সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬, ০২:২২ অপরাহ্ন
নোটিশঃ
জনপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল প্রমিনিউজবিডি ডটকম এর পরিক্ষামূলক সম্প্রচার চলছে। সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। তার মানে এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা লেখার অংশবিশেষ কিংবা ছবি বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রচার বা প্রকাশ করা নিষিদ্ধ।

রাজা রামমোহন রায়

ঢাকা অফিস
  • আপডেট: শনিবার, ৯ আগস্ট, ২০২৫
  • ৯ বার পড়া হয়েছে

রাজা রামমোহন রায়: ভারতীয় নবজাগরণের অগ্রদূত

ভূমিকা

রাজা রামমোহন রায় (১৭৭২–১৮৩৩) ছিলেন ভারতীয় সমাজের এক অনন্য ব্যক্তিত্ব, যিনি উনবিংশ শতাব্দীর সূচনালগ্নে আধুনিকতার আলোর পথ দেখিয়েছিলেন। তাঁকে বলা হয় “ভারতীয় নবজাগরণের জনক”। তিনি শুধু একজন সমাজসংস্কারক নন, ছিলেন শিক্ষাবিদ, সাংবাদিক, মানবতাবাদী ও একেশ্বরবাদী চিন্তাবিদ। তাঁর জীবন ও কর্ম ভারতীয় সমাজকে অন্ধকার কুসংস্কার থেকে যুক্তি, মানবতা ও আধুনিকতার পথে এগিয়ে দিয়েছে।

শৈশব ও শিক্ষাজীবন

১৭৭২ সালের ২২ মে বাংলার হুগলি জেলার রাধানগর গ্রামে রামমোহন রায় জন্মগ্রহণ করেন। পিতা রাধাকান্ত রায় ছিলেন একজন জমিদার ও ধর্মনিষ্ঠ ব্রাহ্মণ, আর মা তারিণী দেবী ছিলেন স্নেহশীলা ও ধার্মিক। ছোটবেলা থেকেই তিনি অসাধারণ মেধাবী ও কৌতূহলী ছিলেন।

প্রথমে গ্রামের পাঠশালায় বাংলা ও সংস্কৃত শিক্ষা নেন। পরে পাটনায় গিয়ে ফারসি ও আরবি ভাষায় গভীর জ্ঞান অর্জন করেন। বেনারসে পড়াশোনার সময় তিনি বেদ, উপনিষদ ও অন্যান্য হিন্দু ধর্মগ্রন্থের সঙ্গে পরিচিত হন। পাশাপাশি তিনি ইংরেজি শিখে পাশ্চাত্যের বিজ্ঞান, দর্শন ও সাহিত্য অধ্যয়ন করেন। এই বহুমুখী শিক্ষা তাঁকে উদার, যুক্তিনিষ্ঠ ও বহুধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গির মানুষে পরিণত করে।

সামাজিক পটভূমি ও সমস্যাবলী

রামমোহনের সময় ভারতীয় সমাজ ছিল নানা কুসংস্কার ও অমানবিক প্রথায় জর্জরিত। সতীদাহ, বাল্যবিবাহ, বহুবিবাহ, নারী শিক্ষার অভাব, বর্ণব্যবস্থার কঠোরতা এবং ধর্মীয় গোঁড়ামি ছিল নিত্যদিনের বাস্তবতা। মানুষ অন্ধভাবে শাস্ত্রের ভুল ব্যাখ্যা মেনে চলত, আর নারীর জীবন ছিল অবরুদ্ধ। রামমোহন অনুভব করেন, এই অবস্থা পরিবর্তনের জন্য প্রয়োজন যুক্তি, শিক্ষা ও মানবতাবাদী মূল্যবোধের প্রচার।

সতীদাহ প্রথা বিলোপ আন্দোলন

রামমোহনের জীবনের অন্যতম বড় সাফল্য ছিল সতীদাহ প্রথা বিলোপ। সতীদাহ ছিল এমন এক প্রথা, যেখানে স্বামীর মৃত্যুর পর স্ত্রীকে জোর করে চিতায় পুড়িয়ে মারা হতো। রামমোহন নিজের চোখে এই ভয়ঙ্কর দৃশ্য দেখেছিলেন এবং গভীরভাবে ব্যথিত হয়েছিলেন।

তিনি প্রবন্ধ, বক্তৃতা ও আবেদনপত্রের মাধ্যমে সতীদাহ প্রথার বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তোলেন। ইংরেজি ও বাংলা উভয় ভাষায় লিখে তিনি প্রমাণ করেন যে, সতীদাহের পক্ষে শাস্ত্রে কোনও বাধ্যবাধকতা নেই। তাঁর দীর্ঘ সংগ্রামের ফলস্বরূপ ১৮২৯ সালে গভর্নর জেনারেল লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্ক সতীদাহ বিলোপ আইন জারি করেন। এই আইন ভারতীয় সমাজে নারী মুক্তির পথে এক ঐতিহাসিক মাইলফলক।

ব্রাহ্ম সমাজ প্রতিষ্ঠা

১৮২৮ সালে রামমোহন রায় প্রতিষ্ঠা করেন ব্রাহ্ম সমাজ—যা ছিল একেশ্বরবাদ, ধর্মীয় সহনশীলতা, সামাজিক সংস্কার ও মানবতাবাদের প্রচারক একটি সংগঠন। ব্রাহ্ম সমাজে জাতি, বর্ণ ও লিঙ্গভেদ দূর করে সবার জন্য সমান মর্যাদা নিশ্চিত করা হতো।

রামমোহন বিশ্বাস করতেন, ধর্মের মূল উদ্দেশ্য হলো নৈতিক উন্নতি ও মানবসেবা, আচার-অনুষ্ঠানের জটিলতা নয়। তিনি হিন্দুধর্মের মূল দর্শনকে একেশ্বরবাদী রূপে ব্যাখ্যা করেন এবং অন্যান্য ধর্মের গুণাবলীও গ্রহণ করেন। তাঁর চিন্তাধারা পরবর্তীতে ভারতীয় ধর্মীয় সংস্কার আন্দোলনের ভিত্তি স্থাপন করে।

শিক্ষা সংস্কার ও সাংবাদিকতা

রামমোহন বুঝেছিলেন—শিক্ষা সংস্কার ছাড়া সামাজিক উন্নতি সম্ভব নয়। তিনি পাশ্চাত্য বিজ্ঞান, গণিত, দর্শন ও আধুনিক জ্ঞানের প্রসারের জন্য ইংরেজি শিক্ষার পক্ষে অবস্থান নেন।

১৮১৭ সালে তাঁর সহায়তায় প্রতিষ্ঠিত হয় হিন্দু কলেজ (বর্তমানে প্রেসিডেন্সি ইউনিভার্সিটি), যা আধুনিক শিক্ষার কেন্দ্র হয়ে ওঠে। তিনি নারী শিক্ষার প্রসারেও উদ্যোগী ছিলেন এবং মনে করতেন, শিক্ষিত নারীই শিক্ষিত প্রজন্ম গড়ে তুলতে পারে।

সাংবাদিক হিসেবেও তিনি অগ্রগণ্য। তাঁর সম্পাদিত বাংলা পত্রিকা ‘সম্বাদ কৌমুদী’ ও ইংরেজি পত্রিকা ‘The Brahminical Magazine’ তৎকালীন সমাজে আলোড়ন তোলে। এসব পত্রিকায় তিনি সামাজিক সমস্যা, ধর্মীয় সংস্কার, অর্থনীতি ও রাজনীতি নিয়ে সরাসরি মত প্রকাশ করতেন।

নারী অধিকার ও সামাজিক সমতা

রামমোহন ছিলেন নারী অধিকারের প্রবল সমর্থক। তিনি বাল্যবিবাহ ও বহুবিবাহের বিরোধিতা করেন, বিধবা বিবাহের পক্ষে মত দেন এবং নারীকে পুরুষের সমান মর্যাদা দেওয়ার আহ্বান জানান। তাঁর মতে, একটি সমাজের প্রকৃত অগ্রগতি নারীর মুক্তি ও শিক্ষার ওপর নির্ভরশীল।

তাঁর এই প্রগতিশীল চিন্তা সেই সময়ে অনেকের বিরাগভাজন করলেও, ধীরে ধীরে সমাজে পরিবর্তনের বীজ বপন করে।

ধর্মীয় সহনশীলতা ও উদার দৃষ্টিভঙ্গি

বিভিন্ন ধর্মীয় গ্রন্থ অধ্যয়নের ফলে রামমোহন উপলব্ধি করেছিলেন যে সব ধর্মের মূল শিক্ষা একই—মানবপ্রেম ও নৈতিকতা। তিনি হিন্দুধর্মের পাশাপাশি ইসলাম ও খ্রিস্টধর্ম থেকেও অনেক শিক্ষা গ্রহণ করেন। তাঁর এই বহুধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি তাঁকে গোঁড়া মহলের সমালোচনার মুখে ফেললেও, শিক্ষিত ও উদারপন্থী মানুষের কাছে তিনি গভীর শ্রদ্ধার পাত্র হন।

ইংল্যান্ড সফর ও শেষ জীবন

১৮৩১ সালে মুঘল সম্রাট দ্বিতীয় আকবর শাহের প্রতিনিধি হিসেবে তিনি ইংল্যান্ডে যান পেনশন সংক্রান্ত একটি বিষয়ে। ইংল্যান্ডে তিনি শিক্ষা ও সামাজিক সংস্কার বিষয়ে মতবিনিময় করেন, বিভিন্ন বিদ্বজ্জনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং সংসদের কার্যক্রম প্রত্যক্ষ করেন।

দুর্ভাগ্যবশত, ১৮৩৩ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর ব্রিস্টলে অসুস্থতাজনিত কারণে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর সমাধি আজও ব্রিস্টলে সংরক্ষিত আছে, যা ভারত ও ইউরোপের ঐতিহাসিক বন্ধনের প্রতীক।

উত্তরাধিকার ও প্রভাব

রাজা রামমোহন রায়ের অবদান শুধু তাঁর জীবদ্দশাতেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং তা পরবর্তী প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে আছে। সতীদাহ বিলোপ, নারী শিক্ষা, ধর্মীয় সহনশীলতা, আধুনিক শিক্ষা ও সংবাদপত্রের প্রসারে তাঁর অবদান ভারতীয় সমাজকে নতুন দিশা দিয়েছে।

তিনি প্রমাণ করেছিলেন—যুক্তি, সাহস ও দৃঢ় সংকল্প থাকলে একজন মানুষ একাই ইতিহাসের ধারা বদলে দিতে পারেন। ভারতীয় সমাজ আজ যে তুলনামূলকভাবে উদার ও আধুনিক, তার পেছনে রামমোহনের অবদান অনস্বীকার্য।

উপসংহার

রাজা রামমোহন রায় ছিলেন একাধারে দার্শনিক, সংস্কারক, শিক্ষাবিদ ও মানবপ্রেমী। তিনি কুসংস্কারের অন্ধকার ভেদ করে আধুনিকতার আলো জ্বালিয়েছিলেন। তাঁর জীবন আমাদের শেখায়—অন্যায় ও অমানবিকতার বিরুদ্ধে দাঁড়ানো কখনো সহজ নয়, কিন্তু প্রয়াসী হলে পরিবর্তন সম্ভব।

ভারতীয় নবজাগরণের এই অগ্রদূতের নাম ইতিহাসে চিরকাল স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।

ভালো লাগলে সংবাদটি শেয়ার করুন

এই বিভাগের আরো সংবাদ
© All rights reserved © 2026 PromiNewsBD.com
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com