কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সবচেয়ে প্রিয় ঋতু ছিল বর্ষা। মেঘ, বৃষ্টি, নদী, কদম ফুল আর বাংলার সবুজ প্রকৃতি তাঁর কাব্য, গান ও গল্পে অনুপম সৌন্দর্যে বারবার ফিরে এসেছে।বর্ষার সজল আবহে তিনি যেমন আবিষ্কার করেছিলেন বাংলার প্রকৃতির গভীর রূপ, তেমনই মানুষের আনন্দ, বেদনা, প্রেম ও বিরহকেও প্রকাশ করেছিলেন অনন্য শিল্পভাষায়। তাই বাঙালির কাছে বর্ষা মানে রবীন্দ্রনাথ, আর বাইশে শ্রাবণ মানে এক গভীর বিষাদের দিন। ১৩৪৮ বঙ্গাব্দের এই দিনে প্রিয় ঋতুর কোলেই নিভে গিয়েছিল বিশ্বকবির জীবনপ্রদীপ।
আজ বৃহস্পতিবার, বাইশে শ্রাবণ।বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ৮৫তম প্রয়াণবার্ষিকী। দিনটি উপলক্ষে দেশের বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সাহিত্য সংগঠন নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করবে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের এই মহীরুহকে।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাছে মৃত্যু ছিল না জীবনের সমাপ্তি, ছিল এক অনন্ত যাত্রার দ্বার। তাঁর কবিতা ও গানে মৃত্যুকে ঘিরে নেই কোনো আতঙ্ক, বরং আছে শান্ত গ্রহণ, আত্মসমর্পণ এবং চিরসুন্দরের সঙ্গে মিলনের আকাঙ্ক্ষা।তিনি লিখেছিলেন, ‘মরণ রে, তুঁহু মম শ্যাম সমান’, যেখানে মৃত্যু হয়ে ওঠে প্রিয়তমের আরেক রূপ। আবার ‘আছে দুঃখ, আছে মৃত্যু, বিরহদহন লাগে/তবুও শান্তি, তবু আনন্দ, তবু অনন্ত জাগে’ পঙ্ক্তিতে জীবনের ক্ষণস্থায়িত্বের মধ্যেও তিনি খুঁজে পেয়েছেন অনন্তের আশ্বাস। অমোঘ নিয়তি, যে কবি মৃত্যুকে এত গভীর সৌন্দর্যে উপলব্ধি করেছিলেন, তাঁর নিজের জীবনপ্রদীপও নিভে গিয়েছিল প্রিয় ঋতু বর্ষার এই দিনে।
রবীন্দ্রনাথ ছিলেন বিস্ময়কর বহুমাত্রিক প্রতিভা। কাব্য, গান, উপন্যাস, ছোটগল্প, নাটক, প্রবন্ধ, ভ্রমণকাহিনি, শিশুসাহিত্য, চিত্রকলা, শিল্প-সাহিত্যের এমন কোনো শাখা নেই, যেখানে তিনি তাঁর অমর কীর্তি রেখে যাননি।তাঁর দুই হাজারেরও বেশি গান ‘রবীন্দ্রসংগীত’ নামে বাঙালির সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাঁর রচনায় যেমন প্রকৃতি ও প্রেমের অপূর্ব মেলবন্ধন রয়েছে, তেমনই রয়েছে মানবতা, স্বাধীনতা, সাম্য, অসাম্প্র্রদায়িকতা এবং বিশ্বমানবতার চিরন্তন আহবান।
১৯১৩ সালে ‘গীতাঞ্জলি’ কাব্যগ্রন্থের জন্য রবীন্দ্রনাথ সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার অর্জন করে শুধু প্রথম বাঙালি নন, সমগ্র এশিয়ার প্রথম নোবেলজয়ী সাহিত্যিক ইতিহাসে স্থান করে নেন। তাঁর এই অর্জনের মধ্য দিয়ে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য বিশ্বদরবারে এক অনন্য মর্যাদা লাভ করে।
সাহিত্য ও শিল্পচর্চার পাশাপাশি শিক্ষাব্যবস্থা, কৃষি, গ্রামীণ উন্নয়ন ও সমাজসংস্কারেও তিনি রেখে গেছেন অসামান্য অবদান। শান্তিনিকেতনে প্রতিষ্ঠা করেন বিশ্বভারতী, যেখানে প্রকৃতিনির্ভর মুক্ত শিক্ষার এক নতুন দৃষ্টান্ত গড়ে ওঠে। আবার বর্তমান বাংলাদেশের শাহজাদপুর, শিলাইদহ ও পতিসরে জমিদারি পরিচালনার সময় কৃষকের জীবনমান উন্নয়ন ও পল্লী উন্নয়নে নানা উদ্যোগ নেন তিনি।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং মহান মুক্তিযুদ্ধেও রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টি বাঙালির প্রেরণার উৎস হয়ে উঠেছিল। তাঁর লেখা ‘আমার সোনার বাংলা’ বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত। অন্যদিকে ভারতের জাতীয় সংগীত ‘জন গণ মন’-এর রচয়িতাও তিনি। বিশ্বের ইতিহাসে দুটি দেশের জাতীয় সংগীতের স্রষ্টা হিসেবে এমন বিরল সম্মান আর কোনো কবির ভাগ্যে জোটেনি।
সময়ের প্রবাহে সমাজ বদলেছে, প্রযুক্তি বদলেছে, মানুষের জীবনযাত্রাও পাল্টেছে। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ কখনো পুরনো হননি। তাঁর সাহিত্য, সংগীত ও দর্শন আজও নতুন প্রজন্মকে ভালোবাসা, মানবিকতা, সৌন্দর্যবোধ এবং মুক্তচিন্তার শিক্ষা দেয়। এ জন্য বাইশে শ্রাবণ কেবল একজন কবির প্রয়াণের দিন নয়; এটি বাঙালির আত্মপরিচয়, সংস্কৃতি ও চিরন্তন মানবিক চেতনার অন্যতম স্মরণদিবস। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর সৃষ্টির মধ্য দিয়েই বেঁচে আছেন, থাকবেন অনন্তকাল।