সিগারেটের ধোঁয়ায় থাকা কার্সিনোজেনিক পদার্থ, যেমন—টার ও নাইট্রোসামিন ফুসফুসের কোষে ক্ষত সৃষ্টি করে। এগুলো ক্রমাগতভাবে ফুসফুসের কোষগুলোর ডিএনএ পর্যন্ত পরিবর্তন করতে পারে। ফলে কোষের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি ঘটে এবং টিউমার গঠিত হয়। এ ছাড়া দীর্ঘস্থায়ী ফুসফুস সংক্রমণ বা শিল্প দূষণকারী পদার্থের সংস্পর্শ এ ধরনের ক্ষতির জন্য দায়ী হতে পারে। ধূমপানের সময়কাল ও তীব্রতার ওপর নির্ভর করে ঝুঁকি বাড়ে। পরিবেশ ও কর্মক্ষেত্রের নানা দূষণ ও গাড়ির ধোঁয়া ফুসফুসের ক্যান্সারের কারণ হতে পারে। তাই কাঠ বা কয়লা পোড়ানোর ধোঁয়া বা যানবাহনের ধোঁয়া থেকে নিজেকে রক্ষা করা জরুরি। শিল্প-কারখানায় কাজ করার সময় মাস্ক ব্যবহার করা উচিত।
লক্ষণ
♦ একটানা বহুদিন ধরে কাশি, কফের সঙ্গে রক্তপাত।
♦ ধূমপায়ী বা ব্রংকাইটিসের রোগীর সাধারণ কাশির ধরন পরিবর্তন হয়ে তীব্রতা বেড়ে যাওয়া।
♦ খুসখুসে কাশির সঙ্গে শ্বাসকষ্টও এর লক্ষণ হতে পারে। অনেক সময় রোগীরা একে অ্যালার্জি বা হাঁপানি ভেবে অবহেলা করে থাকে।
♦ বুকে বা কাঁধে ব্যথা। ৫০ শতাংশ ক্ষেত্রে রোগী বুক বা কাঁধের ব্যথা নিয়েই কেবল চিকিৎসকের শরণাপন্ন হয়।
♦ গলার স্বর পরিবর্তন।
♦ ঘন ঘন নিউমোনিয়া বা ফুসফুসের সংক্রমণ।
♦ জ্বর, ওজন হ্রাস ইত্যাদি ফুসফুসের ক্যান্সারের পরিচিত লক্ষণ।
♦ দেহের অন্য কোনো অঙ্গের ক্যান্সার ছড়িয়ে পড়ে ফুসফুসে বাসা বাঁধতে পারে। ব্রেস্ট, কোলন, প্রোস্টেট ক্যান্সার ফুসফুসে বেশি ছড়ায়। এ ধরনের রোগের ইতিহাস থাকলে ফুসফুসজনিত কোনো উপসর্গকেই অবহেলা করা যাবে না।
অধূমপায়ীরাও কেন আক্রান্ত হয়?
যদিও ধূমপান ফুসফুসের ক্যান্সারের প্রধান কারণ, অধূমপায়ীরাও ঝুঁকিমুক্ত নয়। গবেষণায় দেখা গেছে, প্রায় ১০ থেকে ১৫ শতাংশ ফুসফুসের ক্যান্সার এমন ব্যক্তিদের মধ্যে দেখা যায়, যারা কখনো ধূমপান করেনি।অধূমপায়ীরা পরিবেশগত বিভিন্ন ঝুঁকির মুখোমুখি হতে পারে, এর মধ্যে অন্যতম হলো রেডন গ্যাসের সংস্পর্শ। এটি একটি প্রাকৃতিক তেজস্ক্রিয় গ্যাস, যা মাটি ও শিলা থেকে উৎপন্ন হয়। বাসাবাড়িতে প্রবেশ করে এটি বিপজ্জনক মাত্রায় জমা হতে পারে, বিশেষত যেসব বাড়িতে সঠিকভাবে বায়ু চলাচলের ব্যবস্থা নেই। অনুমান করা হয়, রেডন গ্যাসের কারণে প্রায় ১০ শতাংশ ফুসফুসের ক্যান্সার ঘটে, যার মধ্যে অধূমপায়ীরাও অন্তর্ভুক্ত।
অন্যান্য কারণ
বায়ুদূষণ অধূমপায়ীদের জন্য আরেকটি বড় ঝুঁকি। যানবাহন, কল-কারখানা এবং বিদ্যুেকন্দ্র থেকে নির্গত সূক্ষ্ম কণা ও ক্ষতিকর গ্যাসও শ্বাসযন্ত্রের দীর্ঘস্থায়ী রোগ এবং ক্যান্সারের জন্য দায়ী। বর্তমানে বায়ুদূষণ এতটাই বেড়েছে, তাই বাইরে চলাফেরার সময় মাস্ক ব্যবহার করা উচিত সবার। কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, অতিরিক্ত দূষিত পরিবেশে বসবাসকারীদের মধ্যে অধূমপায়ীদের ফুসফুসের ক্যান্সার হওয়ার ঝুঁকিও ধূমপায়ীদের সমান।ফুসফুসের ক্যান্সারের আরো একটি বড় কারণ হলো অ্যাসবেস্টস। যদিও অনেক দেশে এর ব্যবহার নিষিদ্ধ বা সীমিত, তবু এটি অনেক কর্মক্ষেত্রে ঝুঁকি হিসেবে রয়ে গেছে। বংশগত কারণও ফুসফুসের ক্যান্সার হওয়ার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখে। কিছু জেনেটিক মিউটেশন ফুসফুসের কোষকে কার্সিনোজেনিক পদার্থের প্রতি আরো বেশি সংবেদনশীল করে তোলে। যদিও এই জেনেটিক ফ্যাক্টর তুলনামূলকভাবে বিরল, এটি অধূমপায়ীদের মধ্যে ফুসফুসের ক্যান্সারের অন্যতম কারণ।
প্রতিরোধ
ফুসফুসের ক্যান্সার একটি জটিল রোগ, যা প্রায়ই দেরিতে শনাক্ত হয়। ফলে এটি চিকিৎসার জন্য আরো কঠিন হয়ে ওঠে। তবে ঝুঁকি কমানোর জন্য বেশ কিছু প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব। ধূমপায়ীদের জন্য প্রথম পদক্ষেপ হলো ধূমপান ছেড়ে দেওয়া। দীর্ঘদিন ধূমপান করার পরও ধূমপান ছেড়ে দিলে ফুসফুসের ক্যান্সারের ঝুঁকি অনেকাংশে কমে। তবে ঝুঁকি পুরোপুরি দূর হয় না।ধূমপান ছাড়ার জন্য নিকোটিন রিপ্লেসমেন্ট, আচরণগত মানসিক থেরাপি এবং কিছু ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শে ওষুধ ব্যবহার করা যেতে পারে। অধূমপায়ীদের বায়ুদূষণের সংস্পর্শ কমানো এবং বাড়িতে রেডন গ্যাস শনাক্তকরণের জন্য পরীক্ষা করা জরুরি।
শনাক্তকরণ ও চিকিৎসা
ফুসফুসের ক্যান্সারের চিকিৎসায় আগাম শনাক্তকরণ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ফুসফুসের এক্স-রে এবং সিটি স্ক্যানের মতো পরীক্ষার মাধ্যমে এর মধ্যে কোনো প্রকার অস্বাভাবিকতা থাকলে তা ধরা পড়ে। যারা দূষিত এলাকায় বাস করে, অ্যাসবেস্টস বা অন্যান্য বিষাক্ত পদার্থের সংস্পর্শে ছিল বা যাদের পরিবারে ফুসফুসের ক্যান্সারের ইতিহাস রয়েছে, তাদের নিয়মিত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ও শনাক্তকরণ পরীক্ষা করা উচিত।ক্যান্সারের ধরন, অবস্থান ও স্টেজ অনুযায়ী চিকিৎসকরা এর চিকিৎসায় করণীয় কী তা নির্ধারণ করবেন। রেডিওথেরাপি, কেমোথেরাপি বা অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে এবং টিউমার অপসারণের মাধ্যমে এর চিকিৎসা করা যেতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে হয়তো প্রয়োজন হতে পারে ফুসফুস প্রতিস্থাপনের। তবে প্রাথমিক অবস্থায় শনাক্ত হলে রোগটি নিরাময়যোগ্য।








