজন সেভাবে হয়নি। এ বছরও নেই তেমন আয়োজন।
১৯৯৪ সালের ১০ অক্টোবর শিল্পী মারা গেলে নিজ বাড়ির আঙিনায় তাঁকে সমাহিত করা হয়। সেখানে তৈরি হয় এস এম সুলতান স্মৃতি সংগ্রহশালা ও শিশুস্বর্গ।
মৃত্যুর কয়েক বছর পর ২০০৬ সালে তৈরি সংগ্রহশালায় নষ্ট হয়েছে ছবি। একই কক্ষে ছবির সঙ্গে রাখা আছে শিল্পীর মূল্যবান সব জিনিস। শিশুস্বর্গ বজরা আগেই ধ্বংস হয়েছে। সুলতানের ছবি আঁকার আর্ট গ্যালারি হয়েছে নিরাপত্তাকর্মীদের বাসস্থান। এতে দর্শনার্থী ও শিল্পীরা হতাশ।
সুলতান কমপ্লেক্সে ঘুরতে আসা যশোরের পর্যটক আহমেদ জুবায়ের বলেন, ‘সুলতানের সব মূল্যবান ছবি দেখলাম। খুবই সুন্দর! তবে এখানে যত পর্যটক আসার কথা, তা দেখছি না।’
সুলতান শিশুস্বর্গের শিক্ষক নয়ন বৈদ্য বলেন, ‘প্রায় ২০ বছর আগে এখানে জাদুঘর হওয়ার কথা ছিল। সে কারণে সুলতানের পালিত কন্যা নিহারবালাকে এখান থেকে সরিয়ে বাইরে স্থান দেওয়া হয়। কিন্তু আজও তার কোনো লক্ষণ দেখছি না। যথাযথ সংরক্ষণের অভাবে মাছিমদিয়ায় তৈরি সুলতান কমপ্লেক্স আর সংগ্রহশালায় নষ্ট হতে চলেছে মূল্যবান সব ছবি। নষ্ট হচ্ছে তাঁর ব্যবহার্য জিনিস।’
সুলতান কমপ্লেক্সের কিউরেটর চিত্রশিল্পী তন্দ্রা মুখার্জী বলেন, ‘সুলতান স্মৃতি সংগ্রহশালা ওই সময় বানানো হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু এটা ছবি সংরক্ষণের উপযোগী নয়। জায়গার আভাবে তাঁর আর্ট গ্যালারিতে নিরাপত্তাকর্মীদের আবাসস্থল বানাতে হয়েছে। এগুলোর জন্য প্রয়োজন জাদুঘর। সুলতানের মূল্যবান সব জিনিসও নষ্ট করে ফেলছি আমরা।’
সুলতানের জন্মদিন উপলক্ষে কিছু কর্মসূচি আছে জেলা প্রশাসনের। ১০ আগস্টের পর চিত্রাঙ্কনসহ আরো কিছু কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে।
জেলা প্রশাসক ও এস এম সুলতান ফাউন্ডেশনের সভাপতি শারমিন আক্তার জাহান বলেন, সুলতানের ছবি সংরক্ষণের উপযোগী করে আধুনিক সুলতান কমপ্লেক্স নির্মাণ, সুলতান ঘাটসহ নানা বিষয়ে জমি অধিগ্রহণসহ প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।
সুলতান মেলা আর নৌকাবাইচের বিষয়ে তহবিল সংকটের কথা উল্লেখ করে জেলা প্রশাসক বলেন, ‘বৃষ্টি শেষ হলে সুলতান মেলা আয়োজনের চেষ্টা করব।’








