বিশ্বজুড়ে প্রতিনিয়ত বাড়ছে ফ্যাটি লিভার ডিজিজে আক্রান্তের সংখ্যা। এ বিষয়ে এখনো সচেতন নন অনেকেই। ফলে ফ্যাটি লিভারের প্রকোপ বেড়ে যকৃতের জটিল রোগ দেখা দেওয়ার পরই রোগীরা চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন, তত দিনে আর রোগ পুরোপুরি নিরাময়ের সম্ভাবনা থাকে না।
ফ্যাটি লিভার কী
‘ফ্যাটি লিভার ডিজিজ’ নামের মধ্যেই রয়েছে এই রোগের পরিচয়। যকৃৎ বা লিভারের মধ্যে চর্বি জমলে এটি হয়ে থাকে। বর্তমানে যেসব রোগী বিভিন্ন কারণে পেটের (Abdomen) আলট্রাসাউন্ড পরীক্ষা করছেন, তাঁদের অনেকের রিপোর্টেই এ রোগের নাম দেখা যাচ্ছে। কেউ কেউ এটিকে অবহেলা করছেন, কেউ আতঙ্কিত হয়ে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হচ্ছেন।
রোগের পর্যায়
চর্বি জমার ফলে লিভার কয়েকটি ধাপে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। প্রাথমিক পর্যায়ে লিভারের কোনো বড় ক্ষতি না করেই চর্বি জমা হতে থাকে।
উপসর্গ
প্রাথমিক পর্যায়ে ফ্যাটি লিভারের তেমন উপসর্গ না থাকলেও কিছু রোগীর ক্ষেত্রে পেটের ডান পাশে ওপরের দিকে হালকা ব্যথা থাকতে পারে। ফ্যাটি লিভার সিরোসিসে পরিণত হলে কিছু উপসর্গ দেখা দেয়। এর মধ্যে আছে পেটে পানি আসা, জন্ডিস, রক্তবমি ও অজ্ঞান হয়ে যাওয়া ইত্যাদি।
করণীয়
পেটের আলট্রাসাউন্ড পরীক্ষায় ‘ফ্যাটি লিভার’ মন্তব্য দেখে ঘাবড়ানো যাবে না। এ পরীক্ষায় অতিরিক্ত চর্বি জমার ফলে লিভারের একটি গঠনগত পরিবর্তন শনাক্ত হয়, কার্যক্ষমতা বা রোগের প্রকোপ নয়। গঠনগত পরিবর্তনের ফলে লিভারের কার্যক্ষমতা বিঘ্নিত হচ্ছে কি না সেটি জানা আবশ্যক। লিভারের কার্যক্ষমতা বিঘ্নিত হলে রক্ত পরীক্ষায় কিছু এনজাইমের মাত্রা (SGPT, SGOT) বেশি পাওয়া যায়। এ ছাড়া অ্যালবুমিন, প্রোথ্রম্বিন টাইম পরীক্ষার মাধ্যমে লিভারের কার্যক্ষমতা পরিমাপ করা হয়। এসব পরীক্ষার রিপোর্ট ভালো থাকলে দুশ্চিন্তার কারণ নেই, চিকিৎসকের ফলোআপে থাকলেই চলবে।
লিভারে চর্বি জমার কারণ জানতে ডায়াবেটিস, রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা, হেপাটাইটিস সংক্রমণ পরীক্ষা করতে হবে। এই তিনটির অবস্থার সঙ্গে ফ্যাটি লিভার ডিজিজ ওতপ্রোতভাবে জড়িত, কোনো একটি ধরা পড়লে দ্রুত সঠিক চিকিৎসা করা অত্যন্ত জরুরি।
দীর্ঘদিন চর্বি জমলে লিভারে কোলাজেন নামক ফাইবার টিস্যু তৈরি হয়। এতে লিভার ধীরে ধীরে অমসৃণ ও শক্ত হয়ে যায় এবং লিভার ফাইব্রোসিস নামক জটিল রোগের সৃষ্টি হয়। এটি নির্ণয়ের জন্য ‘ফাইব্রোস্ক্যান’ নামক পরীক্ষা করা হয়ে থাকে। ফাইব্রোস্ক্যান সব রোগীর প্রয়োজন হয় না, তাই চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া না করাই শ্রেয়।
কেন হয় এ রোগ
ডায়াবেটিক রোগীদের ফ্যাটি লিভার হওয়ার ঝুঁকি বেশি। আবার যাঁদের ফ্যাটি লিভার আছে তাঁদের ডায়াবেটিস হওয়ারও ঝুঁকি রয়েছে। স্থূলতা, কায়িক পরিশ্রমের অভাব, উচ্চ রক্তচাপ, অতিরিক্ত ফাস্ট ফুড ও তৈলাক্ত খাবার গ্রহণের ফলেও ফ্যাটি লিভার হয়ে থাকে।
চিকিৎসা ও প্রতিরোধ
ফ্যাটি লিভারের মাত্র একটি স্বীকৃত ওষুধ রয়েছে, সেটি সব রোগীর জন্য প্রযোজ্যও নয়। মূলত খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাপনে পরিবর্তন এনে চিকিৎসা করা হয়। তৈলাক্ত খাবার ও ফাস্ট ফুড পরিহার করে নিয়মিত হাঁটাচলা ও ব্যায়াম করলে ফ্যাটি লিভার অনেকটা হ্রাস পায়। যাঁদের ফ্যাটি লিভার নেই, তাঁদেরও সুষম খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলা জরুরি। তেল-চর্বি কমিয়ে শাক-সবজি ও ফলমূল খেতে হবে বেশি বেশি। প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট হাঁটা বা শারীরিক কার্যকলাপ করা জরুরি। অ্যালকোহল একেবারেই বাদ দিতে হবে। যাঁদের পরিবারে লিভার সমস্যার ইতিহাস রয়েছে তাঁদের অবশ্যই নিয়মিত ALT, AST, FibroScan ইত্যাদি পরীক্ষা করতে হবে।
সহকারী অধ্যাপক
জাতীয় গ্যাস্ট্রোলিভার ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল