চর্যাপদ একটি কবিতা-গুচ্ছ বা গানের সংকলন, যা প্রাচীন বাংলা ভাষায় রচিত এবং ধর্মীয় ও দার্শনিক ভাবনায় পরিপূর্ণ। এতে মোট ৪৬টি পদ রয়েছে, যেগুলো রচনা করেছেন বৌদ্ধ সহজিয়া সাধকরা। এই কবিতাগুলিকে “চর্যা” বলা হয় এবং এগুলোর মাধ্যমে মূলত আত্মসাধনা, মানবজীবনের অনিত্যতা, কামনা-বাসনা থেকে মুক্তি ও ধ্যানমগ্ন জীবনের কথা রূপকভাবে প্রকাশ করা হয়েছে।
নিচে কয়েকটি উল্লেখযোগ্য চর্যাপদের নমুনা এবং কবিদের নামসহ তুলে ধরা হলো—
“সব বাঢ়ি গেলা, মন্ডল গেলা, গেলা কাল।
মোরা কাহা ন পাব, ভোরা তু ভেল।।”
অর্থ: সব কিছুই শেষ হয়ে গেছে—সময়, স্থান, মন—তখন আমি কোথায় আশ্রয় নেব?
“চরি গেছি চন্ডালে
উপায় কর মধুমালে।”
অর্থ: আমি চণ্ডালের ঘরে গিয়ে সাধনা করছি—ওহে প্রিয়, তুমি উপায় বলো, কিভাবে মুক্তি পাব?
“ডোম্বী ডোম্বী বোল, নাগর বাদে দোল।
চন্ডালী নাচে ঠমকি, চেপে ধরি ঢোল।”
অর্থ: রূপকভাবে জীবন ও চেতনার প্রকাশ এখানে চণ্ডালী, নাগর আর ঢোলের মাধ্যমে বোঝানো হয়েছে—ধর্ম ও জীবনের অন্তর্নিহিত ছন্দ ও সংঘাত।
“গুড়্ফু গাবাক গুড়ফে গাম,
উড়ি উড়ি জইলা ভবসিন্ধু।”
অর্থ: সাধক বলছেন, তিনি জ্ঞান ও ধ্যানের পাখা মেলে ভবসিন্ধু (জীবনের দুঃখসাগর) পেরিয়ে গেছেন।
“জহ হোয় দিবস, তহ হোয় রাইণ,
নিচে উপ্পর কিম পাইব ঠাই?”
অর্থ: যেখানে দিন, সেখানে রাতও—উপরে নিচে কোথাও কি কোনো আশ্রয় আছে?
উপসংহার:
চর্যাপদ কেবল ধর্মীয় সাধনার গান নয়—এটি বাংলা ভাষার জন্মলগ্নের সাহিত্যিক পরিচয় বহন করে। এই কবিতাগুচ্ছ বাংলা সাহিত্যের এক মূল্যবান ধন এবং ভাবজগতের গভীরতম নিদর্শন।