আমি সেই ভিত্তিপ্রস্তরসম নথি থেকে কিছু অংশ পড়তে চাই। ‘আমরা এই সত্যগুলোকে স্বতঃসিদ্ধ বলে মনে করি : সব মানুষ সমানভাবে সৃষ্ট; স্রষ্টা তাদের কিছু অবিচ্ছেদ্য অধিকার দিয়েছেন; আর সেগুলোর মধ্যে রয়েছে জীবন, স্বাধীনতা এবং সুখের অন্বেষণ। এই অধিকারগুলো সুরক্ষিত করার জন্যই মানুষের মধ্যে সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়, যা শাসিত জনগণের সম্মতি থেকে তাদের ন্যায্য ক্ষমতা লাভ করে।
ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ ও বিরোধের প্রেক্ষাপটে স্বাধীনতার সিদ্ধান্তের যৌক্তিকতা তুলে ধরার পর, আমাদের প্রতিষ্ঠাতারা ঘোষণা করেন : ‘যুক্ত উপনিবেশগুলো স্বাধীন ও স্বতন্ত্র রাষ্ট্র এবং ন্যায়সংগতভাবেই তাদের তা হওয়া উচিত।’ এরপর তারা নিজেদের জীবন, সম্পদ এবং পবিত্র সম্মানের বিনিময়ে এই ঘোষণাকে সমর্থন করার অঙ্গীকার করেন। একটি সাহসী ঘোষণা। আমেরিকার স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র যথার্থভাবেই বিশ্বজুড়ে মানুষকে অনুপ্রাণিত করেছে।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ভাষায়, ‘একটিমাত্র পার্চমেন্টের পৃষ্ঠা এবং ৫৬টি স্বাক্ষরের মাধ্যমে আমেরিকা মানব ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ রাজনৈতিক যাত্রা শুরু করে।’ সেই সাহসী ঘোষণার পর আমাদের পূর্বসূরিরা তাঁদের স্বাধীনতার জন্য লড়াই করেন। আমেরিকার বিপ্লবী যুদ্ধ ১৭৮৩ সাল পর্যন্ত চলে, যখন প্যারিস চুক্তির মাধ্যমে যুদ্ধের অবসান ঘটে এবং যুক্তরাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব স্বীকৃত হয়।
আজকের উদযাপনের মূল প্রতিপাদ্য হলো বিপ্লবী আমেরিকা—ইংরেজ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে লড়ে বিজয় অর্জনকারী সেই সাহসী নারী ও পুরুষদের প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি, যার পথ ধরে স্বাধীনতা, আত্মনিয়ন্ত্রণ এবং ব্যক্তির অধিকারের ভিত্তিতে গণতান্ত্রিক শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়।
আমরা জানি, আমেরিকার স্বাধীনতা ছিল এক দীর্ঘ সংগ্রাম।
আজ প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নেতৃত্বে আমরা আবারও আমেরিকাকে সবার আগে রাখছি। তখনো এবং এখনো, ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ মানে আমেরিকা একা নয়। বিপ্লবী যুদ্ধের সময় আমেরিকানরা ফ্রান্স, স্পেন, এমনকি নেটিভ আমেরিকান গোষ্ঠীগুলোর কাছ থেকেও গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা পেয়েছিল।
আজ একইভাবে আমরা এমন নীতি অনুসরণ করছি, যা আমেরিকার জনগণের স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ; যেমন—আপনারাও আপনাদের নিজ নিজ দেশের জনগণের স্বার্থের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নীতি অনুসরণ করছেন। আর প্রায়ই আমরা এমন বিষয় খুঁজে পাই, যা পারস্পরিকভাবে উপকারী। এটিই কূটনীতির স্বরূপ। উদাহরণস্বরূপ, বোয়িং ও বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের সাম্প্রতিক চুক্তির কথা বলা যায়। এই চুক্তি বাংলাদেশের বেসামরিক বিমান চলাচল খাতের আধুনিকায়নে আমেরিকান বিনিয়োগের প্রতিফলন। বোয়িং শুধু উড়োজাহাজই দিচ্ছে না, বরং বাংলাদেশের পাইলট, প্রকৌশলী এবং ব্যবস্থাপনার উন্নয়নেও সহায়তা করছে। বোয়িং ও বিমান বাংলাদেশ ভবিষ্যতের বিনিয়োগ করছে।
একইভাবে অ্যাগ্রিমেন্ট অন রিসিপ্রোকাল ট্রেড, যা এআরটি নামেও পরিচিত, আমেরিকান ও বাংলাদেশি সমৃদ্ধির জন্য একটি যৌথ বিনিয়োগ। এই চুক্তি আধুনিক, ভারসাম্যপূর্ণ বাণিজ্য ও বিনিয়োগ অংশীদারির সুযোগ তৈরি করে। এআরটিতে এমন অনেক বিধান রয়েছে, যা এই কক্ষে উপস্থিত বেশির ভাগ মানুষের জন্য সুফল বয়ে আনবে। এই চুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশ প্রতিযোগিতামূলক ১৯ শতাংশ শুল্কে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রবেশাধিকার বজায় রাখতে পারবে, চুক্তি না থাকলে যা ৩৭ শতাংশে দাঁড়াত। একই সঙ্গে এটি এমন এক সমতাভিত্তিক পরিবেশ গড়ে তুলতে সহায়তা করবে, যেখানে আমাদের দুই দেশের ব্যবসা ও শ্রমিকরা সমৃদ্ধ ও বিকশিত হতে পারে। এটি আসলে খুবই সহজ-সরল যুক্তির বিষয়।
গত সপ্তাহেই আমরা জ্বালানি খাতে কৌশলগত সহযোগিতা বিষয়ে একটি নতুন সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করেছি—এমন একটি চুক্তি, যা কোটি কোটি ডলারের জ্বালানি প্রকল্পের পথ খুলে দেয় এবং বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা, শিল্পোন্নয়ন ও জ্বালানির উৎস বৈচিত্র্যকে জোরদার করে। বাংলাদেশের জ্বালানি চাহিদা পূরণে যুক্তরাষ্ট্র একটি নির্ভরযোগ্য অংশীদার হিসেবে পাশে আছে। আমেরিকা ফার্স্টের অর্থ এটিও—দেশে ও বিদেশে সংকট দেখা দিলে জীবন রক্ষায় প্রস্তুত থাকা। রোগের প্রাদুর্ভাব বৈশ্বিক স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি তৈরি করলে বা দুর্যোগ আঘাত হানলে দ্রুত সাড়া দেওয়া একদিকে যেমন জীবন বাঁচায়, অন্যদিকে আমেরিকান স্বার্থও সুরক্ষিত করে। বাংলাদেশে আমরা সাম্প্রতিক হাম প্রাদুর্ভাবের মতো স্বাস্থ্য নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা এবং হাম টিকাদান কর্মসূচিসহ কার্যকর জীবন রক্ষাকারী সহায়তা প্রদানে একসঙ্গে কাজ করেছি।
আমাদের অংশীদারি উভয় দেশকে শক্তিশালী করে এবং আমেরিকান নেতৃত্বকে তুলে ধরে। আমেরিকা পারস্পরিক কল্যাণকর নীতিতে বিশ্বাস করে। কারণ সেগুলো স্বাভাবিকভাবেই যুক্তিযুক্ত। আমাদের প্রতিপাদ্যে ফিরে আসি—‘কমন সেন্স’ ছিল আমেরিকার বিপ্লবের সময় প্রকাশিত একটি পুস্তিকার শিরোনাম। ১৭৭৬ সালে টমাস পেইন গ্রেট ব্রিটেন থেকে আমেরিকার স্বাধীনতার পক্ষে যুক্তি তুলে ধরতে ‘কমন সেন্স’ লেখেন। উপনিবেশজুড়ে পানশালা ও জনসমাবেশে এটি জোরে জোরে পড়ে শোনানো হতো—প্রকৃতপক্ষে এটি ছিল আমেরিকার ইতিহাসের প্রথম ‘বেস্টসেলার’। শিরোনামটি আজ আমেরিকার পররাষ্ট্রনীতির এক চমৎকার সারসংক্ষেপ।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেছেন, ‘[স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র] অধিকারভিত্তিক রাজনৈতিক স্বাধীনতার এমন এক মডেল দিয়েছিল, যা বিশ্বকে অনুপ্রাণিত করেছে। আপনি যদি আইনের শাসন, শাসিতের সম্মতি এবং বিজ্ঞান ও বাণিজ্যের অগ্রগতিতে বিশ্বাস করেন, তাহলে আপনি আমেরিকান বিপ্লব ও প্রতিষ্ঠার একজন অনুসারী।’
আমরা সমবেত হয়েছি নিজেদের পথ নির্ধারণ এবং অধিকারভিত্তিক স্বাধীনতার প্রতি বিশ্বাস উদযাপন করতে—যে বিষয়টি টমাস পেইনের কাছে ছিল একেবারেই সহজ-সরল যুক্তির ব্যাপার। আমেরিকা যখন স্বাধীনতার ২৫০ বছর উদযাপন করছে, আমরা চাই আপনারাও আমাদের সঙ্গে এই উদযাপনে যোগ দিন।
জাতীয় দিবস আয়োজনকে আপনারা জন্মদিনের আগাম অনুষ্ঠান হিসেবে ভাবতে পারেন—এই বছরে আরো অনেক কিছু আসছে! আমাদের ইতিহাস সম্পর্কে আরো জানতে পারেন আমাদের আমেরিকান ফাউন্ডার্স মিউজিয়ামের মাধ্যমে। গুলশান সোসাইটির সহায়তায় আমরা গুলশান ও বনানীতে ৫০টি লাল-সাদা-নীল রিকশাও চালু করছি।
আমেরিকা উইক চলাকালে জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহে আমরা একটি আমেরিকান রোড শো নিয়ে বাংলাদেশজুড়ে ভ্রমণ করব। এতে থাকবে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ব্যান্ড, আর আমরা ঢাকায়, চট্টগ্রামে, রাজশাহীতে এবং সিলেটে আমেরিকার স্বাধীনতা উদযাপন করব। আমাদের উদযাপনে যোগ দিতে, আমাদের অনুষ্ঠানগুলোতে আসতে এবং আমাদের সোশ্যাল মিডিয়া অনুসরণ করতে আপনাদের আমন্ত্রণ জানাই।
শেষ করার আগে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আরো কয়েকটি কথা আপনাদের সামনে তুলে ধরছি। ১৭৭৬ সালে গ্রীষ্মের প্রচণ্ড গরমে স্বাধীনতার প্রতিশ্রুতি আমাদের পূর্বসূরিদের এক স্বৈরাচারী সাম্রাজ্যের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করতে, স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র জারি করতে এবং সব প্রতিকূলতা অতিক্রম করে অনন্য এক প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে অনুপ্রাণিত করেছিল। এই অটল সাহস, বিশ্বাস ও দেশপ্রেমের চেতনাই পল রিভিয়ারকে তাঁর বিখ্যাত মধ্যরাতের যাত্রায় এগিয়ে নিয়েছিল; আর পরবর্তী সময়ে বিশ্বের শ্রেষ্ঠ কিছু মানুষকে একটি নতুন জাতি গড়ে তুলতে তাঁদের জীবন, সম্পদ ও পবিত্র সম্মান উৎসর্গের অঙ্গীকার করতে অনুপ্রাণিত করেছিল। এই চেতনাই জেনারেল জর্জ ওয়াশিংটনকে ভ্যালি ফোর্জে অবিচল থাকতে শক্তি দিয়েছিল; ডেভি ক্রকেটকে আলামোতে তাঁর শেষ প্রতিরোধে অনুপ্রাণিত করেছিল; ওরেগন ট্রেইলের বসতি স্থাপনকারীদের সাহস জুগিয়েছিল; গেটিসবার্গের রক্তাক্ত পাহাড়ি রেখাগুলো ধরে রেখেছিল; দাসপ্রথাকে বিশ্বব্যাপী বিলুপ্তির পথে নিয়ে গিয়েছিল; বিদেশে স্বৈরশাসন ও কমিউনিজম পরাস্ত করতে তরুণদের এক প্রজন্মকে জাগিয়ে তুলেছিল; এবং আমাদের সুন্দর ডোরাকাটা নক্ষত্রখচিত পতাকাকে চাঁদের বুকে পৌঁছে দিয়েছিল।
আজও এই আমেরিকান চেতনাই প্রতিটি দেশপ্রেমিকের হৃদয়, মন ও আত্মায় বেঁচে আছে—এবং আমেরিকান নাগরিকদের প্রতিটি নতুন প্রজন্মকে আরো দূরে পৌঁছতে ও আরো উঁচু লক্ষ্য স্থির করতে অনুপ্রাণিত করে। স্বাধীনতার অভিন্ন মূল্যবোধ এবং আমাদের কূটনৈতিক সম্পর্কের দৃঢ়তা বাংলাদেশের নিজস্ব স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে সেক্রেটারি রুবিওর অভিনন্দনবার্তায়ও প্রতিফলিত হয়েছে : ‘মুক্ত, অবাধ, নিরাপদ ও সমৃদ্ধ ইন্দো-প্যাসিফিকের অভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা বাংলাদেশের সঙ্গে আমাদের দীর্ঘদিনের অংশীদারিকে যুক্তরাষ্ট্র মূল্য দেয়। আমাদের উভয় দেশের জনগণের কল্যাণে আমরা আমাদের অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা অংশীদারি আরো জোরদার করার প্রত্যাশা করি।’
আমি আবারও বলতে চাই, আমেরিকা ফার্স্ট মানে শুধু আমেরিকা একা নয়। আমাদের দুই দেশের সৌহার্দ্য আর সম্প্রীতি, একসঙ্গে কাজ করার দৃঢ় প্রতিজ্ঞা আমাদের আরো অনেক অর্জন নিশ্চিত করবে। আমরা আমাদের বন্ধুত্ব আর অংশীদারি আরো মজবুত ও দৃঢ় করতে চাই।
লেখক : ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত
(২০ মে ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় দিবসের অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রদূতের বক্তব্যের অংশবিশেষ)