সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহৃত সরঞ্জামাদি আমদানির ক্ষেত্রে একটি সহজ ও কার্যকর কাঠামো তৈরি করা হচ্ছে জানিয়ে মন্ত্রী বলেন যে এর ফলে উদ্যোক্তারা সহজে সোলার সিস্টেম স্থাপন করতে পারবেন। বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে ব্যাটারি স্টোরেজ ব্যবস্থায়। কারণ শুধু দিনের বেলায় বিদ্যুৎ উৎপাদন যথেষ্ট নয়, সন্ধ্যার পিক আওয়ারে বিদ্যুতের চাহিদা মেটাতে ব্যাটারি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জ্বালানিমন্ত্রী আরো বলেন, সরকার এমন নীতি আনতে চায়, যাতে উদ্যোক্তাদের করের চাপ কমে এবং তাঁরা সাশ্রয়ীভাবে সোলার প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে পারেন।
এদিকে বেসরকারি পর্যায়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও বিক্রয় প্রক্রিয়াকে সহজ করার লক্ষ্যে সরকার ‘মার্চেন্ট পাওয়ার প্ল্যান্ট নীতি’ বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে। এই প্রক্রিয়ায় দেশি ও বিদেশি প্রতিষ্ঠান বিনিয়োগের সুযোগ পাবে। এই নীতিমালা ২০৩০ সালের মধ্যে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে ২০ শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদনের জাতীয় লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বাংলাদেশে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার, বিশেষ করে ঘরবাড়িতে বেশ কয়েক বছর আগে শুরু করা হলেও নানা কারণে সেই মহৎ উদ্যোগটি তেমন একটা অগ্রসর হতে পারেনি। অনেকের মতে, সৌরবিদ্যুতের জন্য প্রাথমিক বিনিয়োগ বেশি হওয়ার কারণে মানুষের মধ্যে এই বিদ্যুতের ব্যবহার আশানুরূপ আগ্রহ সৃষ্টি করতে ব্যর্থ হয়। কারো অভিমত, উদ্যোগটি প্রশংসনীয় হওয়া সত্ত্বেও ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা ও যথাযথ পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে এর গতি থেমে যায়। আমরা যদি তখন থেকেই এই ক্ষেত্রটিকে গুরুত্ব দিতাম, তাহলে আজকে বিশ্বে জ্বালানির জন্য যে হাহাকার সৃষ্টি হয়েছে, তার ফলে আমাদের যে ভোগান্তি হচ্ছে, তা হয়তো অনেকটাই কম হতো। যা হোক, বিদ্যমান বাস্তবতার সম্মুখীন হতে গিয়ে বাংলাদেশের মতো অনেক দেশই সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রতি আগ্রহী হয়েছে। এ ব্যাপারে বাংলাদেশ সরকার বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন করে যে পদক্ষেপ গ্রহণ করতে যাচ্ছে, তা অবশ্যই প্রশংসার দাবি রাখে।
ঘরবাড়ি, অফিস ভবন বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার ছাড়াও আরো অনেক ক্ষেত্রে, বিশেষ করে শিল্পাঞ্চলে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের চিন্তা করা যেতে পারে। সরকার ছাড়াও সরকারি নীতিমালাকে অনুসরণ করে বেসরকারি খাত (স্থাপনাগুলোর মালিকসহ) সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন ও ব্যবহার প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ত হতে পারে। এ বিষয়ে যে ক্ষেত্রগুলোকে বিবেচনা করা যেতে পারে তার কয়েকটি হলো—(১) বাংলাদেশের মূল ভূখণ্ড থেকে যেসব এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ করা কঠিন, ওই সব এলাকায় সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন করে বিদ্যুৎ সরবরাহের সুবিধা দেওয়া যেতে পারে। (২) নদীমাতৃক বাংলাদেশে এখনো অসংখ্য ইঞ্জিনচালিত লঞ্চ, স্টিমারসহ নানা ধরনের নৌযান রয়েছে, যেগুলো যাত্রী বহন করা ছাড়াও মালপত্র পরিবহনে ব্যবহার করা হয়। সম্ভবত ওই যানগুলোতে জ্বালানি হিসেবে ডিজেল ব্যবহার করা হয়ে থাকে। আমদানি করা ওই জ্বালানির পরিবর্তে যদি প্রতিটি নৌযানের ওপরের ছাদে (নিরাপদ ব্যবস্থায়) সৌর প্যানেল বসিয়ে বিদ্যুৎ উৎপন্ন করা যায়, তাহলে অন্তত কিছুটা বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় সম্ভব। তবে প্রযুক্তিগত দিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার পরই এর বাস্তবায়ন করা যাবে। (৩) বাংলাদেশের বুকজুড়ে রয়েছে অগণিত নদ-নদী, খাল-বিল আর হাওর। এ ছাড়া দক্ষিণে রয়েছে বঙ্গোপসাগর। এসব নদ-নদী, খাল-বিল, সাগরের তীরে বা পানিতে (ভাসমান) সৌর/বায়ু বিদ্যুৎ প্যানেল স্থাপন করে বিদ্যুৎ উৎপন্ন করা যেতে পারে। তবে বিষয়টির প্রযুক্তিগত সম্ভাব্যতা অবশ্যই যাচাই করে দেখতে হবে। (৪) পৃথিবীর অনেক দেশেই লবণাক্ত পানিকে বিশুদ্ধ করার জন্য সৌরবিদ্যুৎ প্রযুক্তির সাহায্য নেওয়া হয়ে থাকে। আমাদের অনেক স্থানের নদীর পানি বর্তমানে এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে তাকে আর পানি বলা যায় না। ওই পানি আমাদের পরিবেশ এবং স্বাস্থ্যক্ষেত্রকে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে। ওই সব নদী বা জলাশয়ের পানি বিশুদ্ধকরণ প্রক্রিয়ায় সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারের চিন্তা-ভাবনা করা যেতে পারে। (৫) গ্রামাঞ্চলে রান্নার কাজে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার করা গেলে শুধু গাছপালাকে রক্ষা করা নয়, গ্যাস সিলিন্ডারের ব্যবহারও হ্রাস পেত। শুধু প্রয়োজন সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার করার উপযুক্ত সাশ্রয়ী মূল্যের সৌরচুলা নির্মাণ করে তা ব্যবহারে জনগণকে আগ্রহী করে তোলা। (৬) দেশে বড় ও মাঝারি আকারের অনেকগুলো সেতু (সড়ক ও রেল) রয়েছে। ওই সব সেতুর দুই পাশে বাস্তবতার নিরিখে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। ওই বিদ্যুৎ শুধু সেতুতে যানবাহন চলাচলের পথকেই আলোকিত করবে না, অতিরিক্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডেও নেওয়া যেতে পারে। (৭) দেশে যে রেলপথগুলো রয়েছে তার দুই ধারে সৌর প্যানেল স্থাপন করে যে বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে, তা ট্রেন চলাচলে ব্যবহার করা ছাড়াও অন্যত্র ব্যবহার করা যাবে। দেশের মহাসড়কগুলোতেও তা ব্যবহার করা যেতে পারে। আরেকটি বিষয় উল্লেখ না করলেই নয়, দিনের বেলায় উৎপাদিত বিদ্যুৎ জমা করে অন্য সময় ব্যবহার করার জন্য স্টোরেজ ব্যাটারির ব্যবস্থা করাও অত্যন্ত জরুরি।
এ প্রসঙ্গে উদাহরণ হিসেবে স্পেনের নেওয়া পদক্ষেপগুলোর কথা টানতে চাই। ২০২৪ সালে স্পেন মোট বিদ্যুতের ৫৪ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদন করেছিল। দেশটিতে ২০২৫ সালে সৌরবিদ্যুৎ থেকে সরবরাহের পরিমাণ ছিল ৬০ শতাংশের বেশি, যা ২০৫০ সাল নাগাদ ১০০ শতাংশে উন্নীত করার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা রয়েছে। স্পেনের সঙ্গে বাংলাদেশের অত্যন্ত বন্ধুত্বপূর্ণ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক বিদ্যমান থাকায় সৌর ও বায়ু বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ স্পেনের সহযোগিতা চাইতে পারে। আমার বিশ্বাস, স্পেন থেকে ইতিবাচক সাড়াও পাওয়া যাবে।
সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণভাবে পরিবেশবান্ধব। স্বল্প খরচের অর্থাৎ সবার আর্থিক সামর্থ্যের মধ্যে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন ও ব্যবহার সংক্রান্ত ব্যবস্থাপনা কার্যকর করা গেলে দেশের মানুষেরই শুধু উপকার হবে না, জ্বালানি আমদানি নির্ভরতাকেও অনেকাংশে কমিয়ে আনবে। এ ছাড়া সৌরবিদ্যুতের দামও কম হবে। বিশ্বে জ্বালানি পরিস্থিতি যা-ই হোক না কেন, যদি সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন করে আমরা সেই চাহিদা মেটাতে পারি, তাহলে বাংলাদেশের সার্বিক উন্নয়ন ধারা কখনোই ক্ষতিগ্রস্ত হবে না, জনগণকে আর ভোগান্তিতেও পড়তে হবে না। সর্বোপরি বিষয়টি অত্যন্ত জরুরি বিবেচনা করে আর সময় নষ্ট না করে আমাদের এখনই তা বাস্তবায়নে নেমে পড়তে হবে।
লেখক : সাবেক রাষ্ট্রদূত ও সচিব