ভাওয়াল রাজার ইতিহাস
ভাওয়াল রাজা ছিলেন তৎকালীন পূর্ববঙ্গের (বর্তমানে বাংলাদেশের গাজীপুর অঞ্চলে) ভাওয়াল রাজ্যর জমিদার পরিবারের অন্যতম সদস্য। ভাওয়াল রাজপরিবার ব্রিটিশ ভারতের অন্যতম ধনী জমিদার পরিবার ছিল। কিন্তু এই রাজপরিবারের ইতিহাস যতটা গৌরবের, ততটাই রহস্যময় ও নাটকীয় এক ঘটনা কেন্দ্র করে ভাওয়াল রাজাকে নিয়ে গড়ে উঠেছে এক অবিশ্বাস্য কিংবদন্তি — যা ইতিহাসে “ভাওয়াল সন্ন্যাসী মামলা” নামে পরিচিত।
ভাওয়াল রাজা, যার আসল নাম ছিল রমেন্দ্র নারায়ণ রায়, তিনি ছিলেন ভাওয়াল পরিবারের কুমার বা রাজপুত্র। ১৯০৯ সালে মাত্র ২৫ বছর বয়সে তৎকালীন কলকাতায় চিকিৎসার জন্য পাঠানো হয় তাকে। সেখানে বলা হয়, সিফিলিসে আক্রান্ত হয়ে তিনি মারা যান এবং তার মৃতদেহ কালীঘাটে দাহ করা হয়। কিন্তু এরপর থেকেই শুরু হয় ইতিহাসের অন্যতম চাঞ্চল্যকর অধ্যায়।
দাবি করা হয়, প্রায় ১২ বছর পর, এক সন্ন্যাসীর বেশে একজন পুরুষ হঠাৎ করে গাজীপুরে উপস্থিত হন। দেখতে অনেকটা ভাওয়াল কুমারের মতো হওয়ায় জনমনে গুঞ্জন ওঠে—এ কি সত্যিই সেই রাজা? এরপর তিনি দাবি করেন, তিনি রমেন্দ্র নারায়ণ রায়, ভাওয়ালের কুমার, যাকে ভুলভাবে মৃত ভেবে দাহ করার চেষ্টা করা হয়েছিল। তিনি সন্ন্যাসী বেশে হিমালয়ে আশ্রয় নেন এবং পরে স্মৃতি ফিরে পেয়ে নিজ বাড়িতে ফিরে আসেন।
এই পরিচয় যাচাই এবং জমিদারি উত্তরাধিকারের জন্য ১৯৩০ সালে মামলা শুরু হয় যা ১৯৩৯ সাল পর্যন্ত চলে। মামলায় ভারতীয় উপমহাদেশের অনেক গুণী আইনজীবী, ডাক্তার, সাক্ষী ও ইংরেজ সরকার পর্যন্ত জড়িত ছিল। দীর্ঘ বিচার শেষে আদালত রায় দেয়—এই সন্ন্যাসীই প্রকৃত ভাওয়াল রাজা।
রায় পাওয়ার এক বছরের মধ্যেই, ১৯৪৬ সালে এই ভাওয়াল রাজা মারা যান।
ভাওয়াল রাজার এই বিস্ময়কর জীবনের উপর ভিত্তি করে নাটক, বই, সিনেমা তৈরি হয়েছে। বাংলা সিনেমা “এক যে ছিল রাজা” (২০১৮) এই ঘটনার ওপর ভিত্তি করেই নির্মিত। এছাড়াও ভাওয়াল সন্ন্যাসীর কাহিনি দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম বিস্ময়কর ও আলোচিত ইতিহাস হিসেবে বিবেচিত হয়।
এই ইতিহাস কেবল জমিদারি রাজনীতির নয়, বরং স্মৃতি, পরিচয়, বিশ্বাস ও ন্যায়বিচারের জটিল প্রশ্নগুলোর প্রতিচ্ছবি।