সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬, ১০:৫৮ অপরাহ্ন
নোটিশঃ
জনপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল প্রমিনিউজবিডি ডটকম এর পরিক্ষামূলক সম্প্রচার চলছে। সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। তার মানে এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা লেখার অংশবিশেষ কিংবা ছবি বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রচার বা প্রকাশ করা নিষিদ্ধ।

সোনার তরির সৌন্দর্য সমকাল

ঢাকা অফিস
  • আপডেট: শুক্রবার, ৭ আগস্ট, ২০২৬
  • ৮ বার পড়া হয়েছে

আমাদের সময় কলেজ পর্যায়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘সোনার তরী’ কবিতটি পাঠ্য ছিল। তখনই কবিতাটির সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয়। আমাদের বাংলার শিক্ষক আতাউর রহমান। তিনি কবিতার ক্লাস নিতেন। তাঁর পড়ানোর কায়দাটা গতানুগতিক ছিল না। পাঠ্য বিষয়ের সূত্র ধরে তিনি নানা বিষয় টেনে আনতেন। তাঁর বলার ভঙ্গিটা ছিল আকর্ষণীয়। আমরা মুগ্ধ হয়ে শুনতাম। রবীন্দ্রনাথের ‘সোনার তরী’ নিয়ে পরপর কয়েকটি ক্লাস নিলেন। বললেন এ কবিতা লেখার পটভূমি, এতে বর্ষার সৌন্দর্য বর্ণনার নিপুণতার কথা, কৃষকের অসহায়ত্ব ইত্যাদি। বললেন বাহ্যিক বর্ণনার অন্তরালে থাকা মানবজীবনের এক চিরসত্য পরিণতির কথাও। স্যারের কথা কিছু বুঝেছি, অনেকটাই থেকে গেছে না-বোঝার মধ্যে। তবে স্যার যখন ‘সোনার তরী’ আবৃত্তি করতেন, তখন একধরনের সুরমূর্ছনা শুধু শ্রবণেন্দ্রিয় নয়, মনও ছুঁয়ে যেত।
আমাদের কলেজে বাৎসরিক ‘সাংস্কৃতিক সপ্তাহ’ হতো। নানা বিষয়ের প্রতিযোগিতা। আমি দুটি প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করতাম– স্বরচিত কবিতা পাঠ এবং আবৃত্তি। স্বরচিত কবিতা পাঠে আমি কখনও পুরস্কার পাইনি, প্রতিবছর পুরস্কার পেয়েছি রবীন্দ্রনাথের ‘সোনার তরী’ আবৃত্তি করে। আমার এলাকায় কোনো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হলে, আমার কাছে দর্শকের চাওয়া থাকত, ‘সোনার তরী’ আবৃত্তির। আমিও মনের আনন্দে সেটি আবৃত্তি করতাম। এভাবেই রবীন্দ্রনাথের সোনার তরীর সঙ্গে সম্পর্ক নিবিড় থেকে নিবিড়তর হয়েছে।
দু-চার চরণ পদ্য লেখার সুবাদে বাংলা ছন্দ সম্পর্কে ভাসা ভাসা একটা ধারণা জন্মেছিল। কিন্তু শুদ্ধতম কিছু নয়। লিখি, পত্রপত্রিকায় ছাপাও হয়। একসময় আমাদের (তরুণদের) নিয়মিত যাতায়াত ছিল ‘দৈনিক বাংলা’ পত্রিকায় কবি আহসান হাবীবের দপ্তরে। তিনি এ পত্রিকার সাহিত্য সম্পাদক। আমাদের ছিল তাঁর হাত দিয়ে একটা কবিতা ছাপা হওয়ার দুর্মর বাসনা। তিনি তরুণদের পেলে সানন্দে কবিতাবিষয়ক কথাবার্তা বলতেন। আহসান হাবীব একবার বলেছিলেন, রবীন্দ্রনাথ না পড়ে কোনো বাঙালি কবি হতে পারবে না। আমি সাহস করে বলে ফেললাম, পড়ি তো। হাবীব ভাই, কিছু সময় চুপ থাকলেন। জামার খুঁটে চশমার কাচ মুছতে মুছতে বললেন, রবীন্দ্রনাথের কী কী পড়েছ? আমার তো গলা শুকিয়ে কাঠ। আমতা আমতা করে রবীন্দ্রনাথের কয়েকটা বইয়ের নাম বললাম (বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষা পাসের জন্য কিছু বই তো নাড়াচাড়া করতে হয়ই)। তবে ‘সোনার তরী’ গ্রন্থের নাম বেশ বড় করে বলেছিলাম। এরপর হাবীব ভাই এই বইয়ের প্রিয় কবিতার কথা জানতে চাইলেন। বলেছিলাম– সোনার তরী। কেন প্রিয়? এ প্রশ্নের গোছানো কোনো জবাব সেদিন দিতে পারিনি।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বিস্তর লিখেছেন। বেশি লিখে ভালো লেখার এমন উদাহরণ বাংলা সাহিত্যে খুব বেশি নেই। তাঁর বিপুল লেখালেখি থেকে একটি প্রিয় কবিতার কথা বলা কঠিন। এ কবির লেখা আমার প্রিয় কবিতার সংখ্যা অনেক। তবে তালিকা করতে গেলে প্রথমেই সোনার তরী এসে যায়।
‘সোনার তরী’ কবিতাটি শিলাইদহ পদ্মার বোটে ১২৯৮ বঙ্গাব্দের ফাল্গুন অর্থাৎ ইংরেজি ১৮৯২ সালে লেখা। মনে খটকা লাগতে পারে, ভরা বসন্তে ভরা বর্ষার কবিতা! কবি যা দেখলেন তা নিয়ে তাৎক্ষণিক কবিতা হতে পারে। আবার না-ও হতে পারে। এটা নির্ভর করে কবির মানসলোকের প্রস্তুতির ওপর। তাই সোনার তরী প্রসঙ্গে বলা যায় যে, কবিতাটি সেই জাতের কবিতা ‘যা মুক্তদ্বার অন্তরের সামগ্রী, বাইরের সমস্ত কিছুকে আপনার সঙ্গে মিলিয়ে নেয়’।
‘মানসী’ পর্বের ‘সোনার তরী’ কাব্যের প্রথম এবং নামকবিতা সোনার তরী। রবীন্দ্রনাথের বহুল পঠিত ও আলোচিত কবিতার মধ্যে একটি। সাদা চোখে দেখলে দেখা যাবে এই কবিতায় চিরায়ত গ্রামবাংলার দৃশ্যপটের নিটোল বর্ণনা এতে উপস্থাপিত হয়েছে। বর্ষার ঘন মেঘে আকাশ ছেয়ে আছে। ধান কাটা হয়ে গেছে। একজন (চাষি) ভরসাহীন নদীকূলে বসে আছ। ওপারে যেতে হবে। কিন্তু উপায়? দেখা গেল নৌকা বেয়ে গান কে একজন আসছে।

মনে হলো চেনা। তাকে অনুনয় করা হলো, তুমি যেখানে ইচ্ছে যাও। তুমি শুধু আমার সোনার ধানগুলো নিরাপদ স্থানে নিয়ে দাও। মাঝি এলো, সব ধান নৌকায় ওঠাল। চাষি বলছে, এতদিনের কষ্টের সকল ধান তো নিলে, এবার করুণা করে হলেও আমাকে নাও। চাষি দেখল তার ধানেই নৌকা ভরে গেছে, তাকে নেওয়ার মতো কোনো জায়গা নেই। ধান বোঝাই নৌকা চলে গেল, চাষি নদীর শূন্য কূলে একা পড়ে থাকল। কবিতাটির এমন দৃশ্যপটের অন্তরালে গভীর অর্থ নিহিত আছে। এটি একটি রূপকাশ্রয়ী কবিতা। কবিতার প্রতিটি শব্দের আভিধানিক অর্থ ছাপিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় রূপক অর্থ। সেই ব্যাখ্যা বিভিন্নজন বিভিন্নভাবে করেছেন। ‘সোনার তরী’ কবিতার ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, ‘‘মহাকাল প্রবাহিত হইয়া চলিয়া যাইতেছে, মানুষ তাহার কাছে নিজের সমস্ত কৃতকর্ম কীর্তি সমর্পণ করিতেছে এবং মহাকাল সেই সমস্তই গ্রহণ করিয়া এক কাল হইতে অন্য কালে, এক দেশ হইতে অন্য দেশে বহন করিয়া লইয়া যাইতেছে, সেগুলিকে রক্ষা করিতেছে। কিন্তু যখন মানুষ মহাকালকে অনুরোধ করিল-যে ‘এখন আমারে লহো করুণা করে’ তখন মানুষ নিজেই দেখিল যে–
‘ঠাঁই নাই, ঠাঁই নাই! ছোট সে তরী
আমারি সোনার ধানে গিয়াছে ভরি!’
মহাকাল মানুষের কর্মকীর্তি বহন করিয়া লইয়া যায়, রক্ষা করে; কিন্তু স্বয়ং কীর্তিমান মানুষকে সে রক্ষা করিতে চায় না। হোমার বাল্মীকি ব্যাস কালিদাস শেক্সপিয়ার নেপোলিয়ান আলেকজান্ডার প্রতাপসিংহ প্রভৃতির কীর্তিকথা মহাকাল বহন করিয়া লইয়া চলিতেছে, কিন্তু সেইসব কীর্তিমানকে রক্ষা করে নাই। যিনি প্রথম অগ্নি আবিষ্কার করিয়াছিলেন, বস্ত্রবয়নের তাঁত ইত্যাদি আবিষ্কার করিয়াছিলেন, তাহাদের নাম ইতিহাস রক্ষা করে নাই, কিন্তু তাহাদের কীর্তি মানবসভ্যতার ইতিহাসে অমর হইয়া আছে।” ‘সোনার তরী’ কবিতার অন্তর্গত ভাবনা, রূপকতা ইত্যাদি নিয়ে আলোচনা-সমালোচনার যেমন শেষ নেই, এর ছন্দ-প্রকরণ নিয়েও মতান্তর রয়েছে। প্রথমেই প্রশ্ন আসে কবিতাটি কোন ছন্দে লেখা? অক্ষরবৃত্ত না মাত্রাবৃত্তে? সংখ্যায় কম হলেও কেউ কেউ এটিকে অক্ষরবৃত্তে লেখা বলতে চেয়েছেন। কবিতা শুরু হয়েছে ‘গগনে গরজে মেঘ’ এমন উচ্চারণে। এই বাক্যাংশ তো প্রথম পাঠে অক্ষরবৃত্তে সুপ্রচলিত ৩+৩+২=৮ মাত্রার চাল মনে হতে পারে। অক্ষরবৃত্তে চরিত্রমতে পরের পর্ব হবে ছয় মাত্রার। কিন্তু আছে ‘ঘন বরষা’ পাঁচ মাত্রা। যারা কবিতাটিকে অক্ষরবৃত্ত বলেন, তাদের বক্তব্য, দ্বিতীয় পর্বটি উনমাত্রার পর্ব। ছয় মাত্রার জায়গায় পাঁচ মাত্রা অর্থাৎ এক মাত্রা কম।
পুরো কবিতায় একই হাল। তবে শেষের আগের
পঙ্‌ক্তিতে সমস্যা পাকিয়েছে ‘শূন্য’ শব্দটি। এটি অক্ষরবৃত্তে দুই মাত্রার শব্দ। তাহলে পর্বটি হয়ে যায় ছয় মাত্রার।
‘সোনার তরী’ কবিতায় চরণের সংখ্যা ৩০, স্তবক ছয়টি, প্রতি স্তবকে পাঁচটি চরণ। এই পাঁচ চরণের মধ্যে প্রথম দুই চরণে মাত্রা রয়েছে ১৩, মাঝে এক চরণে মাত্রা সংখ্যা ১৬। আবার পরের দুই চরণের প্রতিটিতে মাত্রাসংখ্যা ১৩। এমন সুনিপুণ বিন্যাসে কবিতাটি রচিত হয়েছে। এই কবিতায় শব্দসংখ্যা ১৭৩। এর মধ্যে একটিমাত্র যুক্তবর্ণ আছে, সেটি হচ্ছে ‘শূন্য’। রবীন্দ্রনাথ এমনটি কেন করলেন! এটা ইচ্ছাকৃত, না অসাবধানতাবশত? রবীন্দ্রনাথ এমন ভুল করবেন– এটি ভাবা যায় না। কবিতায় যুক্তবর্ণ ব্যবহার নিয়ে মতভিন্নতা আছে। বুদ্ধদেব বসু কবিতায় মাঝে মাঝে যুক্তবর্ণ ব্যবহরের পক্ষে। তাঁর মন্তব্য, ‘যুক্তবর্ণের অভাব বাংলা ছন্দ বেশিক্ষণ সহ্য করতে পারে না।’ তবে রবীন্দ্রনাথের ‘সোনার তরী’ নিয়ে মত একটু পাল্টেছেন। তিনি বলেছেন, ‘ধ্বনিসংঘাতহীন এই কবিতাটি (সোনার তরী) কোথাও এলিয়ে পড়েনি, একটিও বাহুল্য শব্দ নেই এতে, কোনো পার্শ্বোক্তি বা আতিশয্য নেই।’ প্রবোধা চন্দ্র সেনের বক্তব্য– ‘সোনার তরী কবিতায় রবীন্দ্রনাথ যুক্তবর্ণের রুদ্ধদলকে এড়িয়েই সচেতনতার পরিচয় দিয়েছেন।’
শেষ পর্যন্ত অধিকাংশ ছান্দসিক ‘সোনার তরী’ কবিতাটিকে মাত্রাবৃত্তের কবিতাই বলেছেন। প্রচলিত পয়ার হয় চৌদ্দ মাত্রার। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘সোনার তরী’ কবিতায় মাত্রাসংখ্যা একটি কমিয়ে দিয়েছেন বটে। এতে কবিতা পাঠে কোনো স্বরচ্যুতি ঘটে না। কবিতায় ব্যবহৃত শব্দগুলো জলবিন্দুর মতো স্বচ্ছ। জলবিন্দুতে আলোর প্রতিফলনে রঙের দৃষ্টিসহনীয় বিচ্ছুরণ ঘটে। বর্ণনার সারল্য, নিপুণ রচনাশৈলী, গভীর দর্শন, শব্দের স্বচ্ছতা, ধ্বনিমাধুর্য ও ব্যঞ্জনা মিলে সোনার তরী একটি কালোত্তীর্ণ চিরপ্রিয় কবিতা।

মাকে আমার পড়ে না মনে। / শুধু কখন খেলতে গিয়ে হঠাৎ অকারণে/একটা কী সুর গুনগুনিয়ে/ কানে আমার বাজে,/মায়ের কথা মিলায় যেন/ আমার খেলার মাঝে।

একটি শিশুর অদ্ভুত এক অভিমানহত উচ্চারণের মধ্য দিয়ে কবিতাটি সূচনা হয়েছে। শিশুটি বলছে মাকে তার মনে পড়ে না। এ উচ্চারণটি আজ থেকে শতবর্ষ আগে ভারতীয় পাঠক আত্মাকে নাড়া দিয়েছিল। যেমনটি পশ্চিমের আত্মাকে নাড়িয়ে দিয়েছিল এর ঠিক ২০ বৎসর পর লেখা আলবেয়ার কামুর উপন্যাসের প্রথম বাক্য ‘মা আজ মারা গিয়েছেন, অথবা হয়তো কাল, আমি জানি না।’ কামুর বাক্যটির ভেতর অর্থহীনতা ও উদাসীনতা আছে, কিন্তু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের উচ্চারণের ভেতর ছিল স্মৃতিবাহী আর্তি। পরবর্তী পঙ্‌ক্তিতেই শিশুটি বলেছে, ‘শুধু কখন খেলতে গিয়ে হঠাৎ অকারণে’ মাকে তার মনে পড়ে। এভাবে অকারণে নয়, পরপর তিনটি কার্যকারণসূত্রে শিশুটি তার মাকে স্মরণ করেছে, যা পাঠকের মনকে দুমড়ে-মুচড়ে দিয়েছে। লৌকিক দলবৃত্ত ছন্দে মোট ৩৩ পঙ্‌ক্তিতে অসম বিন্যাসে শিশুটি তার আবছায়া মাতৃস্মৃতি তুলে ধরেছে। কবিতাটি ১১৯ শব্দে টানা লেখা। একদম মেপে মেপে প্রতি ১১ পঙ্‌ক্তির তিনটি স্তবকে শিশুটি তিনটি স্মৃতি অনুষঙ্গ বর্ণনা করেছে। এ হিসেবে, ভাবগত দিক থেকে কবিতাটি প্রতিটি সমান ১১ পঙ্‌ক্তি করে তিনটি স্তবকে রচিত। প্রতিটি স্তবক শুরু হয়েছে মাকে আমার পড়ে না মনে– সঞ্চারী দিয়ে। প্রথমত অস্বীকার করে তারপর শিশুটি এক-একটি অনুষঙ্গে তিনটি অন্তরার ভেতর দিয়ে মায়ের স্মৃতি তুলে ধরেছে।
প্রথম স্তবকে শিশুটির কাছে তার হারানো মা এসেছেন গান হয়ে। শিশুটি বলেছে, খেলতে গিয়ে কী একটা সুর তার কানে বাজে। তারপর তার মনে হয়েছে এটি মায়ের গাওয়া গান। কিন্তু সে নিশ্চিত নয়, এটি সত্যিই মায়ের গাওয়া গান কিনা? বলছে, হয়তো মা গাইত দোলনা ঠেলে ঠেলে। তারপর যেন সিদ্ধান্তের মতোই বলেছে মা চলে গিয়েছে কিন্তু গানখানি ফেলে গেছে। যে গান এখন তার খেলার ভেতর এসে মিশে যাচ্ছে আনমনে।
দ্বিতীয় স্তবকে মা এসেছেন ফুলের গন্ধ হয়ে। আশ্বিনে শিউলি ফুল ফুটলে মা সে ফুলের গন্ধের মধ্য দিয়ে আসেন। তার অনুমান মা আশ্বিনের শারদীয় পূজার সময় হয়তো ফুলের সাজি বয়ে আনতেন। এখন তো আর মা নেই। তাই পূজার গন্ধই এখন মায়ের গন্ধ হয়ে আসে।
তৃতীয় স্তবকে মা এসেছেন জগদ্ব্যাপৃত নীল আকাশ হয়ে। তার মনে হয়েছে মা কবেকার সময়ে তাকে কোলে নিয়ে যেমন একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতেন, সে দৃষ্টি মা ভুবনে রেখে গেছেন। সে দৃষ্টিতেই যেন সারা আকাশ অনিমেখ চেয়ে আছে তার দিকে।
শিশুটির মাতৃস্মৃতি তাড়নে আমরা মায়ের বিকাশ লক্ষ্য করি। যে মা গান হয়ে প্রথম স্তবকে কবিতার শিশুমনে প্রবেশ করেছিলেন দ্বিতীয় স্তবকে তিনি দেবীতে রূপান্তরিত হয়েছেন। এবং তৃতীয় স্তবকে তিনি জগন্মাতায় পরিণত হয়েছেন।
মাকে স্মরণ করা এই বৃহৎ শিশুটির নাম রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর (১৮৬১-১৯৪১)। কবিতাটি রবীন্দ্রনাথে ‘বলাকা’ পর্বে (১৯১৪-১৯২৯) ৯ আশ্বিন ১৩২৮ বঙ্গাব্দ (সেপ্টেম্বর, ১৯২১) তারিখে রচিত। পরের বছর কবিতাটি ‘মনে পড়া’ শিরোনামে ‘শিশু ভোলানাথ’ কাব্যগ্রন্থে স্থান পায়। আমরা জানি বলাকা পর্বে রবীন্দ্র আধ্যাত্মিক পর্ব পার হয়ে গতিবাদের জগতে প্রবেশ করেছিলেন। যেখানে পর্বত অবধি আকাশের নিরুদ্দেশ মেঘ হতে চাচ্ছে। ‘শিশু ভোলানাথ’ কাব্যগ্রন্থের ভূমিকায় আমাদের জানানো হয়েছে, রবীন্দ্রনাথকে একজন পাঠক বলছেন বলাকা পর্বের কাব্যে তিনি সন্তুষ্ট নন। অনেক পাঠকই মনে করছেন কবির লেখনীশক্তি কমে এসেছে। তাই রবীন্দ্রনাথ শিশুরূপ ধরে এই কাব্যগ্রন্থটি রচনা করেছেন। ‘শিশু ভোলানাথ’-এর পুরো কাব্যে একটি কল্পনাপ্রবণ শিশুকে আমরা দেখতে পাই যে নানার ধরনের কল্পনা করে চলেছে। এই কল্পনার একটা বড় অংশ জুড়ে আছে মায়ের সাথে কল্পনায় ক্রীড়ারত শিশু। সেখানে মায়ের সাথে শিশুটির সম্পর্ক লুকোচুরির। সেখানে নানা বাহানা আর হারিয়ে যাবার ছল আছে। এ কাব্যগ্রন্থের শিশুটি মায়ের সাথে নানা ছল করেছে, হারিয়েছে আর ধরা দিয়েছে। কিন্তু মায়ের চেহারাটি তার কাছে আবছায়া।সেটা কোনো মানবীয় মূর্তি নয়। প্রকৃতি রূপ রস গন্ধের নানা আবহ, অনুষঙ্গমাত্র। মা কুয়াশাচ্ছন্ন। বিশেষত এই ‘মনে পড়া’ কবিতা মা। কিন্তু কেন? এই কেন এর উত্তরটি লুকিয়ে আছে রবীন্দ্রনাথের শৈশব স্মৃতির ভেতর। রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘জীবনস্মৃতি’তে (১৯১২) যে মায়ের স্মৃতি উল্লেখ করেছেন, তাতে স্পষ্টতই বোঝা যায় রবীন্দ্রনাথের সাথে তার মায়ের খুব ঘনিষ্ঠ শৈশব স্মৃতি নেই। রবীন্দ্রনাথ লালিত পালিত হয়েছেন গৃহকর্মীদের কাছে। সব সময় দূর থেকেই তিনি মাকে দেখেছেন। দেখেছেন মা সারদা দেবী চৌকিতে বসে খুড়ি শুভংকরী দেবীর সাথে তাস খেলছেন। রবীন্দ্রনাথরা কাছে গেলে গৃহকর্মীরা সরিয়ে এনেছে। রবীন্দ্রনাথ পড়া ফাঁকি দিতে চাইলে মা বড়জোর ওকালতি করেছেন। খবর পাঠিয়েছেন রবী আজ পড়তে যাবে না। যা-ও মাকে অনতিদূর থেকে দেখেছেন, মা দীর্ঘস্থায়ী অসুস্থ হলে একেবারেই চোখের আড়ালে চলে গেছেন। মায়ের মৃত্যুদৃশ্যও রবীন্দ্রনাথের কাছে স্পষ্ট নয়। সারদা দেবী ১৮৭৫ সালের ১০ মার্চ গভীর রাতে মারা যান। তখন রবীন্দ্রনাথ ১৩ বৎসর পার হয়ে মাত্র চৌদ্দতে পা দিয়েছেন। পরবর্তী সময়ে রবীন্দ্রনাথ ‘জীবনস্মৃতি’র ‘‘মৃত্যুশোক’’ অধ্যায়ে লিখেছেন, ‘‘যে-রাত্রিতে তাঁহার মৃত্যু হয় আমরা তখন ঘুমাইতেছিলাম, তখন কত রাত্রি জানি না, একজন পুরাতন দাসী আমাদের ঘরে ছুটিয়া আসিয়া চীৎকার করিয়া কাঁদিয়া উঠিল, ‘ওরে তোদের কী সর্বনাশ হল রে।’ … স্তিমিত প্রদীপে, অস্পষ্ট আলোকে ক্ষণকালের জন্য জাগিয়া উঠিয়া হঠাৎ বুকটা দমিয়া গেল কিন্তু কী হইয়াছে ভালো করিয়া বুঝিতেই পারিলাম না। প্রভাতে উঠিয়া যখন মা’র মৃত্যুসংবাদ শুনিলাম তখনও সে-কথাটার অর্থ সম্পূর্ণ গ্রহণ করিতে পারিলাম না। বাহিরের বারান্দায় আসিয়া দেখিলাম তাঁহার সুসজ্জিত দেহ প্রাঙ্গণে খাটের উপরে শয়ান। কিন্তু মৃত্যু যে ভয়ংকর সে-দেহে তাহার কোনো প্রমাণ ছিল না– সেদিন প্রভাতের আলোকে মৃত্যুর যে-রূপ দেখিলাম তাহা সুখসুপ্তির মতোই প্রশান্ত ও মনোহর। জীবন হইতে জীবনান্তের বিচ্ছেদ স্পষ্ট করিয়া চোখে পড়িল না। কেবল যখন তাঁহার দেহ বহন করিয়া বাড়ির সদর দরজার বাহিরে লইয়া গেল এবং আমরা তাঁহার পশ্চাৎ পশ্চাৎ শ্মশানে চলিলাম তখনই শোকের সমস্ত ঝড় যেন একেবারে এক-দমকায় আসিয়া মনের ভিতরটাতে এই একটা হাহাকার তুলিয়া দিল যে, এই বাড়ির এই দরজা দিয়া মা আর একদিনও তাঁহার নিজের এই চিরজীবনের ঘরকরনার মধ্যে আপনার আসনটিতে আসিয়া বসিবেন না।’’
সারদা দেবী ছিলেন যশোরের মেয়ে। সারদাসুন্দরী তাঁর প্রকৃত নাম ছিল না। এটা ঠাকুরবাড়ির দেওয়া নাম। মাত্র ছয় কি আট বৎসর বয়সে ১৪ বৎসরের দেবেন্দ্রনাথের সাথে তাঁর বিয়ে হয়। বিয়ের সময় ঠাকুরবাড়ির সবচেয়ে জৌলুসপূর্ণ সময়। সারদা দেবীকে ঠাকুরবাড়ির জমিদারির আবহেই গড়ে তোলা হয়। তাঁর ব্যক্তিত্ব ও আভিজাত্য সে সময়ের জমিদারি মাপেই তৈরি হয়। সে আভিজাত্য এমনই পৃথিবীর কোথাও এ রকম অভিজাত পরিবারে শিশুরা মায়ের কাছে বড় হয় না। পরিচালিকাদের কাছে বড় হয়। এটা এখনও পৃথিবীর অনেক অভিজাত পরিবারসমূহে বিদ্যমান। রবীন্দ্রনাথের ভাগ্যে তাই ঘটেছিল। ফলে তিনি মাকে কখনও খুব কাছে পাননি। ফলে মায়ের সাথে তার এক অনতিক্রম্য দূরত্ব ছিল। যা পরে কবিমনে অভিমান রাগ অনুরাগে রূপান্তরিত হয়েছিল। রবীন্দ্রনাথ মাকে স্বপ্নে দেখার কথা বলেছেন। বলেছেন, ‘…কাল রাত্রে স্বপ্ন দেখলুম, আমি যেন বাল্যকালেই রয়ে গেছি। গঙ্গার ধারের বাগানবাড়িতে মা একটি ঘরে বসে রয়েছেন। মা আছেন তো আছেন। তাঁর আবির্ভাব তো সকল সময়ে চেতনাকে অধিকার করে থাকে না। আমিও মাতার প্রতি মন না দিয়ে তাঁর ঘরের পাশ দিয়ে চলে গেলুম।’ মায়ের সাথে বিচ্ছেদের, দূরত্বের একটি আভাস। ছোটবেলায় কুস্তি লড়ে ঘরে ফিরলে স্নান করানোর সময় মায়ের শুভ্র আঙুলের ছোঁয়া পাওয়ার কথা রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন। ‘বড়ো হইলে যখন বসন্ত প্রভাতে একমুঠা অনতিস্ফুট মোটা মোটা বেলফুল চাদরের প্রান্তে বাঁধিয়া খ্যাপার মতো বেড়াইতাম। তখন সেই কোমল চিক্কণ কুঁড়িগুলি ললাটের ওপর বুলাইয়া প্রতিদিন আমার মায়ের শুভ্র আঙ্গুলগুলি মনে পড়িত।’ আমরা আশ্চর্য হয়ে লক্ষ্য করি আমাদের এই ‘মনে পড়া’ কবিতার দ্বিতীয় স্তবকে মা এই ফুলের অনুষঙ্গেই ফিরে এসেছেন গন্ধ হয়ে।  কবিতা লৌকিক ছন্দে, সহজ কাব্যভাষায়, প্রায় নিরলংকারভাবে শিশুদের উপযোগী করে রচিত। রবীন্দ্রনাথ সত্যিকারে শিশুরূপ ধারণ করে শিশুদের জন্য কবিতাটি লিখেছেন। কিন্তু কবিতাটি অসাধারণ কাব্যশক্তিগুণে রবীন্দ্র কাব্যধারায় অসাধারণ হয়ে আছে।

একে অন্যের কাছে যাই। যাওয়াই নিয়তি। দুঃখ ভারাক্রান্ত মন নিয়ে আমরা যাই। সুখে উছল হয়েও যাই একে অন্যের কাছে। যে যায়, সে কেন যায়? কেন আমরা যাই আকুল হয়ে? যার কাছে যেতে মন করে আকুলি-বিকুলি, কী আছে তার কাছে?
তার কাছে আছে আশ্রয়।
মানুষ আশ্রয় খোঁজে। মানুষ খোঁজে শুশ্রূষা। ভেঙে পড়া মানুষ খোঁজে আবার উঠে দাঁড়াবার প্রত্যয়। মানুষ প্রাণপণে চায়, কোথাও আশ্চর্য কিছু একটা আচমকা ঘটে যাক; হঠাৎ আলোর ঝলকানিতে আঁধার ঘুচে যাক। আর মনের কানে গুঞ্জরিত হতে থাক– ‘কী জানি কী হলো আজি, জাগিয়া উঠিলো প্রাণ’! ‘আজি, জাগিয়া উঠিলো প্রাণ’! ‘জাগিয়া উঠিলো প্রাণ’!
আহা! এটুকুই। শুধু এটুকুই চায় মানুষ। জাগানিয়া এই পরশটুকু পেলেই মানুষ বর্তে যায়।
কিন্তু বর্তে যাওয়া কি আর অতই সহজ!
আলট্রা-নগরায়ণের নাগপাশে যখন তুমি বাঁধা, যখন তোমার কেউ নেই বুকে-পিঠে কোমল করে হাত বুলিয়ে সাহস এবং আদর দেবার, তখনও কি আর ভেঙে পড়া যায়? নাহ। যায় না। যায় না বলেই তেমন দিনে মানুষ নিজেই নিজের কপালে খায় চুমু, হাত ধরে বন্ধুর মতো টেনে নিয়ে যায় প্রভাতের দিকে।
‘নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ’ আমার কাছে তেমনই একটি কবিতা। আশাজাগানিয়া গানের নাম ‘নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ’। প্রাণে ভোর এনে দেওয়া পুলকের নাম ‘নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ’। এই কবিতাটির কাছে এলেই একটা আনন্দ অনুভূতি হয়। মনে হয়:
‘না জানি কেন রে এত দিন পরে জাগিয়া উঠিল প্রাণ।
জাগিয়া উঠেছে প্রাণ,
ওরে উথলি উঠেছে বারি,
ওরে প্রাণের বাসনা প্রাণের আবেগ রুধিয়া রাখিতে নারি।’
২.
নিরালম্ব আমি আকুল হয়ে যার দ্বারে বারংবার খুঁজি আশ্রয়, তিনি আর কেউ নন, রবীন্দ্রনাথ। আমার ঠাকুর। আমার নায়ক।
নিবিড় বেদনার দিনে তিনি ধরে থাকেন হাত। মধুর মতন মাখো মাখো দিনেও তিনিই সঙ্গী। মধুর দিনে তিনি আরও ততোধিক মধু ঢেলে দেন। যখন ‘পরানে বাজে বাঁশী, নয়নে বহে ধারা’, যখন বলার মতন মুখে নাই ভাষা, তখনও তিনিই নাথ, করেন উদ্ধার; মূকের জবানে জোগান কথা।
তাই, আমার সকল পথ ঘুরে ঘুরে তাঁর কাছে যায়।
বয়স যখন আরো অনেক কম, মাঝে মাঝেই ভাবতাম, যদি কোথাও ভিনগ্রহে বা চিরতরে একলা একা নির্বাসনে দূরদ্বীপে অকস্মাৎ চলে যেতে হয়, যদি সাথে করে কেবল একটি মাত্র বস্তু নেবারই থাকে অনুমতি, তাহলে কী নেবো আমি?
হাতড়ে দেখি, আমার চাই রবীন্দ্রনাথ।
আমার সকল পথ ঘুরে-ফিরে দেখি তাঁর কাছে যায়। তিনিই তো নাথ সোমার।

না, রবীন্দ্রনাথের কবিতাগুলো চাই না আমার। চাই না তাঁর সঞ্চয়িতা কি গল্পগুচ্ছ। চাই না তাঁর উপন্যাসও। আমার চাই শুধু তাঁর গান।
মন ভালোতে রবীন্দ্রনাথ। মন খারাপে রবীন্দ্রনাথ। দ্বিধার দিনে রবীন্দ্রনাথ। নাই ভাষা নাই, ভাঙা-জবান, আমার কথা দাও বলে দাও, হে মোর নাথ। সকল কথা বলবে গানে, গীতলতায়–মালকোষে কি ভৈরবীতে কিংবা ধরো আশাবরী–মুখের ত্বকে, প্রাণের ’পরে প্রেমিকজনের স্পর্শ তুমি সুরের রূপে। তুমিই আমার মাতৃপ্রতিম।
গানগুলো সব লাগবে আমার। গানগুলো সব আলো। তোমার গানগুলো সব ভোর এনে দেয়। তোমার গানগুলো সব আমার জন্য: ‘প্রাণ হয়ে যায় ভোর’।
তাই, গীতবিতান আমার গীতা। কম্পিত হিয়া থরোথরো নিয়ে আমি কাতর অর্জুন। তুমি আমার কৃষ্ণ নাথ ওগো! জীবনের কুরুক্ষেত্রে তুমি দাও পথের দিশা।
তুমিই আমার বড় প্রেমিক। তুমিই আমার পরকীয়া। নও মুসলিমের নয়া দেশে, হিংসা এবং দ্বেষের তলে, গজ ফিতাতে ওরা তোমায় মেপে দেখুক; তোমার কোথায় ছিদ্র আছে সেসব নিয়ে ফূর্তি করুক, তুমিই তবু প্রেমিক আমার–সংগোপনে তোমায় আমি প্রেম করি গো, তোমার লাগি ‘সকল দাগে হব দাগি। অনুরাগী।’ নাথ হে আমার, ‘যে পঙ্কে ওই চরণ পড়ে তাহারি ছাপ বক্ষে মাগি’।
৩.
পাথর গড়িয়ে নামবে। কিন্তু নিয়তির অভিশাপের নিকুচি করবে সিসিফাস। পাথর ঠেলার আসা-যাবার পথি মধ্যে গাইবে তবু, ‘মরণ রে, তুঁহু মম শ্যাম সমান’!
রাজা প্রকট হবে যক্ষপুরে। ক্ষমতার আসনে বসে কেড়ে নেবে জনতার কথা বলার অধিকার। তবু ক্ষেপা রঞ্জনেরা থাকবে। তবু সংসারে নন্দিনী বিরাজে। তবু তারা ব্রহ্মাণ্ড মায়ের প্রতিনিধি–সোনার খনির অসাড়তা পড়বে ধরা প্রেমের কাছে।
‘নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ’ কবিতারই আরেক নাম ‘রঞ্জন’, আরেক নাম নন্দিনী–ভেঙে পড়ার বিপরীতে যারা জোগায় সাহস।
সাহস জোগানোরই আরেক নাম ‘নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ’। এমনকি বিধাতার সিদ্ধান্তের বিপরীতে দাঁড়িয়ে আশার-বীজ ছড়ানো কবিতা দেয় ভয় ভাঙার ডাক:
কেন রে বিধাতা পাষাণ হেন,/চারিদিকে তা’র বাঁধন কেন।
ভাঙ্ রে হৃদয় ভাঙ্ রে বাঁধন,/সাধ্ রে আজিকে প্রাণের সাধন,
লহরীর পরে লহরী তুলিয়া/আঘাতের পরে আঘাত কর্!
মাতিয়া যখন উঠেছে পরান,/কিসের আঁধার কিসের পাষাণ,
উথলি যখন উঠেছে বাসনা,/জগতে তখন কিসের ডর।
জীবনের সেই কোন বোঝা না-বোঝার কালে ‘নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ’ হয়ে ওঠেছিল আমার প্রিয় কবিতা। আজও এর প্রিয়তা কমে তো না-ই, বরং কিছু বেড়েছে।
প্রাণ যে ভোর হয়ে যায়, ভোর যে আশার রূপক, মানুষ যে চিরকাল আশায় গড়ে বসতি, নদীর এ-পাড় ভেঙে ও-পাড় যে গড়ে, জোয়ার-ভাটার টলটলা জলের বাংলায় ভেঙে পড়ার পরে আবার উঠে দাঁড়ানোই যে চিরায়ত মৌলিক দর্শন–সেই একই কথা মনে করায় নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ।
আশার বীজ ছড়িয়ে দেওয়া আমার নাথ ওহে, ২৫শে বৈশাখ আর ২২শে শ্রাবণের কিতাবী স্মরণ দিয়ে বলো কী আর আসে যায়! তুমিই তো দিলের রাজা! দাও হে শ্রী চরণ তোমার, প্রণতির উছিলায় রাখি তব পাদপদ্মে আমার চুম্বন।
তুমি রবি, আমি সোম। রবি ছাড়া সোমের বলো আলোর উৎস কী? মায়ের পেটে জন্ম নিয়ে তোমার পেটে মেলে নব জন্ম আবার প্রেমের ভাষায়।
তুমি শামস–সূর্য হে আমার, আমি শশী হয়ে চিরকাল প্রাণে ধরে রাখবো তোমার গানের তরঙ্গ সকল। তুমি বহু রূপে, বহু গানে, বহু কবিতায় আদতে তো মায়ের মতন খানিক দূরে বসে দু’হাতে বাজিয়ে করতালি বলো সোৎসাহে,
‘মাতিয়া যখন উঠিছে পরান,/কিসের আঁধার, কিসের পাষাণ!
উথলি যখন উঠিছে বাসনা,/জগতে তখন কিসের ডর’!
গানের সুরে সুরে প্রেমিকের মতন তুমি ‘তুলে নিয়ে দুলাবে ওই বাহুদোলার দোলে’। প্রেয়সীর মতন প্রাণে আমার বাজবে অহর্নিষ ‘সুখে আমায় রাখবে কেন, রাখো তোমার কোলে।/যাক-না গো সুখ জ্বলে’।
মানুষের সমবেত স্মৃতির নাম আশা। মানুষের সমবেত প্রতিরোধের নাম আশা। একাকী এক মানুষের ঘুরে দাঁড়াবার গল্পের আরেক নাম আশা। দোহে মিলে একা হবার গল্পে আবার ‘বঁধু কোন আলো লাগলো চোখে’র আরেক নাম আশা। আশা মানে রবি। রবি মানে নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ। নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ মানে প্রাণ হয়ে আছে ভোর:

ভালো লাগলে সংবাদটি শেয়ার করুন

এই বিভাগের আরো সংবাদ
© All rights reserved © 2026 PromiNewsBD.com
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com