সোমবার, ০২ নভেম্বর ২০২৬, ১১:৪১ পূর্বাহ্ন
নোটিশঃ
জনপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল প্রমিনিউজবিডি ডটকম এর পরিক্ষামূলক সম্প্রচার চলছে। সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। তার মানে এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা লেখার অংশবিশেষ কিংবা ছবি বিনা অনুমতিতে অন্য কোথাও প্রচার বা প্রকাশ করা নিষিদ্ধ।

ভিনির সাম্বায় ফিরল সুন্দর ব্রাজিল

ঢাকা অফিস
  • আপডেট: শুক্রবার, ২৬ জুন, ২০২৬
  • ৩৭ বার পড়া হয়েছে

বেঁচে থাকলে তাঁকে হয়তো আজ হাসিমুখে লন্ডনের কোনো টেলিভিশনের চ্যানেলের টক শোতে দেখা যেত। বছর কুড়ি আগে তিনিই তো ফিফার এক অনুষ্ঠানে গিয়ে রোনালদো, রিভালদো আর রোনালদিনহোকে সামনে দেখে বলেছিলেন, ‘ঈশ্বর ব্রাজিলিয়ানদের ফুটবলীয় স্বভাব ও ছন্দ দিয়েছেন। বল যখন ওদের পায়ে থাকে, তখন আর সেটি শুধু খেলা থাকে না; ওটা হয়ে ওঠে সাম্বা নাচ।’ ইংল্যান্ডের সেই মহান ফুটবলার স্যার ববি চার্লটন নিশ্চয়ই আপ্লুত হতেন আজকের এই ব্রাজিল দলটাকে দেখে। সাম্বা সুরের সেই ‘জোগো বোনিতো’কে নতুন প্রজন্মের যারা বুড়োদের ড্রয়িংরুমের গল্প বলে আটকে রাখতে চেয়েছিল (‘জোগো বোনিতো’ পর্তুগিজ শব্দ, এর অর্থ ‘সুন্দর খেলা’), এবার তারাও উপভোগ করতে শুরু করেছে ব্রাজিলের সেই সৌন্দর্যটা; যা এবারের আসরের প্রতিটি ম্যাচে বারবার ফিরে আসছে একজনের জাদুকরি পায়ে– ভিনিসিয়ুস হোসে পাইক্সাও দে অলিভেইরা জুনিয়র। সংক্ষেপে যাঁকে ভিনি বলে বুক চাপড়ায় সারাবছর ইউরোপীয় ফুটবলে বুঁদ হয়ে থাকা সমর্থকরা। মায়ামির হার্ডরক স্টেডিয়ামে সেই ভিনির জোড়া গোলের জাদুতেই স্কটল্যান্ডকে ৩-০ গোলে হারিয়ে গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয়ে শেষ বত্রিশের নকআউট পর্বে উঠে গেছে ব্রাজিল।

গ্রুপ পর্বের তিনটি ম্যাচ যেন ভিনির পায়ের জাদুতে লেখা একেকটা আলাদা রূপকথা। টানা তিন ম্যাচে পকেটে পুরলেন ম্যাচসেরার ট্রফি। একে ঠিক পারফরম্যান্স বলা ভুল হবে, এ তো আসলে ফুটবল মাঠের ক্যানভাসে এক ক্ষ্যাপাটে শিল্পীর একাধিপত্য! সান্তিয়াগো বার্নাব্যুর সেই চেনা অহংকারটাই এখন ব্রাজিলের ৭ নম্বর জার্সিতে ঠিকরে বেরোচ্ছে। লোকে বলে, ইতিহাস বড় নির্মম; কিন্তু ইতিহাস যখন ট্রফি হাতে নিয়ে ভিনির মতো কোনো জাদুকরের পায়ের কাছে এসে লুটোপুটি খায়, তখন বলতে বাধ্য হতেই হয়– এ কেবল হ্যাটট্রিক নয়, এ আসলে রাজপুত্রের রাজসিংহাসন বুঝে নেওয়ার রাজকীয় ইশতেহার! মরক্কো, হাইতি আর স্কটল্যান্ড– এই বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বের প্রতিটি ম্যাচে গোল! তিন ম্যাচে ৪, ব্রাজিলের ইতিহাসে এই কীর্তি কার কার আছে জানা আছে কি? জারজিনহো, রোমারিও, রিভালদো আর স্বয়ং পেলের! তাদের প্রত্যেকেই বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বের সব ম্যাচে গোল করেছিলেন। ঠিক ২৪ বছর পর রোনালদো-রিভালদোদের সেই বিখ্যাত সিংহাসনে পা তুলে বসলেন ভিনি। শুনলে খুশি হবেন সেলেসাও সমর্থকরা যে এই রেকর্ড ব্রাজিলকে যেবার যেবার ছুঁয়েছে, প্রতিবার তারা বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়েছে! ১৯৭০, ১৯৯৪ আর ২০০২। এবার কি তবে ভিনির পায়ে ২০২৬-এর পালা? ইতিহাসের ইঙ্গিত কিন্তু তেমনই।

একটা প্রচণ্ড জেদ, ভেতরে ভেতরে সারাক্ষণ একটা প্রতিবাদের আগুন থাকে এই ছেলেটার মধ্যে। ফুটবলারদের বংশলতিকা খোঁজার চল ফুটবল দুনিয়ায় নতুন নয়। ব্রাজিলের ফুটবল ফেডারেশন একবার একটি বিশেষ ডিএনএ টেস্টের মাধ্যমে জানতে পারে, ভিনির পূর্বপুরুষ আসলে ক্যামেরুনের তিকার উপজাতির। ইউরোপের ট্র্যাক হুটে মোড়ানো যে ফুটবলারকে রিয়াল মাদ্রিদের আঙিনায় অতি আধুনিক মনে হতো, তাঁর ড্রিবলিংয়ের মধ্যে ব্রাজিলের মানুষ খুঁজে পেলেন আমাজনের গহিন অরণ্যের সেই আদিম ও বুনো ছন্দ। বিপক্ষ ডিফেন্ডারদের যখন ভিনি গতি আর মায়াবী মায়াজালে বোকা বানান, তখন বোঝা যায়– এ কোনো ইউরোপীয় একাডেমির শেখানো ব্যাকরণ নয়; এ আসলে আফ্রিকার তিকার উপজাতির সেই আদিম শিকারি প্রবৃত্তি, যা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ডিএনএর কোষে কোষে লুকিয়ে ছিল। ব্রাজিলের মানুষের কাছে এখন ভিনি হলেন সেই হারিয়ে যাওয়া রাজপুত্র, যিনি আফ্রিকা থেকে শিকড়ের শক্তি নিয়ে এসে ব্রাজিলের ফুটবল ধমনিতে নতুন রক্ত সঞ্চার করেছেন।

গোলের পর তাঁর নাচের ভঙ্গি সাধারণ কোনো উদযাপন নয়; এটি ফুটবলবিশ্বে বর্ণবাদের বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা প্রতিবাদের ভাষা ও আফ্রো-ব্রাজিলিয়ান সংস্কৃতির গর্বিত ইশতেহার মনে করা হয়। ফুটবলবিশ্বে যার পরিচিতি পেয়েছে ‘বাইলা ভিনি (নাচো ভিনি)’ নামে। স্কটল্যান্ড ডিফেন্সকে এই ‘বাইলা ভিনি’তেই নাচিয়েছিল ব্রাজিল। মায়ামিতে একটা বিশুদ্ধ সাম্বা জলসায় রিয়াল মাদ্রিদের সেই চেনা রাজপুত্র যখন ব্রাজিলের হলুদ জার্সিতে ডি-বক্সের বাঁ দিক থেকে চিতার গতিতে কাট-ইন করে ঢুকছিল, তখন মনে হয় বুড়োরা পেলের ভূতই দেখছিল। বক্সে ভিনির এই খেলার শৈলী যেন এক আদিম হিংস্রতা আর জ্যামিতিক সূক্ষ্মতার মিশেল। রক্ষণের জটলার মধ্যে যেখানে একটা সুচ গলানোর জায়গা থাকে না, সেখানে ভিনি আবিষ্কার করছে গোটা একটা মহাসমুদ্র। দ্বিতীয় গোলটা যখন মাথা ছুঁইয়ে করলেন, ওটা তো তাঁর ব্রাজিলের হয়ে ক্যারিয়ারের প্রথম হেডার গোল! তবে ভিনির এই মহাকাব্যের পেছনে যে অদৃশ্য সুতাটা কাজ করেছে, তা হলো ব্রাজিলের নতুন মিডফিল্ড। ব্রুনো গিমারায়েস আর পাকুয়েতারা সে রাতে মাঠে যেন কার্পেট বিছিয়ে রেখেছিলেন। মিডফিল্ড থেকে যখনই কোনো থ্রু পাস ডানা মেলছিল, তা যেন ভিনির গতির সঙ্গে আগে থেকেই চুক্তি করে আসছিল। আর ডাগআউটে বসে চুইংগাম চিবোতে চিবোতে সেই বিখ্যাত ভুরু নাচানো কার্লো আনচেলত্তি তো ম্যাচের পরেই খোলসা করলেন আসল রহস্য। আনচেলত্তি বললেন, ‘লোকে বলে ভিনির ফর্মের গ্রাফ আকাশ ছুঁয়েছে। আমি বলি, ও তো সবে ওর পায়ের খেলা শুরু। আসল কাজ তো নকআউটে বাকি।’ কোচের এই আত্মবিশ্বাসই বুঝিয়ে দেয়, এই ব্রাজিল দলটা এখন ভেতর থেকে কতটা টগবগ করছে। ১৯৮২ বিশ্বকাপ থেকে টানা ১২টি বিশ্বকাপে নিজেদের গ্রুপে শীর্ষস্থান ধরে রাখা ব্রাজিল দল এবারও নকআউটের হাওয়া ড্রেসিংরুমে নিয়ে এসেছে। গ্রুপ ‘সি’র চ্যাম্পিয়ন হিসেবে ব্রাজিল ২৯ জুন টেক্সাসের হিউস্টনে গ্রুপ অব থার্টিটুতে সম্ভাব্য জাপানের মুখোমুখি হবে।

এদিন ভিনিতে বুঁদ হয়ে থাকলেও ম্যাচ শেষের সেরা দৃশ্যটা তোলা ছিল টানেলে। দীর্ঘ ৯৮২ দিন পর হলুদ জার্সিতে ফিরলেন নেইমার জুনিয়র। কুড়ি মিনিটের মতো মাঠে খেলেছেন, ভিড়বাট্টার মধ্যে যাননি তিনি। তারপরও গোলমুখে একটি শট ও দুটি সুযোগ তৈরি করেছিলেন। একটা ফাউলেরও শিকার হয়েছেন। আসলে এদিন দূর থেকেই ভিনিদের দিকে বল বাড়িয়ে গিয়েছেন। গ্যালারি দাঁড়িয়ে উঠে স্বাগত জানিয়েছে তাঁর চতুর্থতম বিশ্বকাপে। এমনকি নেইমারের জন্য জায়গা ছেড়ে দিতে কুনিয়াকেও দারুণ খুশি দেখিয়েছে। আসলে এটিই চেনা ব্রাজিল, যেখানে মাঠের শৈলীর সঙ্গে বন্ধনটাও থাকে অটুট।

ভালো লাগলে সংবাদটি শেয়ার করুন

এই বিভাগের আরো সংবাদ
© All rights reserved © 2026 PromiNewsBD.com
Theme Dwonload From ThemesBazar.Com