বরেন্দ্র অঞ্চলের কৃষিতে এক সময় সেচের মৌসুম মানেই ছিল অনিশ্চয়তা। কোথাও বিদ্যুতের অভাব, আবার কোথাও ডিজেলের চড়া দাম ও সংকট- সব মিলিয়ে সময় মতো জমিতে পানি দেয়া ছিল কৃষকদের জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ। তবে সেই চিত্র এখন বদলাতে শুরু করেছে। সূর্যের আলোকে কাজে লাগিয়ে সেচ দেয়ার পরিবেশ বান্ধব প্রযুক্তি ধীরে ধীরে কৃষকদের কাছে নতুন আস্থার নাম হয়ে উঠছে।
‘রাজশাহী বিভাগ কৃষি উন্নয়ন প্রকল্প’-এর আওতায় নবায়ন যোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো, সেচ ব্যয় কমানো এবং পানির দক্ষ ব্যবহার নিশ্চিত করতে বরেন্দ্র অঞ্চলে সম্প্রসারণ করা হচ্ছে সৌর শক্তি চালিত সেচ প্রযুক্তি।
বিনা মূল্যে প্রযুক্তি ও মাঠ পর্যায়ের চিত্র : প্রকল্পের আওতায় কৃষকদের সম্পূর্ণ বিনা মূল্যে ৩টি ক্যাটেগরিতে সোলার ইরিগেশন ব্যবস্থা নির্মাণ করে দেয়া হয়েছে : ফিক্সড সোলার ইরিগেশন (২ অশ্বশক্তি) : ২৪টি (নির্দিষ্ট জমিতে নিয়মিত সেচের জন্য) পোর্টেবল সোলার ইরিগেশন : ৮টি (সহজেই স্থানান্তর যোগ্য, ভিন্ন ভিন্ন প্লট বা বাগানে দ্রুত সেচের জন্য), পৃসিশন সোলার ইরিগেশন : ১০টি (এক একর আয়তনের ফল বাগানের জন্য), এর ফলে জাতীয় বিদ্যুৎ সংযোগ বা ডিজেলের ওপর নির্ভর না করেই প্রান্তিক কৃষকরা প্রয়োজন অনুযায়ী সেচ দিতে পারছেন। বিদ্যুৎ বিহীন প্রত্যন্ত এলাকাতেও এটি সহজে পরিচালনা করা যাচ্ছে।
ফল বাগানে ডৃপ ইরিগেশন ও পানি সাশ্রয় : খরা ও পানি সংকট প্রবণ বরেন্দ্র অঞ্চলে ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর দ্রুত নিচে নেমে যাওয়ায় পানি সাশ্রয়ী প্রযুক্তির গুরুত্ব বাড়ছে। প্রকল্পের আওতাভুক্ত ‘পৃ সিশন সোলার ইরিগেশন’ প্রযুক্তিতে সৌর চালিত পাম্পের সাথে ‘ডৃপ ইরিগেশন’ যুক্ত করে গাছের গোড়ায় ফোটা ফোটা পানি দেয়া হয়। এতে পানির অপচয় উল্লেখযোগ্য ভাবে কমেছে এবং মাটির আর্দ্রতা বজায় থাকছে, যা ফলের উৎপাদন ও গুণগত মান বাড়াতে সাহায্য করছে।
কৃষক ও কর্মকর্তাদের সন্তুষ্টি : রাজশাহী জেলার মোহনপুর উপজেলার উপকারভোগী কৃষক আনারুল বলেন ‘আগে ডিজেল চালিত পাম্প দিয়ে সেচ দিতে অনেক খরচ হতো, সময় মতো ডিজেলও পাওয়া যেত না। এখন সৌর শক্তিতে জমিতে পানি দিচ্ছি। এই জমি আগে এক ফসল হতো এখন এই সৌর শক্তি ব্যবহারের ফলে তিন ফসল হচ্ছে। পাশাপাশি ২০ জন কৃষকও তাদের জমিতে সেচ দিতে পারছে। যেখানে এক বিঘা জমি সেচ দিতে দুই হাজার টাকার বেশি লাগত সেই খানে অর্ধেক টাকায় অন্যান্য কৃষকরা সেচ দিতে পারছে এবং এক ফসলি জমি তারা তিন ফসলে উন্নিত করতে পেরেছে। খরচ ও পানির অপচয় দুটোই কমেছে, গাছের পরিচর্যাও সহজ হয়েছে।’
রাজশাহীর পবা উপজেলার কৃষি কর্মকর্তা মো. আব্দুল মান্নান জানান, প্রযুক্তির কার্যকারিতা মাঠ পর্যায়ে এরই মধ্যে প্রমাণিত। বরেন্দ্র অঞ্চলের মতো খরা প্রবণ এলাকায় জাতীয় গৃড বা ডিজেলের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে কৃষকদের সক্ষমতা বাড়াতে এটি ভূমিকা রাখছে। ভবিষ্যতে এর পরিধি আরো বাড়ানো গেলে পানি ব্যবস্থাপনা উন্নত করা সম্ভব হবে।
প্রযুক্তি সম্প্রসারণের মাধ্যমে রাজশাহী বিভাগের কৃষি উন্নয়ন’ প্রকল্পের নানা সুফল তুলে ধরে কৃষিবিদ এস.এম হাসানুজ্জামান বলেন, গত দুই বছরে রাজশাহী বিভাগের বিভিন্ন জেলায় ৩২টি সোলার সেচ পাম্প স্থাপন করা হয়েছে। এর ফলে বিদ্যুৎ বা ডিজেলের ওপর নির্ভর না করে সূর্যের আলোকে কাজে লাগিয়ে নিরবচ্ছিন্ন সেচ সুবিধা পাচ্ছেন কৃষকরা। এটি যেমন জাতীয় বিদ্যুতের ঘাটতি মেটাতে সাহায্য করছে, তেমনই কৃষকদের সেচ খরচ প্রায় শূন্যে নামিয়ে এনেছে।
তিনি উল্লেখ করেন, খরা প্রবণ বরেন্দ্র অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় এতদিন গভীর নল কূপগুলোর সেচ এলাকা (কমান্ড এরিয়া) কমে যাচ্ছিল। পানির অভাবে অনেক জমিতে বছরে মাত্র ১-২টির বেশি ফসল ফলানো সম্ভব হতো না। তবে সোলার পাম্প স্থাপনের পর সেই চিত্র বদলে গেছে; এখন পূর্বে অনাবাদি ও পতিত থাকা জমিতে অনায়াসেই বছরে ৩টি ধানসহ অন্যান্য বৈচিত্র্যময় ফসল ফলানো সম্ভব হচ্ছে।
ডিজেল ও ফার্নেস অয়েল আমদানির ওপর দেশের নির্ভরতা কমাতে সোলার সেচ প্রযুক্তি অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা রাখছে। প্রাথমিক স্থাপন খরচ কিছুটা বেশি হলেও সামান্য রক্ষণাবেক্ষণেই এ পাম্পগুলো ২০ থেকে ২৫ বছর পর্যন্ত নিরবচ্ছিন্ন সেবা দিয়ে থাকে।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা নতুন সোলার পাম্প স্থাপনের পাশাপাশি বর্তমানে চালু থাকা ডিজেল ও বিদ্যুৎ চালিত সেচ পাম্পগুলোকে সোলার সিস্টেমে রূপান্তর করার জন্য একটি নতুন প্রকল্প গ্রহণের পরিকল্পনা করছি।’